সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

বীরগঞ্জে কৃষিতে হারাচ্ছে গরুর হালচাষ

প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

বীরগঞ্জে কৃষিতে হারাচ্ছে গরুর হালচাষ

কুয়াশা ভেজা ভোর, মাটির গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা গরুর ঘণ্টার মৃদু ধ্বনি—এই সব মিলেই একসময় বীরগঞ্জের গ্রামাঞ্চল জেগে উঠত জীবনের আপন ছন্দে। মাঠের আইল ধরে এগিয়ে যেতেন কৃষক, কাঁধে লাঙল, হাতে জোয়াল, সঙ্গে একজোড়া বলদ। “হুট-হাট” শব্দে গরুকে তাড়া দিয়ে চাষের রেখা কাটতে কাটতে তিনি যেন আঁকতেন জীবিকার এক নিঃশব্দ কবিতা।

আজ সেই দৃশ্য আর আগের মতো চোখে পড়ে না। সময়ের পালাবদল, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রযাত্রা আর যান্ত্রিক কৃষির বিস্তারে বীরগঞ্জে গরুর হালচাষ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এটি যেন একটি যুগের অবসানের নিঃশব্দ ঘোষণা।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা জুড়ে একসময় কৃষি ছিল সম্পূর্ণ গরুনির্ভর। জমি চাষ, মই দেওয়া, বীজ বপন—সব কিছুতেই ছিল বলদের নির্ভরতা। কৃষকের ঘাম আর গরুর পরিশ্রম মিলে ফলতো সোনালি ফসল। শুধু অর্থনৈতিক নয়, এই হালচাষ ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতিরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সেই সময় কৃষকের সংসারও ছিল এই চাষাবাদকে ঘিরে। গৃহবধূরা ভোরে উঠে রান্না করতেন, লাল শাড়ি পরে মাঠে খাবার নিয়ে যেতেন। মাঠের আইলেই বসে কৃষক ভাত খেতেন, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকত তার প্রিয় বলদ। মাঠ তখন শুধু কাজের জায়গা নয়, ছিল ভালোবাসা, সম্পর্ক আর সংগ্রামের এক উন্মুক্ত প্রান্তর।

বর্তমানে সেই আবহ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। পাওয়ার ট্রিলার, ট্রাক্টরসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা কৃষিকাজকে করেছে দ্রুত ও কম পরিশ্রমসাধ্য। ফলে সময় ও খরচ বাঁচাতে অধিকাংশ কৃষকই এখন যান্ত্রিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে গরুর হালচাষ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

বীরগঞ্জ পৌর এলাকার মাকড়াই গ্রামের কৃষক মো. সোয়েব আলী এখনও সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের শেষ প্রহরীর মতো লাঙল হাতে মাঠে নামেন। স্মৃতিমাখা কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই লাঙল শুধু চাষের যন্ত্র না, এটা আমাদের জীবনের অংশ। আগে একজোড়া বলদ আর লাঙল থাকলেই একজন কৃষক বেঁচে থাকতে পারতো। এখন ট্রিলার এসেছে, কাজ সহজ হয়েছে, কিন্তু সেই প্রাণটা আর নেই।”

তিনি আরও জানান, গরুর লাঙল দিয়ে জমি চাষ করলে মাটি গভীরভাবে উল্টে যায়, আগাছা কম জন্মায় এবং গরুর গোবর সরাসরি জমিতে পড়ে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। এতে জমির জৈব গুণাগুণ বজায় থাকে এবং ফসলও হয় স্বাস্থ্যকর।

এদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যান্ত্রিক কৃষির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির গুরুত্ব পুরোপুরি উপেক্ষা করা ঠিক নয়। কারণ এতে পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্যের একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, “কৃষির আধুনিকায়ন অবশ্যই সময়ের দাবি, তবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলোর মধ্যেও রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব দিক। গরুর হালচাষের মাধ্যমে মাটি প্রাকৃতিকভাবে ঝুরঝুরে হয়, জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। আমরা কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছি, তবে একই সঙ্গে টেকসই কৃষির জন্য জৈব পদ্ধতি ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতে এই দুইয়ের সমন্বয়ই হতে পারে কৃষির জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।”

সময়ের স্রোতে বদলে যাওয়া এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন শুধু গতি নয়, এটি স্মৃতির সাথেও এক গভীর সম্পর্ক। গরুর হালচাষ হয়তো আর আগের মতো ফিরে আসবে না, কিন্তু এটি গ্রামবাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। লাঙলের আঁচড়ে লেখা সেই জীবনের গল্প আজও মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে, শুধু শুনে নেওয়ার অপেক্ষায়।

টিআর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.