ঢাকা আজ শুধু যানজট, জলাবদ্ধতা কিংবা বায়ুদূষণের সংকটে নয়; রাজধানীর মাটির নিচেও তৈরি হচ্ছে এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি। জরাজীর্ণ গ্যাসলাইন, অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সংযোগ এবং ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকি- এই চারটি উপাদান একত্রে নগরবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে, অবকাঠামোগত নিরাপত্তার প্রশ্নে আর দেরি করার সুযোগ নেই।
গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা একটি নগরের প্রাণশক্তি হলেও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেটিই ভয়াবহ বিপদের উৎসে পরিণত হতে পারে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক গ্যাস লিকেজের অভিযোগ জমা পড়লেও সীমিত জনবল, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে সবগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোথাও কোথাও গ্যাস লিকেজ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
একই সঙ্গে যদি লিক মেরামতের আড়ালে অবৈধ সংযোগ বা পাইপলাইন স্থানান্তরের মতো দুর্নীতির অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নয়; এটি নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অপরাধ। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ঢাকা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত- এটি নতুন কোনো তথ্য নয়। অতীতে বিভিন্ন গবেষণায় রাজধানীর নরম মাটি, ভরাট এলাকা এবং ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি নেটওয়ার্কের দুর্বলতা নিয়ে বহুবার সতর্ক করা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় ভবন ধসের পাশাপাশি গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়তে পারে- এটিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাস্তবতা। তবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে যে কোনো পূর্বাভাসকে অবশ্যই গবেষণাভিত্তিক এবং প্রমাণ সমর্থিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আতঙ্ক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা। ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি হওয়ার পরও যদি তা পরিকল্পনা, নির্মাণ অনুমোদন কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হয়, তবে গবেষণার সুফল বাস্তবে পাওয়া যাবে না। রাজধানীর প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমিকম্প ঝুঁকি, মাটির গঠন এবং ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি ব্যবস্থার সমন্বিত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।
তিতাস গ্যাসের পুরনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, আধুনিক জিআইএসভিত্তিক ম্যাপিং, স্মার্ট লিক ডিটেকশন প্রযুক্তি, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং ভূমিকম্পের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটানো প্রয়োজন। নাগরিকদেরও গ্যাসের গন্ধ, লিকেজ কিংবা অননুমোদিত সংযোগ সম্পর্কে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
নগর নিরাপত্তা কেবল কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি সরকার, সেবাসংস্থা, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী এবং নাগরিক- সবার যৌথ দায়িত্ব। আজ যে বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, আগামী দিনের সম্ভাব্য বিপর্যয়ে সেটিই হাজারো প্রাণ ও অগণিত সম্পদ রক্ষা করতে পারে।
ঢাকার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, একটি আধুনিক রাজধানীর পরিচয় শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়কে নয়; তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে নিরাপদ, টেকসই এবং জবাবদিহিমূলক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









