রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘কিশলয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এখন চরম সংকট ও প্রশাসনিক অবহেলায় ধুঁকছে। তীব্র শিক্ষক স্বল্পতা, জীর্ণ অবকাঠামো এবং প্রতি বছর বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কারণে একসময়ের নামকরা এই বিদ্যাপীঠটির শিক্ষা কার্যক্রম এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
২০১৩ সালে সরকারীকরণ হওয়া এই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, এটি একই সাথে স্থানীয় দুর্যোগকালীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র। তবে সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, যে প্রতিষ্ঠানটি বন্যাকবলিত শত শত মানুষকে আশ্রয় দেয়, সেটি নিজেই সামান্য বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে পানিতে ডুবে যায়।
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই বিদ্যালয়টি চারপাশ থেকে পানিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঠ ছাড়িয়ে পানি অনেক সময় শ্রেণিকক্ষেও ঢুকে পড়ে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাঁটুসমান কাদা-পানি মাড়িয়ে ক্লাসে আসতে হয়। অনেক সময় নিরাপত্তার স্বার্থে ক্লাস বন্ধ রাখতে বাধ্য হন শিক্ষকরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের পড়াশোনায়।
বিদ্যালয়টির মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় গর্তে ভরা থাকায় বৃষ্টির পানি জমে ছোট পুকুরের রূপ নিত। বারবার আবেদন করেও সরকারি কোনো বরাদ্দ না পেয়ে, গত বছর বর্তমান প্রধান শিক্ষক শাহীন আক্তার সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে মাঠে মাটি ভরাট করান। একজন শিক্ষকের নিজস্ব খরচে সরকারি স্কুলের মাঠ ঠিক করার এই ঘটনাকে স্থানীয়রা প্রশাসনের জন্য চরম লজ্জাজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৫ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে পুরো বিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষার্থীর পাঠদান। ফলে বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের একসঙ্গে একাধিক শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যালয়ে কোনো দপ্তরি বা নৈশপ্রহরী নেই। কক্ষ খোলা-বন্ধ থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতার কাজও শিক্ষকদেরই সামলাতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৯ সালে বর্তমান প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভবন সংস্কার, বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও শিক্ষক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দফায় দফায় লিখিত আবেদন করলেও কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। অথচ বন্যার সময় বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা এই আশ্রয়কেন্দ্রে এসে ছবি তুললেও, ভবনের জীর্ণ দশা ও ঝুঁকি তাঁদের চোখে পড়ে না।
উপজেলা সদরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে থেকেও এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ কেন বছরের পর বছর অবহেলিত থাকবে—তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মাঝে। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









