দেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্পাঞ্চল হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে শত শত রোলিং মিল, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড, সিমেন্ট কারখানা এবং লজিস্টিকস হাব গড়ে উঠেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এই শিল্পাঞ্চলটির অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর বিশাল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিনিয়ত বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে। পরিবেশ দূষণ, ভারী যানের কারণে সড়ক ভাঙন এবং জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর (CSR) কার্যক্রমের গুরুত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাস্তবে এই সিএসআর তহবিলের সঠিক ব্যবহার ও সুফল নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।
সীতাকুণ্ডের কুমিরা, ভাটিয়ারী, ফৌজদারহাট এবং বড় দারোগার হাট এলাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ঘুরে স্থানীয় সুধীজন ও বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আইনগত ও নৈতিকভাবে প্রতিটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করার কথা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সিএসআর কার্যক্রম কেবল কাগজকলম বা শীতকালে নামমাত্র কম্বল বিতরণ কিংবা আলংকারিক অনুদানের মতো খয়রাতি সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বড় বড় সাইনবোর্ড সর্বস্ব অনুদান দিলেও স্থানীয় জনপদের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো সমাধানে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখছে না। বিশেষ করে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও সিমেন্ট কারখানাগুলোর বিষাক্ত বর্জ্য ও কালো ধোঁয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা বা বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মিল মালিকদের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
অবশ্য এর বিপরীতে কিছু শিল্পগ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। বিশেষ করে কিছু নামী শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থানীয় দুস্থ শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান কিংবা গ্রামীণ সংযোগ সড়ক মেরামতে মাঝেমধ্যে সহায়তা প্রদান করে থাকে। তবে এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডের মতো একটি অতি সংবেদনশীল ভারী শিল্পাঞ্চলে সিএসআর কার্যক্রমকে স্বেচ্ছাধীন বা অনুদানের মানসিকতা থেকে বের করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি। কারখানাগুলোর দূষণ ও পরিবেশগত ক্ষতির অনুপাতে সিএসআর ফান্ডের পরিমাণ নির্ধারণ এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ তদারকি কমিটি গঠন করা দরকার।
এই সামাজিক দায়বদ্ধতার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে সীতাকুণ্ডের সার্বিক জীবনমানে এক বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। শিল্প মালিকদের অনুধাবন করতে হবে যে, কেবল মুনাফা অর্জনই ব্যবসার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না; যে মাটি ও মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে কারখানাগুলো কোটি কোটি টাকা আয় করছে, তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। স্থানীয় যুবসমাজ ও এলাকাবাসীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সিএসআর তহবিলকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে শিল্প ও জনগণের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর হবে।
সব মিলিয়ে, সীতাকুণ্ডে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ ও স্বচ্ছ করে তুলতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর প্রশাসনিক মনিটরিং এবং শিল্প মালিকদের আন্তরিক সদিচ্ছা থাকলে এই সিএসআর তহবিলই হতে পারে সীতাকুণ্ডের টেকসই উন্নয়ন ও জনকল্যাণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









