উন্নয়ন কাজের নামে যেন হরিলুট চলছে বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি সড়ক সংস্কার কাজ শেষ হতে না হতেই ধসে পড়ছে। ধুলোবালি আর কাদার ওপর নামমাত্র বিটুমিন দিয়ে করা এই কার্পেটিং এতটাই নড়বড়ে যে, মানুষ হাত দিয়ে সামান্য স্পর্শ করলেই উঠে আসছে পিচ আর পাথরের আস্তরণ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, খোদ এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই ঘটেছে এই নজিরবিহীন অনিয়ম। উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের তালবাড়ি এলাকার ৫৪০ মিটারের এই সড়কটির এমন ‘ভঙ্গুর’ উন্নয়ন দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মাহিলাড়া-আম্বুলা-ছয়গ্রাম-পয়সারহাট সড়কের বাগধা ইউনিয়নের তালবাড়ি অংশের ৫৪০ মিটার রাস্তা টেকসই করার জন্য গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দিয়ে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কার্যাদেশ পায় বাবুগঞ্জের মীরগঞ্জ এলাকার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সরদার ট্রেডিং’। তবে মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজটি কিনে নিয়ে মাঠপর্যায়ে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করান আগৈলঝাড়ার স্থানীয় দলিল লেখক মো. জাকির মোল্লা।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর মোল্লা ও শফিকুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘রাস্তা সংস্কারের কোনো নিয়মই মানা হয়নি। বৃষ্টির পর ভেজা রাস্তা ঝাড়ু না দিয়ে, ধুলোবালি ও ময়লার ওপরই তড়িঘড়ি করে পিচ ঢেলে দেওয়া হয়েছে। পাথরের তুলনায় বিটুমিন দেওয়া হয়েছে নামমাত্র। আমরা সাধারণ মানুষ যখন এই দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গেলাম, ঠিকাদারের লোকজন আমাদের ওপর চড়াও হয়ে উল্টো হুমকি-ধামকি দিয়েছে।’’
সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় সড়কের কার্পেটিং আলগা হয়ে ধসে পড়ছে। এই প্রকাশ্য অনিয়মের দায় নিতে রাজি নয় কোনো পক্ষই। শুরু হয়েছে একে অপরকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি।
মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নকারী জাকির মোল্লা সরাসরি দায় চাপিয়েছেন প্রকৌশল অফিসের ওপর। তার দাবি, টানা বৃষ্টির পর যখন এক গাড়ি মিক্সড মাল আসে, আমি ভেজা রাস্তায় তা ঢালতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এলজিইডি অফিসের এসও (উপ-সহকারী প্রকৌশলী) আমাকে ধমকের সুরে বলেন, ‘‘কোনো সমস্যা হবে না, সিডিউল অনুযায়ী কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।’’ ওনার নির্দেশেই কাজ করা হয়েছে, এখন দোষ আমাদের কেন?
অথচ কাজের তদারকিতে থাকা উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ নিজের দায় এড়াতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমি তো কাজ শুরু করিয়ে দিয়ে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। পরে সেখানে ঠিকাদার কী করেছে তা আমার জানা নেই। তবে যেখানকার পিচ উঠে গেছে, সেখানে ঠিকাদারকে দিয়ে আবার কাজ করানো হবে।’’
ভাঙাচোরা ও পিচ উঠে যাওয়া সড়ক দিয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকেরা।
ওই সড়কের নিয়মিত ভ্যানচালক রবিউল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘এ দেশের বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি একটু সৎ ও ভালো হতো, তবে দেশটা অনেক উন্নত হতো। এই রাস্তার কাজটাও অন্তত দুই বছর টিকতো। আমাদের গরিব মানুষকে আর এমন ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো না।’’
জনগণের টাকায় এমন নয়ছয় ও পুকুরচুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী রবীন্দ্র চক্রবর্তী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অনিয়মের কাজ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘‘এই কাজের অনিয়মের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। বরিশাল এলজিইডি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে তদন্ত করে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। বর্তমানে এই কাজের যাবতীয় বিল বা পেমেন্ট বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যদি পুরো রাস্তা সিডিউল অনুযায়ী নতুন করে সংস্কার করে না দেয়, তবে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









