রাজশাহীর চারঘাটে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পুলিশ সার্জেন্টের বিরুদ্ধে বাড়িতে তালা দিয়ে দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এতে দুই মাস ধরে নিজ বাড়িতে যেতে পারছেন না সাইদুর রহমান শামীম (৫৫) নামে এক ব্যক্তি। বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করলেই তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। এ ঘটনায় থানা, পৌরসভাসহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে পাশের দুর্গাপুর উপজেলায় পুরোনো বাড়িতে থাকছেন শামীম।
অভিযুক্ত পুলিশ সার্জেন্টের নাম আসিফ আহমেদ রবিন। তিনি বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, জমিটি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির কাছাকাছি এবং বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় পুলিশ সার্জেন্ট আসিফ আহমেদ রবিন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিকে ব্যবহার করে সেটি নিজের দখলে নিতে চাইছেন। তাঁর প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসনের কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
থানায় দেওয়া শামীমের লিখিত অভিযোগ ও সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে চারঘাট উপজেলার সরদহ বাজার এলাকায় বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের পাশে ১২ শতক জমি কিনে বাড়ি করেন বোরহানুর রহমান আঙ্গুর। তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। ২০২৫ সালে বোরহানুর রহমান মারা যাওয়ার পর মনোয়ারা বেগম তাঁর দেবর সাইদুর রহমান শামীমের কাছে থাকতেন।
শামীমের দাবি, নিঃসন্তান মনোয়ারা বেগম স্বামীর রেখে যাওয়া ১২ শতক জমির মধ্যে নিজের প্রাপ্য ৩ দশমিক ১৩ শতক জমি তাঁর নামে লিখে দেন। গত ২ এপ্রিল মনোয়ারা বেগম মারা যাওয়ার পর ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া নিজের অংশ ও ভাবির কাছ থেকে পাওয়া জমি বুঝে নেন তিনি।
তবে গত ২ আগস্ট ওই জমিতে থাকা আধাপাকা বাড়িতে তালা দেওয়া হয়। মনোয়ারা বেগমের ভাই আজিজুল ইসলামের ছেলে পুলিশ সার্জেন্ট আসিফ আহমেদ রবিন স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে তালা দেন।
এ ঘটনার পর জমির দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চারঘাট মডেল থানা, চারঘাট পৌরসভাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন শামীম। গত ১৯ আগস্ট চারঘাট থানায় দুই পক্ষ ও স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে উভয় পক্ষকে জমির দলিল দেখাতে বলা হলে শামীম দলিল উপস্থাপন করেন। তবে আসিফ আহমেদ কোনো দলিল দেখাতে পারেননি।
এ সময় শামীমের দলিল ভুয়া দাবি করে তা প্রমাণের জন্য সাত দিনের সময় চান আসিফ। সাত দিন পর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একাধিকবার যোগাযোগ করলেও আসিফের পক্ষ থেকে আর সাড়া পাওয়া যায়নি। বাড়ির তালাও খোলা হয়নি। এরপর শামীম নিজ বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করলে আসিফের লোকজন তাঁকে হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ। সেই থেকে বাড়িছাড়া রয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সরদহ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, মনোয়ারা বেগম জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর ভাই আজিজুল ইসলাম ও ভাইয়ের ছেলে আসিফ আহমেদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি সরদহ ছেড়ে দুর্গাপুরে দেবর শামীমের কাছে থাকতেন। সন্তান না থাকায় নিজের জমিও শামীমকে দিয়েছেন। অথচ এখন স্থানীয় কিছু মাস্তান ভাড়া করে সার্জেন্ট আসিফ বাড়িতে তালা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী সাইদুর রহমান শামীম বলেন, ‘দুই মাস ধরে নিজের বাড়িতে যেতে পারছি না। বাড়িতে গেলেই মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে আসিফ আহমেদের লোকজন। আসিফ নিজেই বাড়িতে তালা দিয়েছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি নিজেই আইন লঙ্ঘন করছেন। থানায় অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাইনি। সাত দিনের মধ্যে দলিল ভুয়া প্রমাণের কথা বলে আর যোগাযোগ করেননি। উল্টো পুলিশের লোকের বিরুদ্ধে থানায় সমাধান না চেয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ।’
তবে জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পুলিশ সার্জেন্ট আসিফ আহমেদ রবিন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে বাড়িতে তালা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। পরে বলেন, ‘আমি তালা লাগাইনি, অন্য লোকজন লাগিয়েছে।’ জমির মালিকানা দাবি করে তিনি বলেন, ফুফু মারা যাওয়ায় জমিটি এখন আমার। ফুফু শামীমের বাড়িতে থাকার সময় তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে জোর করে ভুয়া দলিল করা হয়েছে।
চারঘাট মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম বলেন, জমির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সাত দিন পর দুই পক্ষকে নিয়ে আবার বসার কথা ছিল। কিন্তু সার্জেন্ট আসিফ আহমেদের পক্ষের সঙ্গে পরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে অভিযোগকারী সাইদুর রহমান শামীমকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









