প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র সমাজ ও অর্থনীতির জন্য ভয়ংকর হুমকি তৈরি করেছে। দেশে অনলাইন জুয়ার অবৈধ ব্যবসা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সাইবার অপরাধ, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল হুন্ডি, অর্থ পাচার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের মতো গুরুতর বিষয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই কারবারের বড় শিকার তরুণ ও শিক্ষার্থীরা।
লোভনীয় বিজ্ঞাপন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার অনলাইন জুয়ার বিস্তারকে সহজ করে দিয়েছে। শুরুতে সামান্য জিতিয়ে দিয়ে ব্যবহারকারীকে আসক্ত করার কৌশল, পরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা- এভাবেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকে। হাতখরচ, টিউশনি বা পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের পাশাপাশি কেউ কেউ ঋণ করে পর্যন্ত জুয়ায় টাকা ঢালছেন।
এর পরিণতিতে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অপরাধ এবং মানসিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, অনলাইন জুয়ার অর্থপ্রবাহের সঙ্গে একটি সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধচক্রের যোগসূত্র। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, ব্যাংকিং চ্যানেল, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং কথিত ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ একাধিক হাত ঘুরে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে। বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত ও এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে লেনদেন আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে, এটি কেবল জুয়া নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে অর্থপাচার ও আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এ অবস্থায় শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বন্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না। একটি সাইট বন্ধ হলে একই চক্র নতুন ডোমেইন, নতুন অ্যাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নতুন পেজ নিয়ে হাজির হচ্ছে। তাই প্রয়োজন প্রযুক্তিগতভাবে দ্রুত শনাক্ত ও বন্ধ করার পাশাপাশি অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা। সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে এমএফএস প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। তবে দায় শুধু ব্যবহারকারীর নয়। অবৈধ জুয়ার লেনদেনে জেনে-শুনে সহযোগিতা করা এজেন্ট, অর্থপাচারের মধ্যস্থতাকারী এবং এর নেপথ্যের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
একই সঙ্গে ‘আপনার টাকা দ্বিগুণ করুন’ ধরনের বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন বন্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক সচেতনতা। পরিবারকে সন্তানদের অনলাইন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে এবং তরুণদের মধ্যে দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতার বিপরীতে বাস্তবভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
অনলাইন জুয়া একটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ। তাই এর প্রতিরোধও হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, সমন্বিত ও কঠোর। সাময়িকভাবে কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা কিছু ওয়েবসাইট ব্লক করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুরো অপরাধচক্রের আর্থিক ও সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া। দেশের অর্থনীতি, আর্থিক নিরাপত্তা এবং তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দেরি হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









