সন্তানকে বাঁচানোর শেষ লড়াইয়ে একজন পিতা যে কতটা অসীম সাহসী হতে পারেন, তারই এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন রাঙামাটির লংগদুর ফালান মিয়া। নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানকে মৃত্যুর মুখ থেকে তুলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই হারিয়ে গেলেন কাপ্তাই হ্রদের গভীর জলে।
লংগদু উপজেলার গুলশাখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট মাহিল্যা গ্রামের জেলে ফালান মিয়া, মো. শাহাবুদ্দিনের ছেলে। রোববার সন্ধ্যায় মাছ ধরার ছোট বোটে সার নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কালাপাকুজ্যা ও গুলশাখালী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী ১৪ নম্বর বিল এলাকায় আকস্মিকভাবে নৌকাডুবির শিকার হন তিনি। সঙ্গে ছিল তাঁর ৮-৯ বছর বয়সী শিশুপুত্র।
নৌকা ডুবে যাওয়ার পর চারদিকে যখন শুধু পানি আর অন্ধকার, তখন নিজের জীবন নিয়ে না ভেবে ছেলেকে বাঁচাতেই মরিয়া হয়ে ওঠেন ফালান মিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে পানির মধ্যে সন্তানকে শক্ত করে আগলে রাখেন তিনি। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও সন্তানের হাত ছাড়েননি এক মুহূর্তের জন্য।
একপর্যায়ে দূর থেকে একটি বোট তাদের দেখতে পায়। তখনও সন্তানের নিরাপত্তাই ছিল ফালান মিয়ার একমাত্র চিন্তা। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছেলেকে নিরাপদে ওই বোটে তুলে দেন তিনি। সন্তানকে জীবনের শেষ আশ্রয়ে তুলে দিতে পারলেও নিজের জন্য আর তীরে ফেরার সুযোগ হয়নি তাঁর।
ছেলেকে বোটে তুলে দেওয়ার পরপরই পানিতে তলিয়ে যান ফালান মিয়া। মুহূর্তের সেই দৃশ্য যেন একজন পিতার জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে রইল—নিজে হারিয়ে গিয়ে সন্তানকে বাঁচিয়ে দেওয়া।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর সোমবার সকালে লংগদু ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।
একজন সন্তানের কাছে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; বাবা তাঁর নিরাপদ আশ্রয়। ফালান মিয়া শেষ মুহূর্তেও সেই আশ্রয়ের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানের জীবন রক্ষা করে তিনি রেখে গেলেন পিতৃত্বের এক অনন্য, বেদনাবিধুর দৃষ্টান্ত।
ফালান মিয়া আর কোনোদিন ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফিরবেন না। কিন্তু বেঁচে থাকবে তাঁর সেই শেষ মুহূর্তের ভালোবাসা—‘বাবা নিজে ডুবে গেলেন, কিন্তু সন্তানকে ডুবতে দিলেন না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









