মানুষ মরছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে—কিন্তু প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা কাটছে না। ডেঙ্গুতে এক দিনে নয়জনের মৃত্যু এবং প্রায় দুই হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও যদি পরিস্থিতিকে নিছক ‘রোগের প্রকোপ’ বলে পাশ কাটানো হয়, তাহলে সেটি হবে ভয়াবহ বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা। একই সময়ে শিশুদের মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া আরও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?
ডেঙ্গু ও হাম—দুটিই নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। একটি মশাবাহিত, অন্যটি টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। অথচ দুটির বিস্তারই যখন মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, তখন শুধু রোগীর সংখ্যা প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। কোথায় প্রতিরোধব্যবস্থার ঘাটতি, কোথায় সমন্বয়ের অভাব, কোথায় নজরদারি দুর্বল—তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯০২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মারা গেছেন নয়জন। চলতি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৭১। আরও উদ্বেগের বিষয়, অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেই ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু ও ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্যও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির প্রমাণ দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পরও কেন কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে উঠছে না? এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে অভিযান চলছে, মশক নিধনের কর্মসূচি চলছে—তবু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কেন বাড়ছে? শুধু ওষুধ ছিটানো বা লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, পানি নিষ্কাশন, নির্মাণাধীন স্থাপনা তদারকি এবং নিয়মিত প্রজননস্থল শনাক্তকরণকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। কোনো এলাকায় মশার বিস্তার বা রোগীর সংখ্যা বাড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছে—তার মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। দায়িত্ব শুধু নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। নাগরিককে নিজের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষার সামগ্রিক দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে।
হামের পরিস্থিতি আরও গভীর উদ্বেগের। শিশুদের মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। নতুন করে হাজারের বেশি আক্রান্তের তথ্যও এসেছে। অথচ হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। তাহলে টিকা থাকা সত্ত্বেও এত শিশুর মৃত্যু কেন? কোথায় টিকাদানের ঘাটতি, কোথায় বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার ব্যর্থতা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।
বিশেষ করে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ও আক্রান্তের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তার একটি বড় অংশ পরীক্ষায় নিশ্চিত নয়।
কারণ সব রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি হয়তো প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও ভিন্ন হতে পারে। এই অবস্থায় সন্দেহজনক রোগীর নমুনা পরীক্ষা, রোগ শনাক্তকরণ এবং নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। হাম মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। কোনো শিশু টিকার বাইরে থাকলে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি চালাতে হবে। টিকাদানে ঘাটতি থাকলে তার দায় শুধু অভিভাবকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাজ হলো—যে শিশু বাদ পড়েছে, তাকে শনাক্ত করে টিকার আওতায় নিয়ে আসা।
ডেঙ্গু ও হামের এই যৌথ সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: সংকট তৈরি হওয়ার পর তৎপরতা দেখানো যথেষ্ট নয়, আগেই প্রস্তুতি নিতে হয়। ডেঙ্গুর মৌসুম আসার আগে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
হাম ছড়িয়ে পড়ার আগে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় জনবল, শয্যা, ওষুধ ও চিকিৎসা-সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যকে প্রশাসনিক অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। প্রতিদিনের বুলেটিনে নতুন রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা জানানো জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো সেই সংখ্যাগুলো কেন বাড়ছে—তার উত্তর খোঁজা এবং ব্যবস্থা নেওয়া। মানুষের জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অপূরণীয় ক্ষতি রয়েছে।
এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মশক ব্যবস্থাপনা এবং হাম প্রতিরোধে ব্যাপক টিকাদান—দুই ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য ফল চাই। শুধু অভিযান, সভা, প্রচার বা পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়; প্রয়োজন বাস্তব ফলাফল। মৃত্যুর এই মিছিল থামাতে না পারলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্যের দাবি মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









