বুকের ভেতর যেন জ্বলছে এক অন্তহীন চিতা। সেই চিতায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এক হতভাগ্য বাবার সাজানো সংসার। গত চার মাস ধরে প্রতিদিন নিয়ম করে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন মো. জয়নাল আবেদিন। কখনো ডুকরে কেঁদে উঠছেন, কখনো বা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন শূন্য দৃষ্টিতে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) পাবনার ঈশ্বরদীতে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংস ডাবল মার্ডারের শিকার হয়েছিলেন জয়নালের বৃদ্ধ মা সুফিয়া খাতুন (৬৫) এবং ১৬ বছরের কিশোরী কন্যা জামিলা আক্তার। মা আর মেয়ে—কলিজার এই দুই টুকরোকে হারিয়ে জয়নাল আবেদিন এখন জীবন্ত লাশ। কিন্তু বুকফাটা এই কান্নার মাঝেও চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো বিজ্ঞ আদালতে জমা পড়েনি ডিএনএ রিপোর্ট। থমকে আছে চাঞ্চল্যকর এই মামলার অভিযোগপত্র। আইনের দীর্ঘসূত্রতা আর প্রশাসনের আশ্বাসের বেড়াজালে পড়ে দিশেহারা এই পিতা এখন কার কাছে চাইবেন বিচার?
পুলিশের তদন্ত ও ঘাতক শরিফুলের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায় এক গা শিউরে ওঠা চক্রান্তের কথা। গ্রেপ্তারকৃত মো. শরিফুল ইসলাম শরিফ (৩৫) পেশায় একজন ট্রাকচালক এবং নিহত জামিলার দূরসম্পর্কের চাচা।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার অজুহাতে শরিফুল জামিলাদের বাড়িতে যান। বাড়িতে দাদি না থাকার সুযোগে সে জামিলাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। কিন্তু সাহসী কিশোরী জামিলা এর তীব্র প্রতিবাদ করে এবং শরিফুলকে একটি চড় মারে। এই চড়ের ক্ষোভ আর প্রতি হিংসার আগুন বুকে নিয়ে শরিফুল ছক কষে এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) গভীর রাতে শরিফুল আবারও ওই বাড়িতে হানা দেয়। প্রথমে সে আগের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়ার ভান করলে দাদি সুফিয়া খাতুন (৬৫) তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং চিৎকার শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শরিফুল একটি কাঠের বাটাম দিয়ে সুফিয়ার মাথায় সজোরে আঘাত করে। বৃদ্ধা সুফিয়া রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নাতনি জামিলা চিৎকার দিয়ে ওঠে।
তখন পিশাচ শরিফুল নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ভারী হাতুড়ি দিয়ে জামিলার মাথা ও কপালে উপর্যুপরি আঘাত করে। এরপর অবর্ণনীয় নৃশংসতায়, রক্তাক্ত ও অর্ধচেতন জামিলাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পাশের সরিষাক্ষেতে নিয়ে যায় সে। সেখানে তাকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পালিয়ে যায় ঘাতক।
ঘটনার পরদিন জয়নালের বোন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। জেলা ডিবি পুলিশের বিশেষ দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল হোতা শরিফুলকে আটক করে। শরিফুল আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছে। কিন্তু ঘটনার ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও ডিএনএ রিপোর্ট না আসায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম থমকে আছে।
এই নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ফুঁসে উঠেছে পাবনার ঈশ্বরদীবাসী। ঘাতক শরিফুলের দ্রুত ফাঁসির দাবিতে বারবার পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এলাকাবাসী। তাদের একটাই দাবি, এই নরপিশাচের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, যাতে আর কোনো বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।
বিচারের বাণী যেন নীরবে-নিভৃতে না কাঁদে—এখন এটাই ঈশ্বরদীবাসী তথা পুরো দেশের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা। জয়নাল আবেদিনের শূন্য বুক হয়তো আর কখনোই পূর্ণ হবে না, কিন্তু অপরাধীর দ্রুততম সময়ে ফাঁসি হলে অন্তত এই অভাগা পিতার আত্মা কিছুটা শান্তি পাবে।
চোখের জল মুছতে মুছতে নিহত জামিলার বাবা মো. জয়নাল বলেন, আমার তো সব শেষ, ঘাতক শরিফুল আমার আর কিছুই বাকি রাখল না। আমার ফুলের মতো মেয়েটা আর আমার বৃদ্ধ মা—দুইটা কলিজার টুকরাকেই আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিল। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বারবার প্রশাসন আমাকে উল্টাপাল্টা বোঝাচ্ছে। ডিবি থেকে আমাকে বলেছিল ৩ মাসের মধ্যে এই বিচারকাজ সম্পূর্ণ করবে, কিন্তু ৪ মাস পার হতে চলল এখনো চার্জশিটই দিল না! আমি কার কাছে এই বিচার চাইব?
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, দাদি-নাতনি হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাটি পুরো বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনা। পুলিশ এই মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র গরিমসি বা অবহেলা করেনি, মূল অভিযুক্ত বর্তমানে জেল হেফাজতে রয়েছে। এই মামলার তদন্তে পুলিশের প্রায় সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ আমরা ইতোমধ্যে শেষ করেছি। এখন শুধুমাত্র ডিএনএ রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা রিপোর্টটি পেয়ে যাব এবং তা পাওয়ার পরপরই বিজ্ঞ আদালতে পেশ করা হবে।
তিনি আরও আশ্বস্ত করে বলেন, অতীতে দেশজুড়ে আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার যেভাবে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক একইভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজও দ্রুত শেষ হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।"
পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখার ইনচার্জ, মোঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, দাদি-নাতনি হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাটি পুরো বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনা। জেলা পুলিশ ও ডিবি এই মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র গরিমসি বা অবহেলা করেনি; মূল অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে বর্তমানে জেল হেফাজতে রয়েছে।
মামলার তদন্তে পুলিশের প্রায় সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ আমরা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি। এখন শুধুমাত্র ডিএনএ রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি, আগামী ১-২ দিনের মধ্যে আমরা রিপোর্টটি হাতে পেয়ে যাব এবং তা পাওয়ার পরপরই বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে।
আমরা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, অতীতে দেশজুড়ে আলোচিত 'রামিসা হত্যাকাণ্ড'-এর বিচার যেভাবে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক একইভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজও দ্রুত শেষ হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









