সিলেটের বালাগঞ্জে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষক হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের অভিভাবক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, উপজেলা শিক্ষা কমিটির সাবেক প্রতিনিধি ও এক শিক্ষিকার পৃথক লিখিত আবেদনে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা সালমা সুলতানাকে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া আবেদনে সালমা সুলতানা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। একই দিন মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ দেন উপজেলা শিক্ষা কমিটির সাবেক প্রতিনিধি কুলসুমা বেগম। এর আগে গত ৩০ জুলাই বিদ্যালয়ের অভিভাবকেরাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ দেন।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগে সালমা সুলতানা তার আবেদনে বলেন, ২০০৩ সাল থেকে তিনি পশ্চিম গৌরীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং অভিভাবকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা না করিয়ে ঝোপঝাড় থেকে শাকপাতা তুলতে পাঠানো এবং বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের দরজা-জানালা ও বিভিন্ন আসবাব লুকিয়ে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলেকা বেগম। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে তিনি এদিনকে বলেন, অভিযোগকারী শিক্ষক তাঁর জুনিয়র সহকর্মী। প্রায় চার বছর আগে তাকে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও তিনি দায়িত্ব নেননি। ফলে বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য তাকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। অভিযোগের কারণ তিনি জানেন না দাবি করে আলেকা বলেন, তার পক্ষ থেকে যা বলার, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবেন। তবে শিশুদের দিয়ে শাক-লতাপাতা তোলা এবং পুরোনো আসবাব বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
সালমা সুলতানার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম আড়াল করতে মাহমুদুল হাসানের যোগসাজশে অভিভাবক ও দাতা সদস্যদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। সবার অংশগ্রহণে কমিটি গঠনের পরামর্শ দেওয়ায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পরে অভিভাবক ও দাতা সদস্যরা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ওই কমিটি স্থগিত হয়।
উপজেলা শিক্ষা কমিটির সাবেক প্রতিনিধি কুলসুমা বেগমের অভিযোগেও মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলা, ক্ষমতার প্রভাব দেখানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
বালাগঞ্জ উপজেলার একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, মাহমুদুল হাসান নিজেই সময়মতো অফিসে আসেন না। তার বিরুদ্ধে পছন্দের লোকজনকে নিয়ে একটি বলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। তাদের দাবি, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, শিক্ষক বদলিসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম তিনি ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে পরিচালনা করেন। বদলি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির আশঙ্কায় অনেকে এসব বিষয়ে কথা বলতে সাহস পান না।
অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল হাসান এদিনকে বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারকি করতে হয়। তার অধীনে প্রায় ১৫টি বিদ্যালয় রয়েছে। তিনজন কর্মকর্তা মিলে এসব বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। অনেক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টার আগেই পাঠদান শুরু হয়। তাই সরেজমিনে কার্যক্রম দেখতে অনেক সময় অফিস সময়ের আগেই বিদ্যালয়ে যেতে হয়। পূর্ব গৌরীপুরের কয়েকটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনজন কর্মকর্তার মধ্যে বিদ্যালয়গুলো এলাকাভিত্তিক ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তাই কে কোন বিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন, তা নির্ধারিত দায়িত্বের ওপর নির্ভর করে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করে মাহমুদুল বলেন, প্রধান শিক্ষকেরা প্রশাসনিক প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তবে তার এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন একাধিক শিক্ষক। তাদের অভিযোগ, মাহমুদুল হাসানের আশীর্বাদপুষ্ট কয়েকজন শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়।
বিদ্যালয় ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি অবশ্য জানেন না বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রকিব ভূঁইয়া। তিনি এদিনকে বলেন, “সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট বিদ্যালয় ভাগ করে দেওয়া হয়নি। ফলে নির্ধারিত এলাকার ভিত্তিতে বিদ্যালয় পরিদর্শনের কোনো ব্যবস্থাও নেই।”
বালাগঞ্জের ইউএনও মেরিনা দেবনাথ বলেন, “আমি এখনো অভিযোগের কপি পাইনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাখাওয়াত এরশেদ শনিবার দুপুরে এদিনকে বলেন, “আমরা গত সোমবার পৃথক তিনটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









