লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় ঠিকাদারের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠার অভিযোগ উঠেছে।
পাশাপাশি একই দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সরাসরি পার্সেন্টেজ বা কমিশন নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ন হওয়া এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং কাজের মান নিয়ে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন মহলের লোকজন। তারা বলছেন, এলজিইডি’র দীর্ঘসময় থাকা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাকরি বিধির নীতিমালা অনুযায়ী অন্যত্র বদলীর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপসহকারী প্রকৌশলী সৌরভ কুমার মহন্ত ও মানিক মিয়া ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, কার্যসহকারী আনোয়ার হোসেন ২০১৩ সালের ১৯ জুন, আহসান হাবীব ২০২৩ সালের ৪ জুন এবং একই পদের গোলাম আজম ২০২৩ সালের ৫ জুন এই দপ্তরে যোগদান করেন। অপরদিকে এই দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যত্র বদলী হলেও তদবীর করে আবারও পাটগ্রাম উপজেলার দপ্তরে স্বপদে ফিরে এসেছেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মাঠ পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষভাবে তদারকির স্বার্থে এই অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একই উপজেলায় ৩ বছরের বেশি রাখেন না। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুসরণ করে প্রকৌশলীদের বদলির আদেশ জারি করেন স্থানীয় সরকার বিভাগ। উপসহকারী প্রকৌশলী এবং কার্যসহকারী পদের কর্মচারীদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
কিন্তু অজ্ঞাতকারণে পাটগ্রাম উপজেলায় দুই জন সহকারী প্রকৌশলী ও তিন জন কার্যসহকারী তিনবছর থেকে প্রায় তের বছর ধরে কর্মরত থাকলেও তাদের বদলি হয়নি।
কাজ পরির্দশনে গিয়ে ঠিকাদার ও ঠিকাদারের প্রতিনিধির সাথে স্বজনপ্রীতি করে নিম্নমানের কাজ করতে সহায়তা করার অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সরকারের প্রকল্প সমূহ বাস্তবায়ন করে থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, মেরামত ও নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কার, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংযোগ সড়কের উন্নয়ন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার, ঘুর্ণিঝড়, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুননির্মাণ, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, প্রকল্পের নকশা, প্রাক্কলন, দরপত্র ও কাজের মান নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারদের কাজ তদারকি ও বিল পরিশোধের জন্য কাজের অগ্রগতি যাচাই করে থাকে।
উপজেলার একাধিক ঠিকাদার ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসব কাজ বাস্তবায়নে ও বিল উত্তোলনে পাটগ্রাম উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আহমেদ হায়দার জামান সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থের বিপরীতে ৫ শতাংশ (৫%) হারে উৎকোচ নিয়ে থাকেন। তিনি দপ্তরের হিসাব সহকারী মেরিনা আক্তারের মাধ্যমে টাকা নিয়ে থাকেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
এসব অভিযোগের পর সাংবাদিকরা গত ৫ কার্যদিবসে পাটগ্রাম এলজিইডি দপ্তরে গিয়ে ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এই উপজেলায় কি কি উন্নয়ন মূলক কাজ চলছে? কত টাকার কাজ তথ্য চাইলে; দিতে রাজি হয়নি হিসাব সহকারী ও উপজেলা প্রকৌশলী।
পরে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলমের কাছে তথ্য চাইলে তিনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন দিতে বলেন। এই উপজেলায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিবি) ১৫ টি প্রকল্পের কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ৮ টি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে এডিপি তহবিল থেকে ২ লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মূলত গ্রামীণ এলাকার ছোট আকারের মেরামত বা উন্নয়নমূলক কাজে এ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে নামমাত্র টাকায় কৃষি যন্ত্রপাতি ও খেলার সামগ্রী এবং কোথাও টিউবওয়েল স্থাপন দেখিয়ে এলজিইডি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের যোগসাজসে মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এছাড়াও উপজেলার ওই অর্থবছরে বাউরা ইউনিয়নের হাটবাজারে অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি (প্রভাতি) প্রকল্পের মাধ্যমে আরসিসি রোডের উন্নয়ন, দুইটি বহুমুখী শেড উন্নয়ন, পুরুষ ও মহিলা টয়লেট নির্মাণ, ব্লক মেরামত ইত্যাদি কাজে ১ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের ৩ টি দলের ১০৮ জন সুবিধাভোগী শ্রমিকদের কাজে ও মজুরী প্রদানেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলসিএস কমিটির একজন সভাপতি বলেন, পরিশ্রম অনুযায়ী মজুরী পাচ্ছিনা। আমাদের দৈনিক কাজের দিন বেশি দেখিয়ে টাকা মেরে দিয়েছে। আমরা কিছু বললে আমাদেরকে বাদ দেওয়ার ভয় দেখায়। এজন্য আমরা কিছু বলতে পারিনা।
উপজেলার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, দলীয় লোকজনদেরকে নিয়ে ঠিকাদার ও তাঁদের প্রতিনিধিরা কাজ করে থাকে। এসব কাজের সঠিক তদারকির অভাবে নিম্মমানের কাজ করে থাকে অধিকাংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষ হিসেবে কিছু বলাও যায়না।
উপসহকারী প্রকৌশলী সৌরভ কুমার মহন্তের দায়িত্বে উপজেলার শ্রীরামপুর খেংটি এলাকায় পাবসস অফিসের ১০টি ভিজিট চেয়ার, একটি কম্পিউটার টেবিল, একটি স্টিল আলমারি, একটি অফিস টেবিল ও একটি মিটিং টেবিল স্থানীয় এক ঠিকাদারের কাছে জমা রাখলেও পরে পাওয়া যায়নি। পরে অভিযোগ উঠে, মহন্ত ও ঠিকাদারের যোগসাজশে এগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
উপসহকারী প্রকৌশলী সৌরভ কুমার মহন্ত বলেন, ধরে নিলাম আমরা অনিয়ম করছি তো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে আপনাদেরকে জানানোর কি আছি? সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
পাটগ্রাম উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাব সহকারী মেরিনা আক্তার টাকা নেওয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মিথ্যা কথা। আমার মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ার টাকা নেয় এটা তো পুরোদমে মিথ্যা কথা। কোন ঠিকাদার বলছে, আমার সামনে নিয়ে আসেন তো।
চলতি অর্থবছরে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে এডিবির ৮৪ লাখ টাকা। কাজের বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের পার্সেন্টেজ বা শতকরা হিসেবে টাকা নেন এমন সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী আহমেদ হায়দার জামান বলেন, আমার পদোন্নতি হয়েছে। আমি কিছু দিনের মধ্যে এখান থেকে চলে যাচ্ছি। যা শুনছেন সব মিথ্যা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









