সীতাকুণ্ড উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সুপেয় পানি। বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্য এবং প্রাকৃতিক নানা পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় জনপদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে শতবর্ষী কূপ, নলকূপ আর সাধারণ পাম্পের মিষ্টি পানির পরিচিত স্বাদ আজ চরম তিক্ততায় রূপ নিয়েছে। বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা এ পানি ঘিরেই উপকূলের মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন, যা তাদের স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির ওপরও ফেলছে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব।
উপকূলের বাঁশবাড়িয়া, মুরাদপুর, সৈয়দপুর ও কুমিরা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সুপেয় পানির তীব্র সংকট এখানকার মানুষের প্রতিদিনের রুটিন বদলে দিয়েছে। একসময় বাড়ির আঙিনায় বা সামান্য দূরে নলকূপ বসালেই যে স্বচ্ছ মিষ্টি পানি পাওয়া যেত, আজ তা শুধুই অতীত স্মৃতি। গভীর নলকূপ স্থাপন ছাড়া মাটির ভূগর্ভথেকে এখন আর ব্যবহারযোগ্য পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। আর সাধারণ দরিদ্র মানুষের পক্ষে গভীর নলকূপ বসানো বা ব্যয়বহুল ফিল্টারিং যন্ত্র কেনা অসম্ভব হওয়ায় তাদের ভরসা এখন বহুদূর থেকে হেঁটে বা রিকশায় আনা জারের পানি।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দশকে লবণাক্ততা যেভাবে বেড়েছে, তাতে জীবনযাত্রার ধরন পুরোপুরি উল্টে গেছে। আগে বাড়িতে অতিথি এলে শরবত বা গ্লাসভর্তি মিষ্টি পানি দিয়ে আপ্যায়নের রেওয়াজ ছিল, যা আজ কেবলই অতীত। রান্নার কাজেও এখন আর কুয়ো বা সাধারণ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করা যায় না। খাবারের স্বাদ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে থালাবাসন ধোয়া কিংবা গোসলেও দেখা দিচ্ছে নানা চর্মরোগ। পানির এ লবণাক্ততা উপকূলীয় জনপদের মানুষের শরীরেও হানা দিচ্ছে, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউসুফ আলী আকুতিভরা কণ্ঠে বলেন, ‘‘আগে তো চোখের পলকে টিউবওয়েল টিপে তৃষ্ণা মিটাতাম। এখন এক ফোঁটা পানি মুখে তুললেই মনে হয় সমুদ্রের লবন খাচ্ছি। দিনে অন্তত দুই-তিন কিলোমিটার দূর থেকে খাওয়ার পানি কিনে আনতে হয়। আমাদের এ দুর্দশা দেখার কেউ নেই।’’
শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, এলাকার গবাদিপশু ও কৃষিকাজের ওপরও এ লবণাক্ত পানির বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ফসলি জমির উর্বরতা শক্তি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
পানির এ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ‘‘সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং সোলার প্যানেলভিত্তিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আশা করি খুব দ্রুতই এ সংকট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও উপকূলের সাধারণ মানুষ বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি এখনই জরুরি ভিত্তিতে সুপেয় পানির বিকল্প ব্যবস্থা না করলে এ জনপদে জনজীবন একসময় মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। প্রকৃতির এ নির্মম আগ্রাসনে সীতাকুণ্ডের উপকুলীয় মানুষের পানির অভ্যাস বদলে যাওয়ার এ করুণ বাস্তবতাই আজ তাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









