খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নায়ক কৃষক। পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে ফসল রক্ষার লড়াইয়ে তিনি একসময় বালাইনাশককে নির্ভরযোগ্য সহযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অবৈজ্ঞানিক, মাত্রাতিরিক্ত ও অতিনির্ভরশীল ব্যবহারে সেই সহযোদ্ধাই আজ কৃষক, ভোক্তা, পরিবেশ ও রাষ্ট্রের জন্য নীরব শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কৃষকের ভাষায় বালাইনাশকই হলো বিষ। সেই বিষ এখন আর শুধু ক্ষেতে সীমাবদ্ধ নয়; মাটি, পানি, বায়ু, জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যচক্র পেরিয়ে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
এর ফলে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে দেশি ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ক্যান্সার রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই কৃষক। এই বাস্তবতা শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং কৃষি ব্যবস্থাপনা, বালাইনাশক ব্যবহারের সংস্কৃতি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সংগ্রামের কঠিন চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট করে। তাই বিষমুক্ত খাদ্যের লড়াই এখন কেবল কৃষির নয়, মানুষের জীবন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ রক্ষারও অপরিহার্য লড়াই।
অনেক কৃষকের ধারণা, একটু বেশি স্প্রে করলে ক্ষতি নেই। অথচ বাস্তবতা উল্টো। অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, একই পোকার বিরুদ্ধে বারবার স্প্রে করতে হয় এবং পোকামাকড়ের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় আরো শক্তিশালী বালাইনাশকের প্রয়োজন পড়ে। এতে কৃষকের লাভ কমে, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ হাজার টন বালাইনাশকের জন্য কৃষকের ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, দূষিত মাটি ও পানি পুনরুদ্ধার, খাদ্যে অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য প্রত্যাখ্যানের ক্ষতি। ফলে আপাতদৃষ্টিতে সস্তা মনে হলেও এই স্প্রেই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। রপ্তানির যুগে একটি চালান ফেরত আসা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, দেশের সুনাম, বাজারের আস্থা ও ভবিষ্যৎ রপ্তানি সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিষের প্রভাব এখন ক্ষেত ছাড়িয়ে মানুষের ঘরেও পৌঁছে গেছে। অনেক কৃষক স্প্রে করার সময় সন্তানকে পাশে রাখেন, অর্ধব্যবহৃত বিষের বোতল খাবারের কাছে সংরক্ষণ করেন, এমনকি খালি বোতল তেল রাখার পাত্র হিসেবেও ব্যবহার করেন। ব্যবহৃত মোড়ক ও বোতল অবহেলায় প্রকৃতিতে ফেলে দেওয়ায় পরিবেশ দূষণ আরো বাড়ে। অন্যদিকে ভোক্তার আচরণও সমস্যাকে তীব্র করছে। অতিরিক্ত চকচকে বা অমৌসুমের সবজির চাহিদা নির্বিচারে বালাইনাশক ব্যবহারে উৎসাহ দেয়। অথচ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের আচরণ পরিবর্তন জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেমন ওষুধ সেবন বিপজ্জনক, তেমনি প্রশিক্ষণ ছাড়া বালাইনাশক ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। এখনও অনেক কৃষক বোতলের ঢাকনা দিয়ে মাত্রা নির্ধারণ করেন এবং মনে করেন, দুই ঢাকনা ভালো হলে চার ঢাকনা আরো কার্যকর হবে। এই ভ্রান্ত ধারণা দূর না হলে নিরাপদ কৃষি ও বিষমুক্ত খাদ্যের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমামেকটিন বর্তমানে দেশের সর্বাধিক বিক্রীত বালাইনাশকের অন্যতম, যা কৃষকের ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক নির্ভরতারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে বালাইনাশক আইনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত এলডি ফিফটি মানদণ্ডের পরিবর্তন নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা গ্লাইফোসেটকে মানুষের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশ এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অথচ বাংলাদেশে এটি এখনও সবুজ শ্রেণির বালাইনাশক হিসেবে নিবন্ধিত ও বাজারজাত করা হচ্ছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই পরিস্থিতির দায় কার? শুধু কৃষকের ওপর দোষ চাপিয়ে এই সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। বিক্রেতার দায়িত্বহীনতা, উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কৌশল, তদারকি সংস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নীতিমালা বাস্তবায়নের দুর্বলতা মিলেই সমস্যাকে জটিল করেছে। বাস্তবতা হলো, দায় সবার এবং সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়; স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে বালাইনাশক আইন ২০১৮ এবং বালাইনাশক বিধিমালা ২০২১ কার্যকর থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। কাগজে নিয়ন্ত্রিত অনেক বালাইনাশক বাস্তবে সহজেই বাজারে পাওয়া যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দেশে এখনও ২৫ থেকে ৩০টি অতি বিপজ্জনক বালাইনাশক বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামে নিবন্ধিত বা ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
একই সঙ্গে অবৈধ বা অননুমোদিত বালাইনাশকের সরবরাহ, নিবন্ধিত পণ্যের অপব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে সমস্যাটি শুধু আইনের নয়; কার্যকর তদারকি, নিবন্ধন ব্যবস্থার নিয়মিত পর্যালোচনা, বাজার নজরদারি, বিক্রয় ব্যবস্থার জবাবদিহি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতারও প্রতিফলন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং তার কঠোর ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বালাইনাশক কখনো শুধু ক্ষতিকর পোকা ধ্বংস করে না। এর প্রভাবে মৌমাছি, প্রজাপতি, কেঁচো এবং মাটির অণুজীবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়, মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং নদী ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, কিন্তু তার ভারসাম্য হারায়। সেই ভারসাম্যহীনতার মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৮ থেকে ৪৮ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত এবং দরিদ্র পরিবারের মধ্যে এর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে অপুষ্টির পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। অন্যদিকে অতিরিক্ত তেলে-ভাজা খাবারে উৎপন্ন অ্যাক্রিলামাইডও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, অবৈধ ও অননুমোদিত বিক্রেতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বালাইনাশক আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
বালাইনাশকের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিক্রয়কর্মী, কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘদিন রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় খাদ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, কৃষকদের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার ও সঠিক মাত্রা নির্ধারণ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশনভিত্তিক বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা চালু এবং জৈব বালাই নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সম্প্রসারণ জরুরি।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কৃষকের হাতে নিরাপদ প্রযুক্তি, বিকল্প বালাই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, মানসম্মত জৈব উপকরণ এবং সময়োপযোগী কৃষি পরামর্শ পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, অধিকাংশ কৃষক ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর পদ্ধতি গ্রহণ করেন না; পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের পরামর্শ ও সহজলভ্য বিকল্পের অভাবেই তারা অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কৃষকদের দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল ভোক্তা আচরণ নিয়ে জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। বিষমুক্ত খাদ্যের লড়াই এখন শুধু কৃষি নীতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষারও অপরিহার্য অঙ্গীকার। এই লড়াইয়ে কৃষক, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাজারব্যবস্থা এবং সচেতন ভোক্তার সম্মিলিত উদ্যোগই বিষের চক্র ভেঙে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট, চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









