রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা। নিয়মিত কেন্দ্র না খোলা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনুপস্থিতি, জনবল সংকট ও দীর্ঘদিন ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামের মানুষ। সামান্য অসুস্থতায়ও তাঁদের নির্ভর করতে হচ্ছে গ্রাম্য চিকিৎসক ও ওষুধের দোকানের ওপর। অবস্থার অবনতি হলে যেতে হচ্ছে দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
উপজেলার চারটি ইউনিয়নে থাকা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সরেজমিনে অন্তত দুটি কেন্দ্রে টানা দুই শনিবার তালা ঝুলতে দেখা গেছে। অন্য একটি কেন্দ্র খোলা থাকলেও সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সবাইকে পাওয়া যায়নি। এদিকে প্রায় ছয় মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, স্বাভাবিক প্রসব, মা ও নবজাতকের পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য পরামর্শ এবং সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কথা। পাশাপাশি বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ বিতরণ এবং জটিল রোগীদের উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকার কথা।
প্রতিটি কেন্দ্রে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, ফার্মাসিস্ট, আয়া এবং অফিস সহায়ক বা নিরাপত্তাপ্রহরীর পদ রয়েছে।
গত ১৭ ও ২৪ অক্টোবর সরেজমিনে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পরিদর্শন করে নানা অনিয়মের চিত্র দেখা যায়। ভায়ালক্ষীপুর ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে দুই দিনই তালা ঝুলতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। নিমপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকলেও সেখানে শুধু ফার্মাসিস্টকে পাওয়া যায়। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার পদায়ন থাকলেও তাঁকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।
শনিবার বন্ধ থাকে ভায়ালক্ষীপুর কেন্দ্র
গত শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে অবস্থান করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কেন্দ্রটির আশপাশে ঝোপঝাড় তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জিনারুল ইসলাম বলেন, শনিবার কেন্দ্রটি সাধারণত খোলা হয় না। রোগীদের জানানো হয়, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। এ কারণে শনিবার রোগীরাও আর সেখানে যান না।
তিনি আরও বলেন, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও অফিস সহায়কের পদায়ন থাকলেও অধিকাংশ দিন শুধু অফিস সহায়ককে পাওয়া যায়। তিনিও কয়েক ঘণ্টা থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ করে চলে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা রঙিলা বেগম বলেন, আগে এই কেন্দ্রে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন। এখন শুধু পিয়ন বসে থাকেন। সামান্য অসুস্থ হলেও ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। স্থানীয় ওষুধের দোকানে গেলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার বিষয়ে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা আম্বিয়া খাতুন বলেন, শনিবার পূজার ছুটির কারণে কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। রোববার থেকে খুলবেন। তবে শনিবার সরকারি ছুটি নয় এবং তিনি নিজেও হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন—এমনটি জানানো হলে পরে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ছুটি কাটাচ্ছেন, এটি সরকারি ছুটি নয়। আগের শনিবারও অসুস্থতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে জানিয়েছিলেন। অফিস সহায়ক কেন আসেননি, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
ইউসুফপুর কেন্দ্রেও তালা
গত শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে অবস্থান করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, অধিকাংশ সময়ই কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। ওষুধ সরবরাহ নেই, আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও নিয়মিত আসেন না। ফলে গ্রামের মানুষ সামান্য জ্বর-কাশির চিকিৎসার জন্য ওষুধের দোকানে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সঠিক চিকিৎসা পরামর্শ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার বিষয়ে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফারজানা ইয়াসমিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। ছুটিতে আছেন কি না জানতে চাইলে পরে জানাবেন বলে জানান।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নারী ও শিশুরা
বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের চারঘাট উপজেলা সমন্বয়কারী আঞ্জুমান আরা বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলো গর্ভবতী নারী, মা ও শিশুদের চিকিৎসা পরামর্শের অন্যতম জায়গা। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা, সময়মতো কেন্দ্র না খোলা ও জনবল সংকটের কারণে গ্রামীণ নারীদের উপজেলা কিংবা জেলা সদরে যেতে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পক্ষে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে দূরে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রামের নারী ও শিশুরা।
চারঘাট উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রে ওষুধ না থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গ্রামের মানুষকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা নিয়মনীতি মানছেন না। কখন কেন্দ্র খোলে আর কখন বন্ধ হয়, তা সাধারণ মানুষ জানেন না। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে জনগণের সঙ্গেই এমন আচরণ করা হচ্ছে।
দুই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের শোকজ
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফয়সাল ফেরদৌস বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কেন বন্ধ ছিল, তা খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিসেম্বর থেকে ওষুধের সংকট আর থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর বন্ধ থাকা দুটি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশের কপি প্রতিবেদকের কাছে পাঠানো হয়। নোটিশে শনিবার (২৩ অক্টোবর) পূর্ণ কর্মদিবসে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









