শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার ও চেয়ারম্যান পদ ঘিরে বিরোধ যেন দীর্ঘদিনের এক অস্থিরতার নাম। চার দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ককটেল ও হাতবোমার ব্যবহার। স্থানীয়দের দাবি, গত প্রায় ৪০ বছরে সংঘর্ষ ও বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ অঙ্গহানি বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে তিনজনের মৃত্যু হয়। এরপরও থামেনি বিস্ফোরণের ঘটনা।
কখনো সংঘর্ষের মধ্যে, কখনো বোমা তৈরির সময়, আবার কখনো আগে থেকে মজুত করে রাখা বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হয়ে ঘটছে হতাহত। সম্প্রতি কবরস্থান, বসতবাড়ির সেপটিক ট্যাংকসহ বিভিন্ন স্থান থেকেও বিস্ফোরকের অস্তিত্ব মিলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বোমা তৈরিতে অর্থের জোগান, সরবরাহ ও কারিগরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে শুধু অভিযান চালিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
একের পর এক বিস্ফোরণ
চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি বিলাসপুর ইউনিয়নের মুলাই ব্যাপারীকান্দি এলাকায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন। পরে পুলিশ ও যৌথ বাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ককটেল তৈরির সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক উদ্ধার করে।
এরপর ৩১ মে জানখারকান্দি গ্রামের একটি কবরস্থানের পাশের বাগানে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ২৭ জুলাই চেরাগ আলী বেপারীকান্দি গ্রামের একটি বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাংকে রাখা ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এতে ট্যাংকের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাস্থল থেকে কালো কসটেপের টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আগে থেকে রাখা ককটেলটি বিস্ফোরিত হয়েছে।
সর্বশেষ ১০ আগস্ট পার্শ্ববর্তী মূলনা ইউনিয়নে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে ককটেল বিস্ফোরণে ৭০ বছর বয়সী মান্নান সরদার নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন। একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনায় আশপাশের এলাকাতেও নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বোমার আঘাতে হারিয়েছেন হাত
মেহের আলী মাদবরকান্দি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মোল্লা নিজেও বোমা বিস্ফোরণের শিকার। তাঁর দাবি, শুধু তাঁদের এলাকাতেই অন্তত সাতজনের অঙ্গহানি হয়েছে।
মজিবুর রহমান বলেন, ‘২০১২ সালে সংঘর্ষের সময় আমার সামনে হাতবোমা বিস্ফোরণ হলে মাথা রক্ষা করতে গিয়ে আমার এক হাতের কবজি উড়ে যায়। সেই থেকে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। মাঝেমধ্যে যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতেও পারি না।’
তাঁর অভিযোগ, বাইরে থেকে অর্থের জোগান দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষে মানুষকে জড়ানো হয়। প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষ ও বোমাবাজি বন্ধ করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
স্বজন হারিয়েও বিচার না পাওয়ার অভিযোগ
বোমা বিস্ফোরণে নিহত সোহানের বোন মাজেদা বেগমের অভিযোগ, স্বজন হারানোর পরও তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমার ভাই রাতের খানা খেয়ে ঘুমাইছে। সকালে শুনি আমার ভাই মারা গেছে। আমি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বলে সকালে আসেন, বিকেলে আসেন—এভাবে ঘুরিয়েছে। একপর্যায়ে তারা আমাদের মামলা না নিয়ে উল্টো মামলা করেছে, যেখানে আমার আরেক ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে।’
মাজেদা বলেন, ‘ভাইও মরেছে আমার, জেলও খেটেছে আরেক ভাই। আমরা কোনো বিচার পাইনি।’
নিহত নবীন হোসেনের মা রুবিনার অভিযোগ, আধিপত্যের সংঘাতে সাধারণ পরিবারের তরুণদের ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে মারামারিতে যেতে চায়নি। ঘরে বউ গর্ভবতী ছিল। কেউ তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। ঘর থেকে ভাত খেয়ে বের হওয়াই ছিল শেষ দেখা।’

ঘণ্টায় ২০ হাজার টাকা মজুরির দাবি
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজেকে বোমার কারিগর হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি বোমা তৈরি করি একমাত্র টাকার জন্য। বোমা তৈরি করতে ঘণ্টায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদি হাসান দাবি করেন, আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে সংঘর্ষ হলে পরিচিতজনদের মাধ্যমে বিলাসপুর থেকে ককটেল সংগ্রহ করা হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে সেখান থেকে লোক নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে তাঁর দাবি।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি অভিযোগ করেন, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে রাসেল খাঁনের নাম বোমাবাজিতে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাসেল খাঁন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমি ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে চলে আসি। গত তিন বছর আগে একবার দেশে এসেছিলাম, পরে ইতালি চলে আসি। সব মিলিয়ে দেশে এক বছরের বেশি সময় ছিলাম না। তাছাড়া আমাদের সেখানে ভাই নেই যে আধিপত্য বিস্তার করবে, তাকে আমি আর্থিক সুবিধা দেব।’
তিনি বলেন, ‘আমি যদি আধিপত্য বিস্তার ধরে রাখতে এটা করি, তাহলে দেশে এতগুলো মামলা-হামলা হলো, সেখানে আমার পরিবারের সদস্য, কাছের আত্মীয়দের কেন মামলায় আসামি করা হয়নি?’
আগামী ইউপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি অঞ্চল রয়েছে। সেখানে লোকজন যদি চায়, আমি অবশ্যই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।’
শতাধিক মামলায় আলোচিত দুই পক্ষ
বিলাসপুরের ককটেল-বোমা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আলোচিত কুদ্দুস বেপারী ও তাঁর প্রতিপক্ষ জলিল মাদবর বর্তমানে কারাগারে থাকায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। জাজিরা থানার নথি অনুযায়ী, তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। এসব মামলার মধ্যে হত্যা ও বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা থেকেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। পরে সেই বিরোধ সংঘর্ষ ও বিস্ফোরণের ঘটনায় রূপ নেয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার ক্ষেত্রে তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ
সচেতন নাগরিক ইমরান আল নাজির বলেন, বিলাসপুরের সংকট প্রায় ৪০ বছরের। তাঁর অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিভিন্ন পক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপু ও বিএম মোজাম্মেল হকের নাম উল্লেখ করেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে এই প্রতিবেদনে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।কারণ ইকবাল হোসেন অপু আওয়ামিলীগ সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছে এবং আরেক সাবেক সংসদ সদস্য বিএম মোজাম্মেল হক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন৷
বোমার ক্ষতি সারাজীবনের
জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোমান বাদশাহ বলেন, হাতবোমা কাছাকাছি বিস্ফোরিত হলে অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। চোখের আশপাশে বিস্ফোরণ হলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, ‘বোমার স্প্লিন্টার শরীরে ঢুকে গেলে অনেক সময় তা পুরোপুরি বের করা সম্ভব হয় না। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।’
গুরুতর আহত অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয় বলেও জানান তিনি।
মামলায় দীর্ঘসূত্রতা
শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান খান দিপু বলেন, বিলাসপুরের ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। অধিকাংশ মামলা তদন্তাধীন। কিছু মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং সেগুলো বিচারের জন্য আদালতে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আদালত সাক্ষীদের প্রক্রিয়া দিয়েছে। কিন্তু সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের উপস্থাপন করতে পারছে না। আমরা ইতোমধ্যে প্রশাসনকে অবগত করেছি, যাতে দ্রুত মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দাখিল করা এবং সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা হয়।’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জানুয়ারি ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে নিহত তিনজনের মামলার অভিযোগপত্র এখনো দাখিল হয়নি। মামলাটির তদন্ত চলছে।
‘ন্যায়বিচার না পাওয়ায় কমছে না বোমাবাজি’
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিলাসপুরে বোমাবাজির ঘটনা ঘটছে। কোথাও মামলা হলেও কোথাও ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারেন না।
তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষের হুমকি ও পুলিশের গড়িমড়ি রয়েছে। আদালতে মামলা হলেও পুলিশের তদন্তের কারণে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং নির্দোষ ব্যক্তিরাও আসামি শ্রেণিভুক্ত হয়। ন্যায়বিচার না পাওয়ার ফলেই বোমাবাজির ঘটনা কমছে না।’

‘বোমা তৈরির রসদ আসে বাইরে থেকে’
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তানভীর হোসেন বলেন, পদ্মা-মেঘনার চরাঞ্চলের জনবসতি কম এমন এলাকায় বোমা তৈরির তথ্য রয়েছে। ঢাকা থেকে নদী ও সড়কপথে এসব তৈরির রসদ আনা হয়।
তিনি বলেন, ‘জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব থাকায় মাঝেমধ্যে অভিযানে বেগ পেতে হয়। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিলাসপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এখন যে বিস্ফোরণগুলো ঘটছে, তা মূলত পূর্বে রাখা বোমা, যেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে।’
বোমাবাজির ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অবশিষ্টদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ বলেন, বিলাসপুরে নজরদারি বাড়াতে পুলিশকে বলা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বিলাসপুরে আর যেন কোনো ককটেল বিস্ফোরিত না হয়, সেদিকে নজরদারি বাড়ানোর জন্য পুলিশকে বলেছি। আজ থেকে এখানে গোয়েন্দারা কাজ করবেন। কোথায় কী হয়, তা খুঁজে বের করতে হবে। খুব শিগগির সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হবে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হোসেন জানান, জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সিসিটিভি স্থাপনের কাজ চলছে। স্থায়ী শান্তির জন্য বিলাসপুরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
থামবে কবে এই ‘ককটেল সংস্কৃতি’?
চেয়ারম্যান পদ ও আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-সামাজিক বিরোধ, অর্থের জোগান, বোমা তৈরির কারিগর এবং সংঘর্ষে বিস্ফোরকের ব্যবহার—সব মিলিয়ে বিলাসপুরের সংকট একটি চক্রের মতো ঘুরছে। একটি বিস্ফোরণের পর অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর আবার শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু বিস্ফোরণের পর অভিযান চালিয়ে কি এই সংকটের সমাধান সম্ভব? নাকি বোমা তৈরির উৎস, অর্থের জোগান, সরবরাহব্যবস্থা, কারিগর ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে?
চার দশকের এই সংঘাতের অবসানে কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কেবল বিস্ফোরণের পর তৎপরতা নয়—বোমাবাজির পুরো উৎস ও নেটওয়ার্কের লাগাম টেনে ধরে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে প্রশাসন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









