খালের পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত। কোথাও জমে আছে পচা বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা। রোদ বাড়লে গন্ধ আরও তীব্র হয়। খালের পাশের সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নাক-মুখ চেপে ধরতে হয় অনেককে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাশের একটি বড় পোলট্রি খামারের বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে এই খালে পড়ছে।
ঘটনাটি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের চর শ্রীরামপুর এলাকায়। জায়গাটি গৌরীপুর উপজেলার একেবারে শেষ প্রান্তে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সাহেব কাচারি বাজারের কাছাকাছি। পাশ দিয়েই গেছে ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে খালঘেঁষা নাফিসা এগ্রো ফার্ম লিমিটেডের পোলট্রি খামার। তাঁদের দাবি, খামারের মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্যমিশ্রিত পানি খালে পড়ায় পানির স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়েছে। এতে একদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষাকালে সেই পানি আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে ফসলের ক্ষতি করছে।
অভিযোগ রয়েছে আরও একটি বিষয় নিয়ে। খামারে প্রবেশের জন্য খালের ওপর তৈরি করা রাস্তার নিচে খালের পুরো প্রস্থ খোলা না রেখে পাশাপাশি দুটি গোলাকার চোঙা বা পাইপ বসানো হয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের পানি ঘোলা ও কালচে। কোথাও পানি প্রায় স্থির হয়ে আছে। খালের কয়েকটি স্থানে পচা ময়লা ও আবর্জনা জমে রয়েছে। আশপাশেই রয়েছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি ও ব্যস্ত সড়ক।
চর শ্রীরামপুরের বাসিন্দা মনসুর খাঁ বলেন, তিনি নিয়মিত ওই পথ দিয়ে চলাচল করেন। তাঁর অভিযোগ, খামারের ভেতর থেকে পাইপ দিয়ে মুরগির বর্জ্য খালে ছাড়া হয়। বর্জ্য ছাড়ার পর দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়।
মনসুর খাঁ বলেন, রোদ উঠলে খালের গন্ধ আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। তখন ওই পথ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে যায়।
বিজয়নগর এলাকার কৃষক মো. সিরুজুল ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, সকাল ও সন্ধ্যার দিকে দুর্গন্ধ বেশি অনুভূত হয়। কখনো গন্ধ এতটাই তীব্র হয় যে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পোলট্রি বর্জ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনাও খালে পড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে খালটি পরিষ্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হয়েছে।
খামারে প্রবেশের পথের কাছে গিয়ে দেখা যায়, খালের ওপর একটি সেতু-সদৃশ রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার নিচে খালের পুরো প্রস্থ দিয়ে পানি যাওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি বসানো দুটি গোলাকার পাইপ বা চোঙার মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নাফিসা এগ্রো ফার্মে যানবাহন প্রবেশের রাস্তা তৈরির সময় এই দুটি চোঙা বসানো হয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য, শুষ্ক মৌসুমে পাইপ দিয়ে কিছু পানি বের হলেও বর্ষায় খালে পানির চাপ বাড়লে দুটি পাইপ দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। তখন উজানের দিকে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পরে সেই পানি কৃষিজমিতে উঠে যায়।
স্থানীয় একজন কৃষক বলেন, বেশি বৃষ্টি হলে পানি আটকে যায়। খালের পানি বের হওয়ার পথ কমে যাওয়ায় জমিতে পানি উঠে ফসলের ক্ষতি হয়।
মো. সিরুজুল ইসলাম বলেন, গত বছর পানি আটকে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ঘটনাস্থলে এসেছিলেন বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, তখন সমস্যার সমাধানের জন্য সময় নেওয়া হলেও পরে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
খালের ওপর ওই প্রবেশপথ এবং দুটি চোঙা বসানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি।
খালের দুপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বর্ষায় খালের বর্জ্যমিশ্রিত পানি জমিতে ঢুকলে ফসল নষ্ট হয়।
কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, খালের পানি জমিতে উঠলে গাছ পচে যায়। আগেও কৃষকেরা এ কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, একসময় এই খালে মাছ পাওয়া যেত। এখন পানি ও পরিবেশের অবস্থা এমন হয়েছে যে আগের মতো মাছ দেখা যায় না।
মো. সিরুজুল ইসলামেরও দাবি, খালের পানি ফসলি জমিতে ঢুকলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। খালে মাছও টিকে থাকতে পারছে না বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা খালের পানিকে ‘বিষাক্ত’ হিসেবে বর্ণনা করলেও পানির কোনো পরীক্ষাগার প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে পানিতে কী ধরনের দূষক রয়েছে এবং দূষণের মাত্রা কত, তা নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
খালের পাশে একটি মাঠে খেলতে আসা কয়েকজন শিশু-কিশোরও দুর্গন্ধের কারণে ভোগান্তির কথা জানিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, অনেক সময় খাল থেকে এত বেশি দুর্গন্ধ আসে যে মাঠে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। কখনো খেলাধুলা বন্ধ করেই বাড়ি ফিরে যেতে হয়।
এক শিক্ষার্থী বলে, খালটি পরিষ্কার করা হলে তারা স্বাভাবিকভাবে মাঠে খেলাধুলা করতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই দাবি খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে নিয়মিত পরিষ্কার এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্গন্ধের প্রভাব পড়ছে পাশের সাহেব কাচারি বাজারেও।
ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, খালের পচা পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে দোকানে বসে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। ক্রেতারাও অস্বস্তিতে পড়েন।
স্থানীয় আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী ও পথচারী জানান, খালের কাছে এলেই পচা বর্জ্যের গন্ধ পাওয়া যায়। বিশেষ করে গরম ও রোদের দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
পাশেই ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক হওয়ায় এই দুর্গন্ধের মুখে পড়তে হচ্ছে ওই পথ দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদেরও।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, খালের দূষণ ও পানিনিষ্কাশনের সমস্যা নিয়ে আগেও বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলা হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও পাওয়া গেছে। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থানীয় কৃষক শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ চান না। তাঁরা চান প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মেনে চলুক, বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করুক এবং খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালু থাকবে, উৎপাদন হবে কিন্তু তার বর্জ্যের কারণে সাধারণ মানুষ ও কৃষিজমি কেন দুর্ভোগের শিকার হবে?
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত 'নাফিসা এগ্রো প্রডাক্টস লিঃ'-এর জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) জাহাঙ্গীর আলমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, "আমি একটু ব্যস্ত আছি এবং একটি মিটিংয়ে আছি, পরে ফোন দেব।"
ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খালের ওপর নির্মিত রাস্তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারিত বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ নূর কুতুবে আলম সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, খামারটির নিজস্ব বায়োগ্যাস প্লান্ট সম্ভবত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খামারটি পরিদর্শন করা হয়েছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তাদের চিঠি (নোটিশ) দেওয়া হয়েছে। জবাব না পেলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।"
খালের ওপর অবৈধ কালভার্ট নির্মাণের বিষয়ে ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শামিম হাসনাইন মাহমুদ-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান, সরকারি খালের ওপর ব্যক্তিগত কালভার্ট নির্মাণের কোনো অনুমতি তাদের দেওয়া হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে সত্যতা যাচাই করা হবে। সরকারি খালে এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন হয়। তাই জেলা প্রশাসক (ডিসি) মহোদয়কে অবহিত করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে খালে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। তখন সতর্ক করার পর খাল পরিষ্কার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এখন যদি তারা নিয়মিত এভাবে বর্জ্য ফেলে থাকে, তাহলে আর মেনে নেওয়া হবে না। সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিষয়টি যাচাই করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ঘটনাস্থলে পাঠানোর কথাও জানান ইউএনও।
দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধ ও দূষণ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









