একটি শিশুর স্কুলে প্রথম যাওয়া যেন একটি দীর্ঘ সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখা। সামনে থাকে আরো অনেক ধাপ- প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক। কিন্তু সিঁড়ির সব ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কতজন উপরে উঠতে পারে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আসল গল্পটি যেন সেখানেই লুকিয়ে আছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সেই সিঁড়ির প্রথম কয়েকটি ধাপে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে।
একসময় যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করাই ছিল বহু শিশুর জন্য কঠিন, এখন ১০ জনে প্রায় ৯ জন শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে। মাধ্যমিক পর্যায়েও বেড়েছে অংশগ্রহণ ও শিক্ষা সম্পন্ন করার হার। কিন্তু সিঁড়ির উপরের দিকে উঠতে উঠতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসে। অনেকেই আর শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ২০২৬ সালের ইউনেস্কো ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) রিপোর্ট’ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই দ্বৈত চিত্রই সামনে এনেছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি, অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিকে বড় ঘাটতি। একই সঙ্গে নতুন একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে- মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কেন ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় বেশি স্কুলের বাইরে থাকছে?
প্রাথমিক শিক্ষায় বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান কখনো কখনো একটি দেশের দীর্ঘ ইতিহাসকে কয়েকটি সংখ্যায় ধরে ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমনই একটি সংখ্যা হলো ৩৪।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ছিল মাত্র ‘৩৪ শতাংশ’। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ‘৯০ শতাংশ’। অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হার প্রায় তিন গুণ হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়েও ছবিটি বদলেছে। ১৯৯০ সালে এই স্তরের শিক্ষা শেষ করত মাত্র ‘২৩ শতাংশ’ শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ‘৭৪ শতাংশে’।
এই পরিবর্তন কেবল সংখ্যার গল্প নয়। এর পেছনে আছে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো, মেয়েদের শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উপবৃত্তি, সামাজিক সচেতনতা এবং বহু বছরের নীতি ও কর্মসূচি। শিক্ষা এখানে শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতরের ঘটনা থাকেনি; ধীরে ধীরে তা পরিবার ও সমাজের জীবনযাত্রারও অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি সিঁড়ির প্রথম ধাপ পেরোনো আর শেষ ধাপে পৌঁছে যাওয়া এক কথা নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার গল্পে এখন সেই প্রশ্নটিই বড় হয়ে উঠছে।
উচ্চ মাধ্যমিকে এসে কেন কমে যায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা?
প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকের তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনও অনেক পিছিয়ে। ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ছিল আনুমানিক ‘৩৮ শতাংশ’। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ছিল ‘৫৭ শতাংশ’ অর্থাৎ যে শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে, তাদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিকের শেষ প্রান্তে এসে হারিয়ে যাচ্ছে।
তবু গল্পটি পুরোপুরি হতাশার নয়। ২০১৫ সালের পর বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু ব্যবধান এখনও যথেষ্ট বড়। এখানেই শিক্ষার একটি গভীর সত্য সামনে আসে- স্কুলে ঢোকার সুযোগ তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি শিশুকে সেই স্কুলে ধরে রাখাও জরুরি।
যে অন্ধকার একসময় আরো ঘন ছিল
বাংলাদেশের শিক্ষায় কিছু পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আশার। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক বয়সী তরুণদের ‘৭২ শতাংশ’ স্কুলের বাইরে ছিল। তখন দক্ষিণ এশিয়ার গড় ছিল ৫৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এই হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ যে দরজা একসময় বহু তরুণের জন্য বন্ধ ছিল, সেই দরজা এখন অনেক বেশি খোলা।
ঝরে পড়ার হারেও এসেছে বড় পরিবর্তন। বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকসের (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘৪২ শতাংশ’ পড়াশোনা ছেড়ে দিত। ২০২৩ সালে সেই হার কমে হয়েছে ‘২১ শতাংশ’। এক অর্থে, এক প্রজন্মের মধ্যে ঝরে পড়ার হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু প্রশ্ন থাকে- যারা এখনও হারিয়ে যাচ্ছে, তারা কারা? কেন তারা হারিয়ে যাচ্ছে?
মেয়েরা এগিয়ে গেলে ছেলেরা কোথায়?
বাংলাদেশের শিক্ষার গল্পে মেয়েদের অগ্রগতি একসময় ছিল প্রায় অসম্ভব বলে মনে হওয়া একটি পরিবর্তন। কিন্তু আজ সেই গল্প অনেকটাই বদলে গেছে।
জিইএম রিপোর্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ছেলেদের স্কুলের বাইরে থাকার হার ২০০০ সাল থেকে প্রায় সব সময়ই মেয়েদের চেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ‘১৫ শতাংশ ছেলে’ স্কুলের বাইরে ছিল। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ‘৪ শতাংশ’।
উচ্চ মাধ্যমিক বয়সেও একই প্রবণতা দেখা যায়। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে স্কুলের বাইরে থাকা তরুণ ছেলেদের হার তরুণ নারীদের চেয়ে ‘৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি’। মডেলভিত্তিক হিসাবে ব্যবধান প্রায় ‘১০ শতাংশীয় পয়েন্ট’। কয়েক দশক আগে প্রশ্ন ছিল- মেয়েদের কীভাবে স্কুলে আনা যাবে। এখন সেই প্রশ্নের পাশাপাশি নতুন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে- ‘ছেলেরা কেন স্কুল ছেড়ে যাচ্ছে?’ এই পরিবর্তন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার নতুন বাস্তবতা।
একটি ছেলে যখন বয়সে বড় হয়ে যায়
স্কুলে থাকা শুধু বই পড়ার ব্যাপার নয়। কখনো কখনো বয়সও শিক্ষার ভাগ্য নির্ধারণ করে। জিইএম রিপোর্ট বলছে, কোনো শিক্ষার্থী একই শ্রেণিতে বারবার আটকে গেলে তার বয়স সহপাঠীদের তুলনায় বেড়ে যায়। তখন স্কুলের সঙ্গে তার দূরত্বও বাড়তে পারে। কাজের সুযোগ, শিশুশ্রম কিংবা পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ তাকে শ্রেণিকক্ষ থেকে আরো দূরে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শ্রেণি পুনরাবৃত্তি ও অতিরিক্ত বয়সে পড়াশোনা করার সঙ্গে ঝরে পড়ার সম্পর্কের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি শিশু যখন বয়সের তুলনায় নিচের শ্রেণিতে পড়ে, তখন বইয়ের সঙ্গে শুধু তার সম্পর্কটাই বদলায় না; বদলে যেতে পারে তার নিজের চোখে নিজের পরিচয়ও। সহপাঠীদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া এবং শেষ পর্যন্ত স্কুলকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার ঝুঁকি তখন বাড়ে। শিক্ষার সিঁড়িতে তাই শুধু ধাপ তৈরি করলেই হয় না। দেখতে হয়, কোনো ধাপে দাঁড়িয়ে কেউ যেন বারবার পিছলে না পড়ে।
শুধু স্কুলে ভর্তি করলেই গল্প শেষ নয়
২০২৬ সালের জিইএম রিপোর্ট-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো- শিক্ষার অগ্রগতি শুধু কতজন শিশু স্কুলে ঢুকেছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে তারা কতদিন স্কুলে থাকছে, সময়মতো শিক্ষা শেষ করছে কি না এবং পরবর্তী স্তরে যেতে পারছে কি না।
বাংলাদেশের পরিসংখ্যানেই সেই পার্থক্য স্পষ্ট। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ‘৯০ শতাংশ’। নিম্ন মাধ্যমিকে ‘৭৪ শতাংশ’। অথচ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার মাত্র ‘৩৮ শতাংশ’। অর্থাৎ শিক্ষার সিঁড়িতে যত উপরে ওঠা যায়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা তত কমে যায়। এর পেছনে শুধু অর্থের অভাব নেই। আছে সামাজিক বাস্তবতা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, শিক্ষার খরচ, শেখার পরিবেশ এবং পরিবারের প্রত্যাশা। কখনো একটি শিশুর হাতে বইয়ের বদলে কাজের হাতুড়ি উঠে আসে; কখনো একটি মেয়ের বই বন্ধ হয়ে যায় বিয়ের প্রস্তুতিতে; আবার কখনো দরিদ্র পরিবারের কাছে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তার আয় করাটাই জরুরি হয়ে ওঠে। তাই শিক্ষায় সমতা মানে শুধু সবার জন্য স্কুলের দরজা খোলা নয়। দরজা দিয়ে ঢোকার পর সবাইকে শেষ পর্যন্ত হাঁটার সুযোগ দেওয়াও।
বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে যে গল্প
বাংলাদেশের শিক্ষায় যে অগ্রগতি এসেছে, তার পেছনে একাধিক নীতি ও সামাজিক পরিবর্তন কাজ করেছে। জিইএম রিপোর্ট বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে ‘মাধ্যমিক পর্যায়ের উপবৃত্তি, মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং কমে আসা প্রজনন হার’। মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রভাব শুধু বিদ্যালয়ের উপস্থিতিতে থেমে থাকেনি। এর সঙ্গে বদলেছে পরিবার, জনসংখ্যা ও কর্মজীবনের নানা চিত্র। শিক্ষা ধীরে ধীরে একটি মেয়ের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু পরীক্ষাভিত্তিক বাধা সহজ করার মতো পদক্ষেপ অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষায় পরিবর্তন কোনো একক পরিকল্পনায় আসে না। নীতি, অর্থ, সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের বাস্তব জীবনের প্রয়োজন- সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
কম অর্থে অগ্রগতি, কিন্তু বিনিয়োগের প্রশ্ন থেকেই যায়
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বৈপরীত্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু দেশের তুলনায় শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের মাত্রা কম হলেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ ও শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্য দেখে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। জিইএম রিপোর্ট-এর বৃহত্তর বার্তা হলো, শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন এমন নীতি, যা কয়েক বছরের প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে হারিয়ে যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তন অনেকটা নদীর গতিপথ বদলানোর মতো। একদিনের বাঁধ দিয়ে তা হয় না। লাগে দীর্ঘ সময়, ধারাবাহিক পরিকল্পনা এবং বারবার ফিরে দেখার সাহস। এই কারণেই জিইএম রিপোর্ট কোনো দেশের একটি সফল নীতিকে অন্য দেশে হুবহু কপি করার বদলে নিজস্ব বাস্তবতা বুঝে দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
যখন জলবায়ুও শিশুর বই বন্ধ করে দেয়
বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে জলবায়ুর কথাও বলতে হয়। কারণ, কোনো কোনো শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় পরীক্ষায় খারাপ করার কারণে নয়, বরং স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটি পানির নিচে চলে যাওয়ার কারণে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত তাপ- এসব এখন শিক্ষারও সমস্যা। ২০২৬ সালে ইউনেস্কো জানিয়েছে, বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করছে। মে ২০২৬-এর একটি জাতীয় কর্মশালায় শিক্ষা পরিকল্পনাকারী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে শিক্ষার ধারাবাহিকতা কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছেন। সিরাজগঞ্জে প্রশ্নটি কখনো কখনো এমন- ‘স্কুল বন্যায় ডুববে কিনা’ নয়, বরং ‘কখন এবং কতদিন ডুববে’। ভোলার চরাঞ্চলে আবার প্রশ্নটি আরো কঠিন- ‘যে জমির ওপর স্কুল দাঁড়িয়ে আছে, আগামী বছর সেই জমিটিই থাকবে কিনা’। ঢাকার স্কুলেও জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত তাপ ও ভারী বৃষ্টির প্রভাব শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শেখার পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। অর্থাৎ শিক্ষার ভবিষ্যৎ এখন শুধু বই, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের ভবিষ্যৎ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আবহাওয়া, নদী, মাটি এবং একটি বদলে যাওয়া পৃথিবী।
সামনে এখন কোন প্রশ্ন?
২০২৬ সালের জিইএম রিপোর্ট-এর আলোয় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখলে ছবিটি একরৈখিক নয়। এখানে সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে; আলো আছে, ছায়াও আছে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ‘৯০ শতাংশ’- এটি বড় অর্জন। নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘৭৪ শতাংশ’- এটিও দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার প্রমাণ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ‘৪২ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে’ নেমে আসা- আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারছে মাত্র ‘৩৮ শতাংশ’ শিক্ষার্থী। এই সংখ্যাটিই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি। তাই পরবর্তী লড়াই শুধু ‘আরো বেশি শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসার লড়াই’ নয়। বরং তাদের ‘স্কুলে ধরে রাখার, সময়মতো শিক্ষা শেষ করানোর এবং শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার লড়াই’। ছেলে-মেয়ে, ধনী-দরিদ্র, শহর-গ্রাম কিংবা দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল- কোনো পরিচয় যেন একটি শিশুর শিক্ষার পথ ছোট করে না দেয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ২০২৬ সালের জিইএম রিপোর্ট যে, কথাটি সবচেয়ে জোর দিয়েছে, তা হলো- সমতাকে শিক্ষানীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ দিতে হবে, স্থানীয় বাস্তবতাকে বুঝতে হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে নীতি ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশের গত তিন দশকের ইতিহাস দেখিয়েছে, পরিবর্তন অসম্ভব নয়। একটি দরজা একবার খুলে গেলে আরো অনেক দরজা খোলা যায়। এখন প্রশ্ন শুধু কতজন শিশু সেই প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো- ‘যে শিশুটি শিক্ষার সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রেখেছে, তাকে কি আমরা শেষ ধাপ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব?’ বাংলাদেশের শিক্ষার আগামী দিনের গল্প সম্ভবত এই একটি প্রশ্নের উত্তরেই লেখা হবে।
লেখক : সাংবাদিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









