ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউড়া এলাকায় ৩ দশমিক ৬১ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ মৈত্রীস্তম্ভের উদ্বোধন করেন।
মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া শত্রুমুক্ত হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। পরে কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতের ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের মিত্র বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের প্রধান লে. কর্ণেল কে. এম. সফিউল্লাহর নেতৃত্বে যৌথভাবে আশুগঞ্জের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ভুল তথ্যের কারণে ৯ ডিসেম্বর রাতে আশুগঞ্জ সোহাগপুর ও কামাউড়া এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের উপর পাকবাহিনী তীব্র হামলা চালায়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর অসংখ্য সদস্য প্রাণ হারান। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।
মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৭ সালে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ক্ষমতাচ্যুত সরকার। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। কয়েক দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। নির্মাণ হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরেও এটি উম্মুক্ত করাসহ উদ্বোধন করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তখন ক্ষমতায় অন্তবর্তী সরকার।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। তারপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে ভারতীয় সৈন্যরাও যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধে সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবেশের দুটি ফটক, ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে পশ্চিমাংশে দেয়ালে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র। সেখানে লেখা-‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা, তুমি আমার বাতাস থেকে মুছো তোমার ধুলো, তুমি বাংলা ছাড়ো।’ পাশেই খোদাই করা লেখা রয়েছে-‘দৈনিক পাকিস্তান বাংলা এবারের মুক্তির সংগ্রাম জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।
মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে ব্রোঞ্জে (পিতলে) লেখা মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী ভারতীয় সেনা সদস্যদের নাম। তার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন অফিসার, ৭০ জন জেসিও, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যান্য র্যাঙ্কের ১৪৮২ জন সদস্য, ইস্টার্ণ থিয়েটার থার্টি বিএসএফ’র ২৯ জন সদস্য, ইস্টার্ন থার্টি এয়ার ফোর্সের ১১ জন কর্মকর্তা, ইস্টার্ন থার্টি নেভির ৬ জন সদস্যের নাম।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘‘এটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। জাঁকজমকপূর্ণভাবে করার কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা একত্রিত হতে পারছেন না। এটি দেখার জন্য মানুষের মাঝে উৎসাহ রয়েছে। জনপ্রতি প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ ও ৩০ টাকা।’’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রঞ্জন চন্দ্র দে ও আশুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রবিউস সারোয়ার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









