চারদিক নিস্তব্ধ। সেহরীর সময় খুব কাছে তখন। শহর যেন ঘুমের চাদরে ঢাকা। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসে এক চেনা ডাক— “রোজাদারো উঠো সেহরির ওয়াক্ত হো চুকা হ্যায়” অর্থাৎ রোজাদাররা উঠে পড়ুন, সেহরির সময় হয়ে গিয়েছে। এই সুরে ভাঙে ঘুম। মনে করিয়ে দেয় এটা রমজান। আর এ শহর সৈয়দপুর।
একসময় রমজান মাস এলেই নীলফামারীর সৈয়দপুর শহর হয়ে উঠত অন্যরকম। গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে অলিগলি, পাড়া-মহল্লা জুড়ে ভেসে আসত কাফলার সুমধুর ধ্বনি। সেহরির সময় রোজাদারদের জাগিয়ে তুলতে কাসিদা আর দরদমাখা আহ্বান ছিল এই শহরের রমজানের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
সে সময় কাফলার ডাক শুধু সাহরির সময় জানানোর মাধ্যম ছিল না, এ ছিল সৈয়দপুরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর সামাজিক জীবনের অংশ। কালের আবর্তে বদলে গেছে সময়। আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম আর যান্ত্রিক জীবনের চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে কাফলার সেই চিরচেনা সুর। আজ তা প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এক লোকজ ঐতিহ্য। তবুও লোকজ এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন বেশ কয়েকজন।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে যুগ যুগ ধরে রমজান মানেই কাফেলার কাসিদা। সাহরির ঘণ্টা খানেক আগে থেকেই শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় ঘুম জাগানিয়া দল যাদের এখানে বলা হয় কাফেলা। মাইকে কাসিদা, গজল আর ইসলামী কবিতার সুরে তারা রোজাদারদের ডেকে তোলে সাহরির জন্য। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাঁশবাড়ি হানিফ মোড় থেকে আজমেরি কাফেলা, হাতিখানা থেকে গুলজারে মাদিনা কাফেলা, মেডিক্যাল মোড় থেকে আশরাফি কাফেলা, মিস্ত্রিপাড়া থেকে বুলান্দ কাফেলা, আমিন মোড় থেকে হুসাইনি কাফেলা, ইসলামবাগ থেকে কাদিমি কাফেলাসহ একাধিক দল শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালন করছে।
ফজরের সময় শুরু হওয়ার আগেই সুরেলা কণ্ঠে তারা জানিয়ে দেয় সাহরির আর কত সময় বাকি। রিকশায় বসানো মাইকে ভেসে আসে কাসিদা, মাঝেমধ্যে ঘোষণা। সেই ডাকে ঘুম ভাঙে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইয়ের। এই হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির মাঝেও দাঁড়িয়ে আছেন সৈয়দপুরের প্রবীণ উর্দু কবি আইয়ুব রাহি। যখন চারপাশের মানুষ যান্ত্রিকতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, তখন তিনি আজও আগলে রেখেছেন কাফলার সেই প্রাচীন ধারা। আইয়ুব রাহির কাছে কাফলা কোনো পেশা নয়, কোনো প্রদর্শনীও নয়। এটি তাঁর বিশ্বাস, তাঁর দায়িত্ব। লোকজ এই সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি আজও মাইক হাতে নামেন রাতের অন্ধকারে।
গুলজারে মাদিনা কাফেলা গ্রুপের সেই আইয়ুব রাহি জানান, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এ কাজ করছি। আমার বাবা, দাদা সবাই করেছে। রাত জেগে মানুষকে সাহরির জন্য জাগানো এটা সৈয়দপুরের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য। তাছাড়া এটাকে আমরা ইবাদতই মনে করি। তাই সেই সংস্কৃতি রক্ষায় আজও কাফেলা নিয়ে বের হই। এই কাফেলার ডাক শুনে মহল্লার ছোট ছোট শিশুরা এখনো জানালায় দাঁড়িয়ে উঁকি দেয়। কেউ কেউ বাইরে বেরিয়ে একনজর দেখে নেয় কাফেলার দলটাকে ঠিক যেমনটা হতো বহু বছর আগে।
আরেক আজমেরি কাফেলার প্রধান ইসলাম জানান, ১৮ বছর ধরে এ কাজ করে আসছি আমি। যতই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগ আসছে এটা কমে গিয়েছে। তবুও লোকজ সংস্কৃতি রক্ষা আর সওয়াবের নিয়তে আজও বের হয় কাফেলা নিয়ে। রাত জেগে এভাবে ডেকে তোলা তাদের কাছে পরম পূণ্যের কাজও মনে করেন তাঁরা। অনেকে আবার একে সামাজিক দায়িত্ব বলেও মনে করেন।
শহরের গোলাহাটের বাসিন্দা শাহনাজ বেগম বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই কাফেলা দেখছি। তখন ঘড়ি ছিল না। এই ডাকই ছিল সাহরির ভরসা।” বাঁশবাড়ি মহল্লার আনোয়ারী বেগমের স্মৃতিতে কাফেলার ডাক মানেই শৈশব, “রোজা রাখতে না দিলেও কাফেলার হাঁকডাকে ঘুম ভেঙে যেত। এখন সে ডাক অনেক কমে গেছে।”
কালের আবর্তে কাফেলার সংখ্যা কমেছে। আগে প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় একাধিক কাফেলা থাকলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি দল এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আধুনিকায়ন, মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম সবকিছুই যেন কাফেলার জায়গা দখল করে নিয়েছে।
সংস্কৃতিকর্মী ও লেখক রুখসানা জামান শানু বলেন,কাফেলা সৈয়দপুরের নিজস্ব সংস্কৃতি। একসময় শহরের ১৫টি ওয়ার্ড থেকে কাফেলা বের হত এবং রমজানের শেষের দিকে সব কাফেলা দলকে নিয়ে জাকজমকভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন হত। সেই আয়োজন দেখতে দল বেধে বেধে সব পাড়া মহল্লা থেকে মানুষজন আসতো। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হত। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দেওয়া দরকার বলে জানান তিনি।
কাফেলার সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক চান না। কেউ খুশি হয়ে প্রতিদিন কিছু দেন, কেউ ঈদের আগে একবারে। তাদের মূল প্রাপ্তি মানুষের দোয়া।
আজ ডিজিটাল যুগ। অ্যালার্মেই সাহরি হয়। তবু সৈয়দপুরের কিছু মানুষ এখনো জেগে ওঠে কাফেলার কাসিদায়। এ যেন শুধু ঘুম ভাঙানো নয় একটি শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি আর রমজানের আবেগকে জাগিয়ে রাখা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, কাসিদা রচয়িতা মূলত বেশিরভাগ উর্দুভাষী অবাঙালি মুসলমান। নারায়ণগঞ্জের আদমজী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও নীলফামারীর সৈয়দপুরের অবাঙালি অনেকেই কাসিদা লিখেন এবং কাফেলার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









