বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উত্তর গেটওয়ে এবং দেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে ওয়্যারহাউস বা গুদামঘর এবং লজিস্টিকস হাবের বিস্তার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে এবং সীতাকুণ্ডের বড় দারোগার হাট ও সলিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব আধুনিক গুদাম ও কনটেইনার ডিপো বা লজিস্টিকস পার্ক এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, কারখানার কাঁচামাল সংরক্ষণ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে সীতাকুণ্ড এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ট্রানজিট হাবে রূপ নিচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও দেশের প্রধান স্থলপথের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক সুবিধার কারণেই ব্যবসায়ীরা ওয়্যারহাউস নির্মাণের জন্য সীতাকুণ্ডকে বেছে নিচ্ছেন। তৈরি পোশাক, শিল্পপণ্য, ভোগ্যপণ্য এবং বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণ এবং কম সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের ক্ষেত্রে এসব লজিস্টিকস হাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো এখানে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও প্রশস্ত গুদামঘর নির্মাণ করায় স্থানীয় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সীতাকুণ্ডের বড় দারোগার হাট এলাকার বিভিন্ন লজিস্টিকস হাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি হাবে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জনের মতো স্থানীয় তরুণ-যুবকের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে।
তবে এই বাণিজ্যিক প্রসারের পাশাপাশি কিছু স্থানীয় চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশগত উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। অপরিকল্পিতভাবে ওয়্যারহাউস বা ভারী যানবাহনের ডিপো গড়ে ওঠার কারণে মহাসড়কের সংযোগ সড়কগুলোতে নিয়মিত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে কাভার্ড ভ্যান, কন্টেইনারবাহী লরি ও ট্রেইলারের অবাধ চলাচল এবং যত্রতত্র ভারী গাড়ি পার্কিংয়ের ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া গ্রামীণ জনপদ বা কৃষি জমির কাছাকাছি এলাকায় গুদামঘর নির্মাণের ফলে স্থানীয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ কাজ করছে।
এই শিল্প খাতের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে লজিস্টিকস হাব ও ওয়্যারহাউসগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যত্রতত্র গুদামঘর না বানিয়ে নির্দিষ্ট জোনিং বা এলাকার মধ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত লজিস্টিকস পার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, ভারী যান চলাচলের জন্য বিকল্প রুট বা বাইপাস সড়ক নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত পার্কিং ইয়ার্ডের ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকবে। পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে গুদামগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তার আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কঠোর নজরদারি থাকা আবশ্যক।
সব মিলিয়ে, সীতাকুণ্ডে ওয়্যারহাউস ও লজিস্টিকস হাবের এই বিস্তার কেবল স্থানীয় অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করছে না, বরং জাতীয় বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইনকে আরও গতিশীল করে তুলছে। সঠিক পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই খাতটি সীতাকুণ্ডের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় আরও বড় এবং ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









