উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনস্বার্থের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া উচিত। কিন্তু কোনো প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি সেখানে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ বা যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের নামে নতুন করে কোটি কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—প্রকল্পটির নির্মাণমান কেমন ছিল এবং অতিরিক্ত এই ব্যয়ের প্রকৃত প্রয়োজন কতটুকু? এমন পরিস্থিতি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের মান নিয়েই নয়, সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়।
রূপপুর গ্রিন সিটি, পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উন্নয়ন এবং মেরিন একাডেমি-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগগুলো এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংবাদ অনুযায়ী, অনেক স্থাপনা এখনো পুরোপুরি হস্তান্তর বা ব্যবহারের পর্যায়ে না পৌঁছালেও সেখানে লিফট, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, রং, স্যানিটারি ও সিভিল মেরামতের নামে একের পর এক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিমূল্যায়ন, কার্যাদেশ বিলম্বিত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া, নিম্নমানের কাজ এবং অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন বাড়িয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগও উঠেছে।
এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতি গুরুতর অবহেলা এবং সুশাসনের জন্য বড় ধরনের হুমকি। একটি ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই যদি মেরামতের প্রয়োজন হয়, তাহলে দুটি প্রশ্ন অনিবার্য। প্রথমত, নির্মাণকাজের মান কি শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল? দ্বিতীয়ত, মেরামতের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? এই দুই প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং সর্বোচ্চ জনস্বার্থ নিশ্চিত করা। যদি কার্যাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে তা সরকারি ক্রয়নীতির চেতনার পরিপন্থী। একইভাবে বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ব্যয় প্রাক্কলনের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে জনগণের অর্থ অপচয় হলে তার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। তবে একটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়।
অভিযুক্ত ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তবে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার বক্তব্য চাওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতি জনমনে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মানসিকতা থাকা অপরিহার্য।
সরকার উন্নয়ন ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল টেন্ডারিং, ই-জিপি এবং বিভিন্ন তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে যদি অনিয়মের অভিযোগ বারবার ওঠে, তাহলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না; কার্যকর নজরদারি, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ—প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, বাস্তবায়ন এবং বিল পরিশোধ—নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে তদারকির আওতায় আনা প্রয়োজন।
জনগণের করের অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য নয়; এটি ব্যয় হওয়ার কথা জনগণের কল্যাণে। তাই আলোচিত প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের আওতায় আনতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অপচয় হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের অবস্থানও স্পষ্ট করা উচিত।
উন্নয়নের প্রকৃত সফলতা শুধু নতুন ভবন নির্মাণে নয়; বরং সেই উন্নয়ন কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত—সেই মানদণ্ডেই এর প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে এই নীতিই হতে হবে সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









