পদ্মা সেতু হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই নাওডোবা বাসস্ট্যান্ড এখন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্থানীয় ‘বাবু-অপু সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে এখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে সংগঠিত চাঁদাবাজি, যার কারণে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বাস মালিক, চালক, হেলপার এবং সাধারণ যাত্রীরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে নাওডোবা বাসস্ট্যান্ড পরিদর্শন এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্ট্যান্ডটিতে বিভিন্ন কৌশলে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি হলো ‘জিপি’ বা ‘গেটলক পাস’। অভিযোগ রয়েছে, স্ট্যান্ড অতিক্রমের সময় প্রতিটি বাস থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন বাবু শেখ নামে এক ব্যক্তি।
শুধু তাই নয়, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চল থেকে ঢাকাগামী বাসগুলোতে যাত্রী গণনা করে প্রতি যাত্রী বাবদ ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাবু ও অপুর নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত কয়েকজন ব্যক্তি চালক ও হেলপারদের কাছ থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাস মালিক বলেন, “নাওডোবা, কাজিরহাট ও টিএনটি মোড়ে চাঁদা না দিলে বাসে যাত্রী তুলতে দেওয়া হয় না। ব্যবসা চালিয়ে নিতে বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ভাড়ার ওপরই প্রভাব ফেলে।”
তারা আরও জানান, এসব অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধ করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হতো এবং যাত্রীরাও কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধা পেতেন।আগেও প্রকাশ্যে এসেছিল অভিযোগ
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেও নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনাও প্রচারিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাওডোবা শ্রমিক দলের সভাপতি সারোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “বাবুর মূল বাড়ি নোয়াখালী অঞ্চলে। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী অপু ব্যাপারীর আত্মীয়। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাসস্ট্যান্ডে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে ছাত্র আন্দোলনের সময় হামলার ঘটনাতেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তারা আবারও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাবু শেখ। তিনি বলেন, “চাঁদা তোলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কয়েকটি বাস কাউন্টারের দায়িত্ব পালন করি, আমার লোকজনও সেখানেই কাজ করে।”
ছাত্র আন্দোলনের সময় হকিস্টিক হাতে ভাইরাল হওয়া ছবি প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “ওই ছবি খেলাধুলার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় তোলা হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচনের সময় আমাদের জোর করে পোস্টার হাতে ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।”
নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, “বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো চাঁদাবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক্রাইম এন্ড অপস মোঃ তানভীর হোসেন বলেন চাদাবাজীর ব্যাপারে এখনো সু স্পষ্ট কোনো অভিযোগ পাইনি। আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পদ্মা সেতুর প্রবেশমুখে অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে নাওডোবা বাসস্ট্যান্ডকে চাঁদাবাজমুক্ত করে যাত্রী ও পরিবহন খাতকে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









