একটি দেশে একই সময়ে দুটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ যখন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ করে, তখন সেটিকে নিছক মৌসুমি দুর্যোগ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। ডেঙ্গুতে এক দিনে নয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যেমন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় চাপের সংকেত দিচ্ছে, তেমনি হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ছয় মাসে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া আরো গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর এই ভয়াবহ চিত্র আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়- রোগগুলো প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নানা কার্যকর উপায় আমাদের জানা, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি কেন?
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি যে দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, তা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। এ বছর ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৬২৯ জন এবং মারা গেছেন ৩৩ জন। অর্থাৎ বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ- এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন- এসব আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবছর ডেঙ্গু মৌসুমে একই সতর্কবার্তা উচ্চারিত হওয়ার পরও কেন পরিস্থিতির এতটা অবনতি ঘটে? শুধু মশা নিধনের অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় এডিসের লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে এবং কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে- এসব তথ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
হামের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছর হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ছাড়িয়েছে এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার শিশুর শরীরে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। অবশ্য উপসর্গ নিয়ে মৃত সবার নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র আরো জটিল হতে পারে। এই বাস্তবতা রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে আসে। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা- এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি থাকলে তা জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে।
এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। হামের ক্ষেত্রে টিকাদান, রোগ নজরদারি ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে একই ছাতার নিচে আনতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও পরিচ্ছন্নতা, মশা নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান ও অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিবছর মৃত্যুর পর তৎপর হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, জনস্বাস্থ্য সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য কোনো পরিসংখ্যান নয়- প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবন এবং অপূরণীয় ক্ষতি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এবারের সতর্কবার্তাও আগামী দিনের আরো বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









