জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে এর প্রভাব নানাভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। প্রথম ধাক্কাটি আসে পরিবহন খাতে, এরপর বাড়তে থাকে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে যুক্ত হয় পণ্য ও সেবার মূল্যের সঙ্গে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি খাতের ব্যয় বাড়ায় না, এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরো তীব্র করে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে থাকা বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি তাই বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্যও পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্টের মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গ্যাসের মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ জ্বালানি খাতের মূল্যচাপ দ্রুতই অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপকতাও যথেষ্ট বেশি। জুনে পর্যবেক্ষণ করা ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২৬১টির দাম বেড়েছে। মাত্র ২২টির দাম কমেছে এবং ৯৯টি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কয়েকটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাজারের বড় অংশজুড়েই এর প্রভাব বিস্তৃত। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বাড়ায় পণ্য ও সেবার দামও বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যপণ্যের দাম। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের মতো প্রোটিনজাতীয় খাবার খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বড় অবদান রেখেছে। পাশাপাশি সবজির দামও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে। মানুষের আয় যখন একই হারে বাড়ছে না, তখন এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রায় সরাসরি আঘাত হানে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোসহ কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত হারে মূল্যস্ফীতি কমেনি। এর কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি শুধু অতিরিক্ত চাহিদাজনিত নয়; এর পেছনে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটও রয়েছে। মানুষের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হলেও উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় যদি বেড়ে যায়, তাহলে পণ্যের দাম কমানো কঠিন। তাই শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানির মূল্য সমন্বয় ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই চাপের পুরোটা ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। তাই জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, ধাপে ধাপে সমন্বয় এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মুনাফা ও অস্বাভাবিক মধ্যস্বত্বভোগী ব্যয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষ প্রকৃত অর্থে মুক্তি পাবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন- সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি সাময়িক বাজার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, সরবরাহ সংকট, জ্বালানি নির্ভরতা এবং মানুষের স্থবির ক্রয়ক্ষমতার সম্মিলিত প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন সাময়িক জনপ্রিয়তা নয়, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত নীতি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









