গত পরশুই তো সেই চেনা দৃশ্যটি ওলটপালট করে দিয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। পরীক্ষা কেন্দ্রের লোহার গেটটা তখনো শক্ত করে বন্ধ। ভেতরে অন্য শিক্ষার্থীরা যখন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেই রুদ্ধ দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে এক কিশোরীর বুকফাটা কান্না নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশের কোটি মানুষের বিবেক।
নাম তার সুমাইয়া আক্তার; বগুড়ার সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের এক সংগ্রামী ছাত্রী। নিয়তির পরিহাসে পিতৃহীন এই মেয়েটি ফরম পূরণের জন্য কষ্টার্জিত সাড়ে তিন হাজার টাকা সময়মতো কলেজের তহবিলে জমা দিলেও, দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম গাফিলতিতে তার রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি ভুলভাবে বোর্ডে পাঠানো হয়েছিল। ফলে, ২ জুলাই এইচএসসির প্রথম দিন অন্য সবার হাতে যখন প্রশ্নপত্র, সুমাইয়ার শূন্য হাতে তখন শুধুই ঝরছিল নিয়তিকে দোষারোপ করা অশ্রুধারা।
কিন্তু ভাঙা স্বপ্নের সেই অন্ধকারের আয়ু হলো মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা। একটি ভাইরাল কান্না সুদূর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিল, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমস্ত দেয়াল ভেঙে এক অলৌকিক রূপ নিল। আজ ৪ জুলাইয়ের সকালটা তাই সুমাইয়ার জীবনে এক নতুন সূর্যোদয় নিয়ে এলো। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস যখন পরম মমতায় সুমাইয়ার হাতে বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি নতুন প্রবেশপত্রটি তুলে দিলেন, তখন চন্দনবাইশা ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের সেই চেনা কান্নাটি রূপ নিল এক অপার্থিব হাসিতে।
এই জাদুকরী প্রাপ্তির পর আবেগ সামলাতে না পেরে সুমাইয়া জানান, বাবা মারা যাওয়ার পর তার ভাই দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। প্রথম দিন যখন প্রবেশপত্র না পাওয়ার কারণে তাকে কেন্দ্রের গেইট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন মনে হয়েছিল যেন তার পুরো পরিবারের আকাশটাই মাথায় ভেঙে পড়েছে। তবে মাত্র দুদিনে সরকার ও প্রশাসনের এই অতিমানবীয় তৎপরতায় পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেয়ে তিনি আজ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত।
সেই সাথে প্রথম দিন ছুটে যাওয়া পরীক্ষাটি যেন শিক্ষা বোর্ডের বিশেষ সিদ্ধান্তে সুমাইয়া পরে দেওয়ার সুযোগ পান, সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা পাকা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
অবশ্য সুমাইয়ার এই স্বপ্নপূরণের আনন্দের সমান্তরালে, নেপথ্যের খলনায়কদের চিহ্নিত করতে প্রশাসন এখন এক চুলও ছাড় দিতে নারাজ। টাকা নিয়েও কেন একটি মেয়ের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা হলো, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তদন্তে কলেজ প্রশাসনের যার অবহেলাই প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে নেওয়া হবে এমন দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা যা ভবিষ্যতে আর কারো ক্যারিয়ার নিয়ে খেলা করার সাহস দেবে না।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজ কর্তৃপক্ষ ভুলটি আগে থেকেই জানত, কিন্তু তা সংশোধনের কোনো গরজ দেখায়নি। অবশেষে গণমাধ্যমের শক্তি আর মানবিক প্রশাসনের যুগপৎ চেষ্টায় রক্ষা পেল একটি মেধার অপমৃত্যু। সারিয়াকান্দির উত্তরপাড়া গ্রামে এখন আর কোনো বিষাদের ছায়া নেই, সেখানে বইছে স্বস্তির হাওয়া। সব বাধা জয় করে সুমাইয়া এখন পরীক্ষার হলের চেনা বেঞ্চে, ডানহাতে শক্ত করে ধরা কলম আর চোখে এক বুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের ভাগ্য নতুন করে লিখছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









