বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা—যাকে আন্তর্জাতিকভাবে এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোডক্র্যাশ বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সংকট। প্রতিদিন গড়ে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, শত শত মানুষ আহত হয়ে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। শুধু একটি পরিবার নয়, প্রতিটি মৃত্যু দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ এবং আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ চূড়ান্ত করে অনুমোদন ও প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সরকার কি সত্যিই ২০২৭ সালের মধ্যে এই আইন প্রণয়ন করতে পারবে এবং আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন রোডক্র্যাশে প্রাণ হারান। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮৭ জন এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩ থেকে ৪ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বছরে ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু মানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২,৬৩২ জন, আর প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬০৭ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, সড়ক নিরাপত্তা আর কেবল পরিবহন খাতের সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, রোডক্র্যাশের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বছরে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারায়। বাংলাদেশের জিডিপির আকার বিবেচনায় এটি বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মক্ষম মানুষ হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে এই ক্ষতি জাতীয় উন্নয়নকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।
বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত পবিত্র ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে ঈদযাত্রার আগে ও পরে মাত্র ১৩ দিনে ২৮১ জন নিহত এবং ৮৩৭ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২২ জন নিহত এবং ৬৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ৩৯৪টি রোডক্র্যাশে ৪০২ জন নিহত এবং ১,২৯৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, প্রতি দুর্ঘটনায় গড়ে একজনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং তিনজনের বেশি আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, উৎসবকেন্দ্রিক যাত্রায় সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত দুর্বল।
রোডক্র্যাশের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, মাদক বা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। তবে এসব কারণের পেছনে আরও একটি বড় সমস্যা রয়েছে—আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। বিদ্যমান আইন লঙ্ঘনের পরও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ রয়েছে। কিন্তু এই আইন মূলত যানবাহন পরিচালনা, লাইসেন্স, নিবন্ধন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়। অথচ আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শুধু চালক নয়; নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, দুর্ঘটনাপরবর্তী জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই একটি পৃথক ও সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ সময়ের দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী একটি কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইনে অন্তত পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনাপরবর্তী দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই পাঁচটি স্তম্ভকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’।
সরকার ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে জাতীয় গতিসীমা ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল এবং হেলমেট ব্যবহার বাস্তবায়ন গাইডলাইন প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সড়ক নিরাপত্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আইনটি কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন—স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল ট্রাফিক নজরদারি, ডোপ টেস্ট, পেশাদার চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, চালকের লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দুর্ঘটনা তদন্তে স্বাধীন ও দক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাশাপাশি স্কুল পর্যায় থেকেই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন।
তবে আইন প্রণয়নের পথে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আইন বাস্তবায়নে জনবল বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর চাপ মোকাবিলা—এসব বিষয় সফলভাবে সমাধান করতে না পারলে সময়মতো আইন প্রণয়ন কঠিন হতে পারে। আবার আইন প্রণয়ন হলেও যদি বাস্তবায়ন দুর্বল থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
সরকার যদি ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আইনটি প্রণয়ন করতে পারে এবং তার সঙ্গে শক্তিশালী বিধিমালা, পর্যাপ্ত বাজেট, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম নিশ্চিত করে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হতে পারে। এর অর্থ হবে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা, প্রতিদিন গড়ে ৪৩টিরও বেশি প্রাণ বাঁচানো এবং হাজার হাজার পরিবারকে অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।
সবশেষে বলা যায়, সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্ন। আইন যত শক্তিশালীই হোক, তার নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে। এখন প্রয়োজন সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ২০২৭ সালের মধ্যে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করবে না, বরং হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করে একটি নিরাপদ, টেকসই ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করবে।
লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









