নারী ও শিশু একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে নারী ও শিশু সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, পাচার এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মতো ঘটনা নারী ও শিশুদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। এ পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের নয়, বরং সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর সংকট।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মাত্র পাঁচ মাসেই ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ২৫০ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৬৫ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে ২৩৭ জন নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং আত্মহত্যা করেছেন ৬০ জন। এর পাশাপাশি ছয় মাসে মোট ৪৩টি বলাত্কারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টিতেই অভিযুক্ত ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম।
অন্যদিকে গত ছয় মাসে অন্তত ১৬৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৭টি। বিভাগের হিসাবে সবেচেয়ে বেশি ঢাকায় ৪৯টি। ১৬৪ জনের মধ্যে ১১৭ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে। অন্যদিকে ৭৬টি ৪৪ শতাংশ ঘটনায় পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা জড়িত এবং ৮৮ জন ক্ষেত্রে জড়িত অপরিচিতরা।
এ চিত্র দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ বাস্তবতা। শিশু সহিংসতার অন্যতম কারণ হলো সচেতনতার অভাব, সামাজিক উদাসীনতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকরা শাসনের নামে শিশুদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন, যা শিশুর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার দরিদ্রতা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক শিশু শ্রমে নিযুক্ত হয়ে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুদের ওপর সহিংসতার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নির্যাতনের শিকার শিশুরা প্রায়ই ভয়, হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক আঘাত বহন করে বড় হয়। অনেকের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং সামাজিক সম্পর্ক গঠনে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে তারা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুদের প্রতি ইতিবাচক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
নারী-শিশু সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য একটি বড় বাধা। তাই নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। একটি মানবিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী ও শিশু সহিংসতার বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









