তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও আট বছরেও শেষ হয়নি রাজধানীর পূর্ব প্রবেশমুখে বালু নদীর ওপর নির্মাণাধীন পাতিরা-ইছাপুরা সেতুর কাজ। এখন পর্যন্ত অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। ফলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার উত্তরাঞ্চলের দুই শতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগ, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একসময় উত্তর রূপগঞ্জের মানুষের রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ইছাপুরা বালু সেতু। ১৯৯৬ সালে নির্মিত লোহার সেতুটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী ইছাপুর বাজার ছিল এ অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে পাইকারি পণ্য কেনাবেচার জন্য আসতেন।
পুরোনো সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩২০ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। প্রকল্প অনুযায়ী ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আরও পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও সেতুটি এখনো চালুর অপেক্ষায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করছেন। রাজধানীগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। রাতের বেলায় ট্রলার চলাচল সীমিত থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে দেখা দেয় সংকট। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক কিলোমিটার ঘুরপথে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের পূর্বাচল সেতু ও সেনাবাহিনীর জলসিঁড়ি সেতুর নির্মাণকাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অথচ নকশাগত জটিলতার কারণ দেখিয়ে বছরের পর বছর ঝুলে আছে ইছাপুরা সেতুর কাজ। এতে উত্তর রূপগঞ্জের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইছাপুর বাজারের ব্যবসায়ী ও মোস্তফা সুইটসের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা বলেন, ‘‘একসময় এই বাজারে মানুষের ভিড় সামলানো যেত না। এখন ব্যবসা প্রায় শেষ হওয়ার পথে। সেতু না থাকায় ক্রেতারা আসতে চান না। বাজারের প্রাণটাই যেন হারিয়ে গেছে।’’
আরেক ব্যবসায়ী রহমান মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘পদ্মা সেতু হয়ে গেছে, আশপাশের আরও অনেক সেতু হয়েছে। কিন্তু ইছাপুরার এই সেতু আর শেষ হয় না। এতে এলাকার মানুষ চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।’’
নির্মাণসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নকশাগত জটিলতা, নদীভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাইড বাঁধের সঙ্গে সমন্বয় সমস্যা এবং বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত নৌযান চলাচলের উচ্চতা নিয়ে আপত্তির কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘‘সেতুর বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী সেতুর উচ্চতা নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল। সেগুলো সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’’
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা না হলে উত্তর রূপগঞ্জের অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরও গভীর হবে এবং ঐতিহ্যবাহী ইছাপুর বাজারের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









