কক্সবাজারের “ডিজিটাল আইল্যান্ড” হিসেবে পরিচিত মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী–ধলঘাটা এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন ও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাবে ভয়াবহ উপকূল ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে সায়রার ডেইল, জালিয়াপাড়া, ধলঘাটার সরাইতলা, তুলাতুলি, ময়নারটেক, খাতুরবাপের পাড়া, সাইটপাড়া ও সুতরিয়ার একাংশসহ বিস্তীর্ণ এলাকা সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, সমুদ্রের ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার বসতবাড়ি সাগরে তলিয়ে গেছে এবং কমপক্ষে দেড় হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়া ও জোয়ারের তীব্রতার কারণে পুরো উপকূলজুড়ে এখন দেখা যাচ্ছে বিধ্বস্ত জনপদের চিহ্ন। কোথাও ভাঙা ঘরের দেয়াল, কোথাও ঢেউয়ে উপড়ে পড়া গাছের গুঁড়ি—উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসস্তূপ।
১৯৯১ সালের স্মৃতি এখনও তাজা:
ধলঘাটা–মাতারবাড়ির মানুষের জন্য সমুদ্রের এই তাণ্ডব নতুন নয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এ অঞ্চল কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শুধু এই এলাকাতেই প্রায় ১১ হাজার মানুষ নিহত হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রায় ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আবার ফিরে আসেন। পূর্বপুরুষের পেশা—লবণ উৎপাদন ও সামুদ্রিক মাছ আহরণের টানে তারা আবার গড়ে তোলেন বসতভিটা। কিন্তু সেই জীবনও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
উন্নয়ন প্রকল্পে বদলে গেছে উপকূল:
২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনালের মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এতে নতুন করে অন্তত ১০০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়।
যে সৈকতে একসময় শুষ্ক মৌসুমে ২০–৩০ হাজার জেলে অস্থায়ী বসতি গড়ে মাছ শুকানোর কাজ করতেন, সেই এলাকার কর্মব্যস্ততা এখন প্রায় বন্ধ। জেলার বৃহত্তম শুঁটকি শিল্পের কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল এই অঞ্চল।
জৌলুস হারানো জেলেদের জীবন:
ধলঘাটার এক সময়ের বিত্তশালী জেলে এবং চট্টগ্রামের জব্বারের বলী খেলায় সাতবারের চ্যাম্পিয়ন কামাল বলী এখন কক্সবাজারের নাজিরারটেকে দিনমজুর জেলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তার মতোই ওমর আলী, মোহাম্মদ হোসেন, জালাল আহমদ, আবুশামা, আবুল কালাম ও মনজুর আলমসহ অনেক সাবেক পুঁজিপতি জেলে আজ নিঃস্ব। অতীতের দিনগুলোর কথা মনে করে তারা বলেন, সমুদ্রের নির্মল বাতাস, পরিষ্কার পানি আর প্রচুর মাছের সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। তাদের অভিযোগ, এখন তাদের জমি ও বসতভিটায় চলছে মেগা প্রকল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞ। অন্যদিকে কয়লাবাহী জাহাজ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

সাগরের গতিপথ বদলে যাচ্ছে:
স্থানীয়দের মতে, সমুদ্র থেকে মাটি ও বালি উত্তোলন এবং বিশাল এলাকা ভরাট করার কারণে সাগরের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বেড়িবাঁধসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলো জোয়ার–ভাটায় প্লাবিত হচ্ছে। এতে ধলঘাটা–মাতারবাড়ির অন্তত ৮টি গ্রাম নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
বারবার ঘর হারানো মানুষের গল্প:
মাতারবাড়ির সায়রার ডেইল এলাকার বাসিন্দা ইউছুপ বলেন,“২০২৩ সাল থেকে সমুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। ভেবেছিলাম আমার বাড়ি পর্যন্ত আসবে না। কিন্তু বর্ষায় দুই দিনের মধ্যেই সব ভেসে গেল।”
আব্দুল মালেক নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমার কৈশোরে বেড়িবাঁধ থেকে সমুদ্র অন্তত এক কিলোমিটার দূরে ছিল। এখন তিনবার ঘর হারিয়ে বাঁধের গোড়ায় এসে বাস করছি।”
বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকূলে একদিকে ভূমি দেবে যাচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে—ফলে “আপেক্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি” ঘটছে, যা উপকূলীয় এলাকায় বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে প্রতিবছর জোয়ারের উচ্চতা প্রায় ৬ দশমিক ২৩ মিলিমিটার হারে বাড়ছে।
লবণ শিল্পেও ধাক্কা;
কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধলঘাটা ও মাতারবাড়িতে একসময় প্রায় ৬ হাজার একর লবণমাঠ ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কারণে প্রায় ৩ হাজার ৩৬৬ একর লবণমাঠ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার লবণচাষি ও শ্রমিক জীবিকা হারানোর মুখে পড়েছেন।
পুনর্বাসনের দাবি স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের সময় সরকার পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাকরির ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
লবণচাষি মহসিন বাবুল বলেন,“এখানে উন্নয়ন মানে সাধারণ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করা। একদিকে সমুদ্র ভাঙন, অন্যদিকে প্রকল্প—দুই দিক থেকেই আমরা বিপদে পড়েছি।”
স্থানীয়দের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ও জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









