একজন গীতিকার বেঁচে থাকেন তার গানে—এই কথাটিই যেন সবচেয়ে বেশি সত্য হয়ে ওঠে পাবনার কৃতী সন্তান, কালজয়ী গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ক্ষেত্রে। চার দশক আগে তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে।
বৃস্পতিবার (২০ আগস্ট) তার ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন খ্যাতনামা উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক। মা সুধা মজুমদার ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। ফলে শৈশব থেকেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার সমৃদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন গৌরীপ্রসন্ন।
ছোটবেলা থেকেই গান ও সাহিত্যের প্রতি তর গভীর আগ্রহ ছিল। গ্রামোফোনে গান শোনার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চা করতেন। ছাত্রজীবনেই তার লেখার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং বাংলা ও ইংরেজি—উভয় বিষয়েই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তার পরিচয় হয় কিংবদন্তি সুরকার ও শিল্পী শচীন দেববর্মনের সঙ্গে। কলেজজীবনে নিজের লেখা গান নিয়ে তার কাছে গেলে শচীন দেববর্মন গৌরীপ্রসন্নের প্রতিভা উপলব্ধি করেন। পড়াশোনা শেষ করার শর্তে তাকে গান লেখার সুযোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলা গানের জগতে তার দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা।
পরবর্তীতে শচীন দেববর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমারসহ বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী ও সুরকারের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। তার লেখা গান প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, নস্টালজিয়া ও জীবনবোধকে এমনভাবে তুলে ধরেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

তার অসংখ্য জনপ্রিয় সৃষ্টির মধ্যে কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই,এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন,আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে, যদি কাগজে লেখো নাম জীবন খাতার প্রতি পাতায় সহ বহু গান আজও সমান জনপ্রিয়।
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল আত্মিক ও গভীর। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতে চলে গেলেও জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি তার টান কখনো কমেনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি কলম ধরেন এবং মাগো ভাবনা কেন এর মতো অনুপ্রেরণাদায়ী গান রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গান বাঙালির মনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করে।
গৌরীপ্রসন্নের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সহজ অথচ গভীর আবেগ। প্রেমিক-প্রেমিকার অভিমান, ভালোবাসার আকুলতা, বিচ্ছেদের বেদনা, নিঃসঙ্গতা, জীবনের টানাপোড়েন কিংবা দেশের প্রতি ভালোবাসা—মানুষের চেনা অনুভূতিগুলো তিনি অত্যন্ত সহজ ও মায়াময় ভাষায় গানে তুলে ধরেছেন।
তার গানের কথা ও সুরের মেলবন্ধন ছিল অসাধারণ। শব্দের ভেতর তিনি তৈরি করতেন আবেগ, দৃশ্যকল্প ও অনুভূতির এক অনন্য জগৎ। তাই তার গান শুধু শোনা যায় না, অনুভবও করা যায়। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে—কিন্তু মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলো বদলায়নি। আর সেই কারণেই গৌরীপ্রসন্নের গান আজও পুরোনো হয়ে যায়নি।
জীবনের শেষ সময়েও গান লেখা থেকে বিরত হননি এই কিংবদন্তি গীতিকার। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য তাকে বোম্বেতে নেওয়া হয়। শেষদিকের সৃষ্টির মধ্যে “এবার তাহলে আমি যাই, সুখে থাক ভালো থাক, মন থেকে এই চাই” গানটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় তার মৃত্যু হয়।

আজ তার মৃত্যুর ৪০ বছর। অথচ চার দশক পরও প্রেমে, বিরহে, আনন্দে, বেদনায় কিংবা দেশপ্রেমের আবেগে মানুষের মনে ফিরে আসে তার গান। নতুন প্রজন্ম তার সৃষ্টি শুনছে, শিল্পীরা নতুন করে পরিবেশন করছেন, সংগীতপ্রেমীরা বারবার আবিষ্কার করছেন তাঁর গানের সৌন্দর্য।
একজন শিল্পীর শারীরিক মৃত্যু তার সৃষ্টির মৃত্যু নয়—গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
তিনি নেই, কিন্তু তার গান আছে। তিনি নেই, কিন্তু তার শব্দ আছে। তার সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি আজও কথা বলেন।
তাই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করা শুধু একজন প্রয়াত গীতিকারকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলা গানের এক গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। পাবনার এই কৃতী সন্তান তার গানের মধ্য দিয়ে আজও অমর
—গানে গানে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









