মাটির দেয়ালজুড়ে রঙিন আলপনা। কোথাও লাল-সাদা রঙে ফুটে উঠেছে ফুল, লতা-পাতার নকশা, কোথাও শোভা পাচ্ছে নৌকা, পদ্মফুল, মাছ, ধানের শীষ ও নানা ঐতিহ্যবাহী প্রতীক। বাড়ির বাইরের দেয়াল থেকে বারান্দা, উঠান, এমনকি ঘরের ভেতরেও ছড়িয়ে আছে শিল্পের ছোঁয়া। কোনো পেশাদার শিল্পীর তুলির আঁচড় নয়, গ্রামের সাধারণ গৃহিণীদের সৃজনশীল হাতেই মাটির বাড়িগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি শিল্পকর্ম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের টিকোইল গ্রাম এখন পরিচিত ‘আলপনা গ্রাম’ নামে।
গ্রামের প্রবীণ আলপনা শিল্পীদের একজন শ্রীমতি বর্মন। প্রায় ৪৭ বছর আগে পুত্রবধূ হয়ে তিনি টিকোইল গ্রামে আসেন। এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিজের বাড়ির মাটির দেয়ালে আলপনা এঁকে আসছেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর হাত ধরেই গ্রামে এই শিল্পচর্চা আরও বিস্তৃত হয়েছে। পরিবারের অন্য নারীরাও তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঐতিহ্যটি ধরে রেখেছেন। সময়ের সঙ্গে নকশা ও রঙের ব্যবহারে পরিবর্তন এলেও মাটির দেয়ালে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার এই চর্চা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, টিকোইল গ্রামে ৭০ থেকে ৮০টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবারের বাড়িতে রয়েছে আলপনা। গ্রামের অনেক নারী বংশপরম্পরায় এই শিল্পচর্চা করে আসছেন। তাঁদের কাছে আলপনা কেবল ঘর সাজানোর উপকরণ নয়, বরং পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
আলপনা আঁকার উপকরণেও রয়েছে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য। আগে খড়িমাটি, এঁটেল মাটি ও আতপ চালের গুঁড়াসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে রং তৈরি করতেন নারীরা। সময়ের সঙ্গে বাজারে পাওয়া রঙের ব্যবহার বাড়লেও ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ও নিজস্ব পদ্ধতির চর্চা এখনো রয়েছে। শুকনো বরইয়ের গুঁড়া, আমের আঁটির শাঁসের গুঁড়া, গিরিমাটি, আঠা এবং মানকচু ও কলাগাছের কষসহ বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে রং তৈরি করা হয়। এসব রঙে মাটির দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা নকশা।
আলপনায় বেশি দেখা যায় ফুল, লতা-পাতা, পদ্ম, মাছ, ধানের শীষ ও ধর্মীয় প্রতীক। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা, নবান্নসহ বিভিন্ন উৎসব ও পারিবারিক আয়োজনে বাড়িগুলো নতুন করে সাজানো হয়। রং ফিকে হয়ে গেলে পুরোনো নকশা সংস্কার করেন নারীরা। কখনো আবার আঁকেন নতুন নকশা। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে গ্রামটির বাড়িগুলোতে দেখা যায় রঙের ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য।
এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও আবেগ। তাঁদের ধারণা, আলপনা বাড়িতে পবিত্রতা ও আনন্দের আবহ তৈরি করে। একসময় বিয়ের উপযুক্ত মেয়ের পরিবারের রুচি ও দক্ষতা বোঝার ক্ষেত্রেও বাড়ির সাজসজ্জা গুরুত্ব পেত বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। এভাবেই মাটির দেয়ালে আঁকা নকশা পারিবারিক অভ্যাসের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে সময়ের পরিবর্তনে এই ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবার মাটির বাড়ি ভেঙে ইটের পাকা বাড়ি নির্মাণ করছে। ফলে আলপনা আঁকার উপযোগী প্রচলিত মাটির দেয়াল কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারপরও গ্রামের নারীরা নিজেদের বাড়িতে এই শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন।
গ্রামীণ নারীদের হাতের এই শিল্পকর্ম দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা টিকোইল গ্রামে আসেন। বাড়ির দেয়ালে ফুটে ওঠা নান্দনিক কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হন তাঁরা। অনেকে নিজেদের অনুভূতি লিখে রেখে যান স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত পরিদর্শন খাতায়।
সাংবাদিক শহিদুল হুদা অলক বলেন, টিকোইল গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন আলপনাসজ্জিত লোকশিল্পের একেকটি প্রদর্শনী। অনেক মানুষ ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুক্ষণের জন্য থেমে এই সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বাড়ির দেয়ালে আঁকা প্রতিটি নকশায় ফুটে ওঠে শিল্পীদের সৃজনশীলতা ও কারুকার্য।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে টিকোইল গ্রামের অবস্থান। গ্রামটি শুধু রঙিন দেয়ালের জন্য নয়, গ্রামীণ নারীদের সৃজনশীলতা ও লোকশিল্পের ধারাবাহিকতার কারণেও বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। এখানে নেই কোনো নির্দিষ্ট প্রদর্শনশালা কিংবা শিল্পকেন্দ্র। মানুষের বসতবাড়িই যেন একেকটি শিল্পের গ্যালারি। মাটির দেয়ালে আঁকা প্রতিটি আলপনা জানান দেয়, মানুষের চর্চা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে লোকজ ঐতিহ্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









