রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

চার গ্রামের একমাত্র নারী দর্জি বিধবা সায়রা

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

চার গ্রামের একমাত্র নারী দর্জি বিধবা সায়রা

জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকেই একটু স্বস্থির নিঃশ্বাসে বেঁচে থাকার স্বপ্ন্ দেখেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তার পর হয়ত একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস পাওয়া যায়। ঠিক এমনই একজন নারী যিনি অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে বর্তমানে একটু হলেও স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তিনি হলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাঁচড়াহাটি গ্রামের বিধবা নারী সায়রা খাতুন(৪১)।

উপজেলা সদর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে সরকারি খাস জায়গা ৩ কাঠা জমির উপর ছেলে, পুত্রবধু ও শাশুড়িকে নিয়ে বসবাস করেন। এ্কই গ্রামের আজিজ মোল্যার সাথে তার বিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে। স্বামী পেশায় একজন দিন মজুর ও ভ্যান চালক ছিলেন। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ীর যেীথ সংসারে কখনও কখনও মাঠের কাজ ও সংসারের খাটুনি খেটে যেতে হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে পৃথক করে দেন শশুর ও শাশুড়ি। এরই মধ্যে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। সায়রা খাতুন নিজে লেখা পড়া জানতেন না বলে ছেলে ও মেয়েকে লেখাপড়া শিখাতে ও সংসারের আয় বাড়াতে সিদ্ধান্ত নিলেন স্বামীকে বিদেশ পাঠাবেন ও নিজে দিনমজুরের কাজ করবেন। সেই হিসাবে লক্ষাধিক টাকা ঋণ করে স্বামীকে মালদ্বীপ পাঠালেন। বছর দুই কাজ করার পর স্বামী মালদ্বীপে মারা যান। খুব কষ্ট করে অর্থ ব্যয় করে মৃত দেহ বাড়ীতে এনে সৎকার করেন। এর পর শুরু হয় সায়রার নতুন করে লড়াই। দিন রাত মজুরী দিতে দিতে ২০০২ সালে যুক্ত হন বেসরকারী মহিলা সংগঠন নকশীকাঁথার একটি মহিলা দলের সাথে। ২ টাকা করে সঞ্চয় শুরু করেন প্রথমে।

এভাবে চলতে চলতে ২০০৮ সালে নকশীকাঁথার মাধ্যমে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তিন মাসের দর্জি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ৩৪ প্রকারের কাজ শেখেন যার মধ্যে নারীদের কাজ বেশি ছিল। পর তার আগ্রহ ও অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে বিনা মূল্যে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন থেকে একটি সেলাই মেশিন পান। এই সেলাই মেশিনের দ্বারা তার গ্রাম হাটছোলা সহ পার্শবর্তী ভূরুলিয়া, চন্ডিপুর, খানপুর গ্রামের নারীদের, মেয়েদের ও ছেলে শিশুদের পোষাকের অর্ডার সংগ্রহ করেন। তিনি নারীদের ব্লাউজ, সায়া, ম্যাকছি, কাটা থ্রিপিচ সেলাই, নকশীকাঁথা, শিশুদের পোষাক, প্যান্ট, সালোয়ার সহ অন্যান্য আইটেমের পোষাক তৈরী করেন এবং মজুরী নেন বাজার ছাড়া একটু কম। বর্তমানে বাসায় একাজের পরিধি বাড়াতে সিট কাপড় কিনে অর্ডারী পোষাক তৈরী করছেন।

সায়রা খাতুন বলেন দর্জির কাজ করতে করতে এলাকায় তার পরিচিতি ও সুনাম বেড়েছে। প্রথমদিকে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ টাকা আয় হত বর্তমানে দৈনিক ৩ শত থেকে ৪ শত টাকা আয় হয়, উৎসবের সময় আরও বেশি আয় হয়। তার আয় দিয়ে বসত ঘর আধা পাকা করেছেন, বাড়তি আয়ের জন্য মুরগীর ফার্ম করেছেন, ছেলে ও মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, বাড়ীতে ফ্রিজ, টিভি ক্রয় করেছেন, আসবাব পত্র ক্রয় করেছেন, বেীমাকে দর্জির কাজ শিখিয়েছেন। এখন বেীমা তার কাজে সহযোগিতা করেন। বিশেষ করে ঈদ উৎসব বা অন্যান্য উৎসবে অর্ডারের চাপ বেড়ে গেলে শাশুড়ী ও বৌমা দু’জনে মিলে কাজ করেন। ছেলেকে একটি ভাড়ায় চালিত অটো গাড়ী কিনে দিয়েছেন। স্থানীয় ব্যাংক, এনজিওতে সঞ্চয় করছেন।

সায়রা খাতুন বলেন বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন আমার বাঁচার পথ দেখিয়েছে। সংসারে নিভু প্রদীপকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখন স্বপ্ন দেখছেন দর্জির কাজকে আরও বৃহত পরিসরে করার জন্য দোকান ঘর ভাড়া নেওয়ার। এ জন্য তিনি সরকারি বেসরকারী সুদ মুক্ত ঋণ পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন।

সায়রা খাতুনের এত আলোর মাঝেও মুখটা ম্লান করে বলেন একটা আশঙ্কা রয়ে গেছে সরকারি খাস জায়গায় বসবাস করি সরকার চাইলে যেকোন মুহুর্তে আমাকে উঠিয়ে দিতে পারেন। তিনি বসবাসের জায়গার বন্দোবস্ত পাওয়ার দাবী জানান।

সায়রা খাতুন নিজের কর্মে দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে সম্মানজনক স্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন। তার এই পরিশ্রমী ও উদ্যোগী কর্মকান্ড দেখে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন এবং সমাজ ও পরিবার পরিবর্তনে অবদান রাখবেন।

ছবি- সায়রা খাতুন নিজ বাসায় দর্জির কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
 

কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.