ফাগুনের হাওয়ায় ভেসে আসছে আমের মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। যশোর শহর থেকে শুরু করে মনিরামপুর, কেশবপুর, চৌগাছা, শার্শা, অভয়নগর, বাঘারপাড়া সবখানেই গাছে গাছে এখন সোনালি মুকুলের সমারোহ। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, রাস্তার ধারের পুরনো গাছ কিংবা নতুন বাণিজ্যিক বাগান সবই যেন একসঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছে মধুমাসের আগমনী বার্তা। প্রকৃতির এই রূপে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন জেলার হাজারো আমচাষি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে আমের ফলন গত বছরের তুলনায় দিগুণ হতে পারে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর যশোরে ৩ হাজার ৯৭৮ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় তবে আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ২ হেক্টর জমিতে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ২৩৬ মেট্রিক টন। গড় হিসাব করলে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১২.৮৮ টন ফলনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। মণিরামপুর ও কেশবপুরে গত বছর যেখানে হেক্টরপ্রতি ১১-১২ টন ফলন হয়েছিল, সেখানে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪-১৬ টন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের শেষভাগে তুলনামূলক কম বৃষ্টি, মাঝারি তাপমাত্রা এবং তীব্র শৈত্যপ্রবাহের অনুপস্থিতি আমের মুকুল গঠনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। কুয়াশা থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে মুকুল ঝরে পড়ার ঝুঁকি কম ছিল। বড় গাছের তুলনায় ছোট ও মাঝারি গাছে এ বছর মুকুল বেশি এসেছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, গোপালভোগ, বোম্বাই, তিলি বোম্বাই বিভিন্ন জাতের গাছে এখন থোকা থোকা মুকুল দুলছে।
তবে এই আশার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বড় দুশ্চিন্তা শিলাবৃষ্টি। গত কয়েক বছরে মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিটের ঝটিকা শিলাবৃষ্টিতে যশোরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মুকুল ঝরে গেছে, কচি গুটি ছিঁড়ে পড়েছে, ডাল ভেঙেছে, এমনকি অনেক বাগানে ছাল উঠে গিয়ে পরের বছরও ফলন কমেছে।
চাষিরা বলছেন, শিলার আঘাত হলে কয়েক মাসের শ্রম মুহূর্তেই মাটিতে মিশে যেতে পারে।
সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব কষে দেখা যায়, বিষয়টি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। জেলার লক্ষ্যমাত্রা ৫১ হাজার ২৩৬ টন। যদি হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ মুকুল ও গুটি নষ্ট হয়, তাহলে ক্ষতি হবে প্রায় ১৫ হাজার ৩৭১ টন আম। যদি গড় পাইকারি মূল্য ধরা হয় প্রতি কেজি ৬০ টাকা, তাহলে প্রতি টনের মূল্য দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকা। আর যদি ক্ষতির পরিমাণ ৪০ শতাংশে পৌঁছায়, তাহলে উৎপাদন কমে যাবে প্রায় ২০ হাজার ৪৯৪ টন। শুধু চাষিরাই নয়, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার, প্যাকেজিং শ্রমিক, খুচরা ব্যবসায়ী সবাই এই ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাবে।

মনিরামপুরের হানুয়া গ্রামের আম বাগান মালিক ইমরান হোসেন জানান, মুকুল মানেই স্বপ্ন। কিন্তু শিলা পড়লে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এক ঝড়েই লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
কেশবপুরের আরেক চাষি বলেন, গতবার ১২ মিনিট শিলা পড়েছিল। আধা ঘণ্টার মধ্যে বাগানের চেহারা বদলে যায়। এবারও যদি হয়, বড় ক্ষতি হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) আবুল হাসান বলছেন, এ বছর যশোরে ৩ হাজার ৯৭৮ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় তবে আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ২ হেক্টর জমিতে।
তিনি আরো জানান, শিলাবৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কচি ফল ও মুকুল। শিলার আঘাতে ডালপালা ভেঙে যায়, পাতা ছিঁড়ে যায়, কাণ্ডে ক্ষত তৈরি হয়। এই ক্ষত দিয়ে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে গাছ দুর্বল করে দেয়। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক ফলন নয়, পরবর্তী মৌসুমও ঝুঁকিতে পড়ে।
যশোরে সম্ভাব্য ঝড় ও শিলাবৃষ্টি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, সঠিক সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে গাছের সহনশীলতা বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে শিলা সহনশীল জাত উদ্ভাবন ও কৃষি বীমা চালু করা প্রয়োজন।
যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-সহকারী উদ্যান অফিসার শাহিদুর রহমান শাহিদ বলছেন, বাগানের চারপাশে বায়ুরোধী গাছ লাগানো, ছোট-মাঝারি গাছে অস্থায়ী নেট ব্যবহার এবং নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঝড়ের আগে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন না দিয়ে পটাশ বাড়ালে ডাল মজবুত হয়। শিলাবৃষ্টির পর ভাঙা ডাল ছেঁটে ফেলা, ঝরে পড়া মুকুল সরানো এবং কপার অক্সিক্লোরাইড বা বোর্দো মিশ্রণ স্প্রে করার নির্দেশনা রয়েছে। প্রয়োজনে কার্বেন্ডাজিম বা প্রোপিকোনাজল ব্যবহার করা যেতে পারে। ১০-১৫ দিনের মধ্যে সুষম সার ও জিঙ্ক-বোরন প্রয়োগ এবং জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন জরুরি। মুকুল ও গুটি রক্ষায় হপার, থ্রিপস ও ফ্রুট বোরার দমনে পরামর্শ অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক ফেরদৌস জান্নাত বলেন, অর্থনীতিতে আম মৌসুম মানেই প্রাণচাঞ্চল্য। বাগান পরিচর্যা থেকে শুরু করে আম সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন সব মিলিয়ে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ভালো ফলন হলে জেলার বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হয়। বিপরীতে বড় ধরনের ক্ষতি হলে তার প্রভাব পড়ে সারা বছর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









