নদীর নাম যমুনা। তার ক্ষ্যাপাটে স্রোত গত ১০ বছরে ছ’ছবার গিলে খেয়েছে আস্ত একটা স্কুল ভবনকে। কিন্তু গিলে খেতে পারেনি একদল শিক্ষক আর কোমলমতি শিশুদের পড়তে চাওয়ার অদম্য জেদকে। ১৯১৯ সালে, অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের পরের বছর যখন বগুড়ার সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে ‘চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ তার যাত্রা শুরু করেছিল, কেউ ভাবেনি শতাব্দীর ওপারে এসে এই বিদ্যাপীঠকে যাযাবরের মতো ঠিকানাহীন ঘুরে বেড়াতে হবে।
গত ১০ মে উজানের ঢলে যমুনার সর্বগ্রাসী ভাঙনে শেষবারের মতো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে স্কুলের শেষ আশ্রয়টুকু। এরপর থেকেই কোনো সরকারি সাহায্য বা ত্রাণের তোয়াক্কা না করে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ধুলোবালির মধ্যেই চলছে এই শতবর্ষী স্কুলের ‘উদ্বাস্তু’ শিক্ষা কার্যক্রম।
স্কুল নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর খাতা-কলমে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকরা তা হতে দেননি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সরকারি বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতার দিকে চেয়ে না থেকে, শিক্ষকরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে যমুনার বাঁধে খাড়া করেছেন একটা টিনের চাল আর খুঁটির অস্থায়ী ছাপরা।
এখানে কোনো গালভরা নামফলক নেই, নেই কোনো বাউন্ডারি ওয়াল। বাঁধের ওপর তৈরি এই খুপরিতেই এখন চারপাশের তীব্র কোলাহলের মধ্যে চলে বর্ণমালার লড়াই। অস্থায়ী এই স্কুলে কোনো বেড়া বা পার্টিশন দেওয়ার সামর্থ্য শিক্ষকদের ছিল না। ফলে পুরো স্কুলটি এখন একটা খোলা মঞ্চের মতো। একদিকে প্রথম শ্রেণির ‘অ-আ-ক-খ’ মুখস্থ করার আওয়াজ, অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস—সব মিলেমিশে একাকার।
বাঁধের রাস্তা দিয়ে যখন কোনো যানবাহন বা মোটরসাইকেল হর্ন বাজিয়ে চলে যায়, তখন শিক্ষকদের গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে পড়াতে হয়। বাতাসে উড়ে যায় খাতা, আর বেড়াহীন ছাপড়া ঘরে বসে থাকা শিশুদের চোখ-মুখ ঢেকে যায় বাঁধের উড়ন্ত ধুলোবালিতে।
"আকাশে মেঘ ডাকলে আমাদের স্যারেরা পড়া বন্ধ করে দেয়," বলছিল তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। "কারণ একটু বৃষ্টি এলেই চারপাশ থেকে পানি ছিটকে আসে। বইখাতা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে আমরা তখন চালের নিচে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।"
সারিয়াকান্দির চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই গল্প কেবল নদী ভাঙনের গল্প নয়; এটি প্রান্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবহেলা আর শিক্ষকদের নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের দলিল। স্থানীয় অভিভাবকরা ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করে বলেন, "নদী তো প্রতি বছরই ভাঙবে, তাহলে কি প্রতি বছরই স্কুল এভাবে বাস্তুচ্যুত হবে? আমরা ত্রাণ চাই না, আমাদের সন্তানদের জন্য নদীর সীমানার বাইরে একটুখানি স্থায়ী জমি আর একটা পাকা ঘর চাই।"
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, “আমি এ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কর্মরত আছি। গত ১০ বছরে বিদ্যালয়টি ছয় বার ভাঙনের শিকার হয়েছে। সম্পূর্ণ জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর অন্য জায়গায় আসবাবপত্র রাখা হয়েছিল। এবার আবারও ভাঙনের মুখে পড়ায় অবকাঠামো ও আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মারাত্মক শিখন ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সামনে ২য় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা, তাই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাধ্য হয়েই বাঁধের ওপর টিনের ছাপরা ঘর তুলে পাঠদান সচল রেখেছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মোঃ মাহতাবুর রহমান জানান, “চকরতিনাথ গ্রামের পাশেই একটা নতুন জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব ভাঙন কবলিত এলাকা থেকে চিহ্নিত স্থানে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হবে। পরবর্তীতে বাজেট বরাদ্দ পেলে সেখানে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হবে।”
অন্যদিকে, সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস জানান, বিদ্যালয়টি দ্রুত স্থানান্তর ও স্থায়ীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর ইতিমিধ্যেই লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









