বরিশাল নগরীর পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতির ওপর নেমে এসেছে মারাত্মক বিপর্যয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নগরীর কাউনিয়া ও আশপাশের এলাকায় চলছে পুকুর এবং নিচু জলাশয় ভরাটের এক সর্বগ্রাসী মহোৎসব। স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ মদদে নদীর বালু দিয়ে দিনরাত ভরাট করা হচ্ছে বছরের পর বছর টিকে থাকা প্রাকৃতিক জলাধারগুলো। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে দিনে দিনে কাউনিয়া এলাকাটি যেন পরিণত হচ্ছে এক বালুচরে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী ও কীর্তনখোলা নদীতে নোঙর করা বড় বড় বাল্কহেড থেকে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরীর ভেতরে বালু পাঠানো হচ্ছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ সারতে ভরাট চক্রটি বেছে নিয়েছে রাতের অন্ধকারকে। প্রতিদিন গভীর রাতে ৮টি ড্রেজারের সাহায্যে প্রায় ২২টি দীর্ঘ পাইপলাইন চালু করে একের পর এক পুকুর ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে বালু।
নগরীর ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড বর্তমানে পুরোটাই এ অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে কাউনিয়ার পুরান পাড়া, কাউনিয়া হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকেয়া আজিম সড়ক, তোফাজ্জেল হোসেন সড়ক, ময়লা খোলা, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা, মনসা গলি, কাউনিয়া ১ম গলি এবং বিসিক এলাকার অলিগলিতে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ড্রেজারের ক্ষতিকর পাইপ সংযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই জলাশয় ভরাট চক্রটি চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ পুরো নদী ও ড্রেজার সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের নাম।
দলীয় পটপরিবর্তন হলেও আবিদের এ অবৈধ সাম্রাজ্যে কোনো চির ধরেনি। তিনি নিজে আড়ালে থেকে সহযোগীদের মাধ্যমে তালতলী, কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ড্রেজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে তিনি এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, থানা পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের একশ্রেণির সড়ক পরিদর্শককে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা বা মাসোহারা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করছেন।
গোপনীয়তার শর্তে কালিজিরা এলাকার এক ড্রেজার মালিক স্বীকার করেন, ‘‘আবিদ ভাই পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। ড্রেজার চালাতে গেলে বিভিন্ন স্তরে ৫ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এমনকি এক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাকে এককালীন ২০ লাখ টাকাসহ নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। সবাইকে ম্যানেজ না করে শহরের ভেতর ড্রেজার চালানো সম্ভব নয়।’’
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।
কাউনিয়ার পুরান পাড়ার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘মাস আটেক আগে একদল যুবক এসে জোর করে আমার জমির ওপর ড্রেজারের পাইপ বসিয়ে দেয়। বাধা দিলে ভয়ভীতি দেখায়। পাইপের কারণে আমি নিজ জমিতে যাতায়াতের রাস্তাটুকুও তৈরি করতে পারছি না।’’
রোকেয়া আজিম সড়কের বাসিন্দা লাবলু হাওলাদার জানান, গত এক-দেড় মাসের মধ্যে রোকেয়া আজিম সড়ক এলাকার প্রায় ৭-৮টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে। ভরাট শেষে বালুর ওপর দ্রুত ঘাস গজে ওঠায় এখন নতুন কেউ এলে বুঝতেই পারবে না যে সেখানে বিশাল কোনো জলাশয় ছিল।
হাউজিং এলাকার সাইদুর রহমান কামাল বলেন, ‘‘আইন অনুযায়ী পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ প্রশাসনের সামনেই ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় পুকুর গায়েব হয়ে গেছে। এভাবে আর ৩ মাস চললে কাউনিয়ায় কোনো পানির উৎস অবশিষ্ট থাকবে না।’’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুর দিকে এক ঈদের ছুটিতে কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের মধ্য দিয়ে এ চক্রটির সূচনা হয়। এরপর থেকে ক্রমাগত বেড়েছে পাইপলাইনের সংখ্যা, আর সংকুচিত হয়েছে জলাশয়।
সম্প্রতি কোস্টগার্ড বেশ কয়েকটি ড্রেজার ও বাল্কহেড আটক করে জরিমানা করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে মূল হোতারা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, ‘‘গত ৫০ বছরে বরিশাল নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ পুকুর বিলীন হয়ে গেছে। আশির দশকে হাজারেরও বেশি পুকুর থাকলেও এখন পুরো নগরীতে ব্যবহারযোগ্য পুকুর ৩০০ থেকে ৪০০টির বেশি হবে না।’’
বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বলেন, ‘‘সারা দেশে যখন খাল খনন ও জলাধার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন বরিশালে একের পর এক জলাশয় ভরাটের খবর উদ্বেগজনক।’’
তিনি বলেন, ‘‘যারা পুকুর ও জলাশয় ভরাটের মতো অবৈধ কাজে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।’’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘‘নগরীতে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের অনুমতি আগের প্রশাসনের সময়ে দেওয়া হয়েছিল।’’
তিনি বলেন, ‘‘ড্রেজারগুলোর বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সড়ক পরিদর্শকদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও খুব জরুরি।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









