তিস্তার ভয়াল ভাঙনের সঙ্গে লড়াই যেন রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বছরের পর বছর ঘরবাড়ি হারিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা মানুষগুলো এবার নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেরাই গড়ে তুলেছিল বাঁধ।
কিন্তু বর্ষা আসার আগেই সেই বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন করে আতঙ্কে পড়েছেন পাঁচটি চরগ্রামের অন্তত ১২ হাজার পরিবার। রংপুরের গংগাচড়া চর নোহালী ও বাগডোহরা এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত দুটি বাঁধ এখন চরবাসীর একমাত্র ভরসা।
কয়েক বছর ধরে চাঁদা তুলে, দিনরাত শ্রম দিয়ে স্থানীয়রাই বাঁধ নির্মাণ করলেও চলতি বছরের ভারী বর্ষণে বাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস ও ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে করে আসন্ন বন্যা মৌসুমে পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিন বছর আগে বন্যায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হলে তিস্তার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। ওই সময় বাগডোহরা চরের নিচাপাড়া এলাকার তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী দফায় দফায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্বারস্থ হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় কয়েকটি চরগ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে নিজেরাই দিনরাত শ্রম দিয়ে বাঁধ দুটি নির্মাণ করেন।
এর মধ্যে পাশ্ববর্তী লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি থেকে বাগডোহরা মিনার বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া এই বাঁধটি রক্ষার সহায়ক হিসেবে উজানে চর নোহালী এলাকায় ব্রিফ বাজার থেকে কাচারিপাড়া পর্যন্ত আরও দুই কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের বন্যা ও ভাঙনে বাগডোহরা এলাকায় দুই শতাধিক একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হলেও স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধ দুটির কারণে ঘরবাড়ি রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর বন্যার আগেই বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আসন্ন বন্যায় গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী, বাগডোহরা এবং ভাটিতে কোলকোন্দ ইউনিয়নের চিলাখাল, মটুকপুর ও বিনবিনা এলাকার অন্তত ১২ হাজার পরিবারের ঘরবাড়িসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার জন্ম বাগডোহরা এলাকায়। তিস্তার করাল গ্রাসে এ পর্যন্ত ৯ বার বাড়ি ভেঙেছে। বর্তমানে চর বাগডোহরায় থাকি, কিন্তু থাকা না থাকা এখন নির্ভর করছে এই বাঁধ রক্ষার ওপর।”
ওই এলাকার বাসিন্দা ও নোহালী ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মশিয়ার রহমান বলেন, “এই বাঁধ রক্ষা করতে না পারলে বাগডোহরা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
তিনি জানান, এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে উজানে ব্রিফ বাজার থেকে কাচারিপাড়া পর্যন্ত স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত দুই কিলোমিটার বাঁধের অন্তত ২০০ ফুট অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “এই মুহূর্তে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই। তবে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু জিও ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









