এক সময় গ্রামবাংলার বিয়ে মানেই ছিল উৎসবের রঙে রঙিন এক আনন্দমুখর আয়োজন। বরযাত্রার আগে থেকেই শুরু হতো ঢাক-ঢোলের তালে তালে সানাইয়ের সুর, যার মায়াবী ধ্বনি যেন জানান দিত নতুন জীবনের সূচনা। সেই সুরে মেতে উঠতো গ্রাম-গঞ্জের মানুষ, নেচে-গেয়ে উৎসবকে করে তুলতো প্রাণবন্ত।কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ সেই ঐতিহ্য অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে আয়োজনের ধরন, আর হারিয়ে যেতে বসেছে বহু বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সানাই ও ব্যান্ড পার্টি।
নীলফামারীর সৈয়দপুরেও একই চিত্র।
একসময় যেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যান্ড পার্টি ও সানাই ছাড়া আয়োজন কল্পনাই করা যেত না, সেখানে এখন সেই সানাইয়ের সুর শোনা যায় খুবই কম। যে শিল্পীরা একসময় এই পেশার ওপর নির্ভর করেই পরিবার চালাতেন, আজ তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সৈয়দপুরের তামান্না সিনেমা হলের সামনে বসে কথা হয় একরাম ব্যান্ড মাস্টারের সদস্য সালামের সাথে। বর্তমানে তিনি একটি ছোট পান দোকান চালান। জীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে হতাশা আর স্মৃতির মিশেল। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে বিয়ে-শাদিতে সানাই বাজানোর কাজ করছি। তখন এত কাজ থাকতো যে একদিনে কয়েকটা গ্রোগ্রাম করতাম। ভালো আয় ছিল, সংসারও ভালো চলতো। কিন্তু এখন সেই দিন নেই। বাধ্য হয়ে এই দোকান নিয়ে বসেছি। তবুও কোথাও ডাক পড়লে এখনও যাই কারণ এই পেশাটা শুধু কাজ না, এটা আমাদের ভালোবাসা।
সালামের মতোই একই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন একরাম ব্যান্ড মাস্টারের প্রবীণ সদস্য একরাম। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি দলবল নিয়ে সৈয়দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিয়ে, আকিকা, সুন্নতে খৎনা ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে সানাই বাজিয়ে আসছেন। অতীতের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আগে আমাদের খুব চাহিদা ছিল। অনুষ্ঠান করার জন্য অনেক আগে থেকে বুকিং দিতে হতো। আমরা একদিনে দুই-তিনটা অনুষ্ঠান করতাম। তখন সম্মানও ছিল, আয়ও ছিল ভালো। এখন সপ্তাহ চলে যায়, মাস চলে যায় কোনো ডাকই পড়ে না। বসে বসে দিন কাটাতে হয়।
তিনি আরও জানান, আগে তাদের দলে অনেক সদস্য ছিল, যারা সবাই এই পেশার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু এখন কাজ না থাকায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।
কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউবা ছোট দোকান বা হোটেল দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমাদের অনেক সদস্য এখন আর এই লাইনে নেই। জীবনের তাগিদে সবাই অন্য কাজ করছে। তবে ডাক পেলেই আবার সবাই একত্রিত হই, যোগ করেন তিনি।
বর্তমানে সৈয়দপুরে একরাম ব্যান্ড মাস্টারের কয়েকজন সদস্য একরাম, মুন্না, সালাম, মোক্তার, সাব্বির, চুন্নু, কালু জাহিদ, স্বপন, নান্নে এখনও এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। যদিও এটি আর তাদের মূল পেশা নয়, বরং পার্শ্ব আয়ের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও এই পেশার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। একরাম ব্যান্ড মাস্টারের সদস্য মোক্তার বলেন, অনেকে এই পেশাকে নিচু চোখে দেখে। তাই আমরা চাই না আমাদের সন্তানেরা এই লাইনে আসুক। কষ্ট করে হলেও তাদের পড়াশোনা করাচ্ছি, যাতে তারা ভালো কিছু করতে পারে।
সানাই ও ব্যান্ড পার্টির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব। এ বিষয়ে সৈয়দপুর বন্ধন শিল্পী গোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতা রইচ উদ্দিন বলেন, আগে বিয়ে মানেই সানাইয়ের সুর ছিল অপরিহার্য। কিন্তু এখন ডিজে সংস্কৃতি জায়গা করে নিয়েছে। মানুষ এখন ডিজে সেট এনে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে নাচতে বেশি আগ্রহী। বিশেষ করে ভারতীয় গানের প্রভাব বেশি দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সানাইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র আজ বিলুপ্তির পথে। যদি এখনই সচেতনতা তৈরি না হয় এবং সরকারি বা সামাজিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে খুব শিগগিরই এই শিল্প পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও ঐতিহ্যকে একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক নয়। কারণ সানাই শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আজও যখন কোথাও সানাইয়ের সুর ভেসে আসে, তখন মনে পড়ে যায় সেই সোনালি দিনগুলোর কথা যখন গ্রামের প্রতিটি বিয়ে ছিল এক একটি উৎসব, আর সেই উৎসবের প্রাণ ছিল সানাই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিড়ে যদি হারিয়ে যায় নিজের সংস্কৃতি, তবে তা শুধু একটি পেশার ক্ষতি নয়, বরং একটি জাতির ঐতিহ্যের বিলুপ্তি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









