অভিনেতা ও প্রযোজক ফাহাদ ফাসিলকে গণমাধ্যমের সামনে খুব বেশি দেখা যায় না। হায়দরাবাদে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর্কা মিডিয়া ওয়ার্কসের কার্যালয়ে একদল সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করে তাই নিজেই বললেন, ‘এ কথা আমি অনেকবারই শুনেছি।’
তার নতুন তেলুগু ছবি ‘ডোন্ট ট্রাবল দ্য ট্রাবল’ মুক্তি পাওয়ার কথা ২ অক্টোবর। ফাহাদের কাছে ছবিটি যেন তেলুগু সিনেমায় নতুন করে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ। ‘মনে হচ্ছে, এটাই যেন আমার প্রথম তেলুগু ছবি। তাই ভাবলাম, এসে সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে যাই।’ তবে তেলুগু দর্শকের কাছে ফাহাদ মোটেই অপরিচিত নন। ‘পুষ্পা’ ছবিতে ভানওয়ার সিং শেখাওয়াতের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিতি পেয়েছেন। হায়দরাবাদে তাঁর মালয়ালম ছবিরও বড় দর্শকগোষ্ঠী আছে। ‘আবেশম’ মুক্তির পর শহরে দর্শকের উচ্ছ্বাস তারই প্রমাণ। ফাহাদ বলেন, ‘আশা করি ‘ডোন্ট ট্রাবল দ্য ট্রাবল’ও দর্শক একইভাবে গ্রহণ করবেন।’
শশাঙ্ক ইয়েলেটি পরিচালিত ছবিটি প্রযোজনা করেছেন ‘বাহুবলী’ দলের এসএস কার্তিকেয়া ও শোবু ইয়ারলাগাড্ডা। ছবির নামটি নেওয়া হয়েছে অভিনেতা বালকৃষ্ণের একটি জনপ্রিয় সংলাপ থেকে। গল্পে এমন কিছু আছে, যা ঝামেলা ডেকে আনে—তাই এই নাম, বললেন ফাহাদ। ছবির তেলুগু ট্রেলারে বালকৃষ্ণের কণ্ঠও রয়েছে। ফাহাদ বছরে গড়ে মাত্র দুটি ছবির চিত্রনাট্য শোনেন। এই ছবির গল্প তাকে টেনেছে তার নতুনত্বের কারণে। ‘মালয়ালম সিনেমায় নাটকীয়তা সাধারণত বেশ সংযত। এই ছবিতে মূল গল্পের সঙ্গে জাদু ও কল্পনার উপাদান মিশেছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে মমতা ও ভালোবাসা। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি।’
৭৯টি লোকেশনে শুটিং
‘ডোন্ট ট্রাবল দ্য ট্রাবল’–এর শুটিং হয়েছে হায়দরাবাদ ও সাইবারাবাদের ৭৯টি লোকেশনে। ব্যস্ত রাস্তা থেকে শিল্প ও বাণিজ্য মেলা ‘নুমাইশ’—বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা বসানো হয়েছে। শুটিং দেখতে যাওয়া দর্শকদের বানানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওও ফাহাদের চোখে পড়েছে। বাস্তব লোকেশনে শুটিং করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ তিনি। ‘আমার প্রায় সব মালয়ালম ছবিই বাস্তব লোকেশনে শুট হয়েছে। ‘পুষ্পা’ ছিল ব্যতিক্রম। সেটে শুট করেছি। বাস্তব জায়গায় কাজ করতে আমার ভালো লাগে।’
ছবির গল্পে ফাহাদের চরিত্র সুরি, শিশু অভিনেতা সারা পালেকর এবং একটি বিগল কুকুর গুরুত্বপূর্ণ। জাদুর ক্ষমতা ও অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ থাকায় *মিস্টার ইন্ডিয়া* ছবির কথা মনে পড়তে পারে। তবে ফাহাদের ভাষায়, ‘এটা বড়দের জন্য বানানো শিশুদের ছবি। আশা করি, দর্শক জীবনের এমন কিছু বিষয় নিয়ে ভাববেন, যেগুলো কোনো একসময় তারা অবহেলা করেছিলেন।’ তেলুগুতে নির্মিত ছবিটি মালয়ালম ও তামিল ভাষাতেও মুক্তি পাবে। তেলুগু সংলাপ আয়ত্ত করা সহজ ছিল না ফাহাদের জন্য।
‘আমি মালয়ালমে ভাবি, তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করি, এরপর তেলুগুতে বলি। তাই প্রক্রিয়াটা খুব মসৃণ ছিল না। পর্দায় এমন একজন মানুষকে দেখাতে চেয়েছি, যে সত্যিই তেলুগুতে ভাবে ও কথা বলে। শশাঙ্ক ও কার্তিকেয়ার সাহায্য নিয়েছি।’
শিশু অভিনেতা সারার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন ফাহাদ। সংগীত পরিচালক কালাভৈরবের কথাও বলেছেন আলাদা করে। ‘এই ছবিতে তাঁর সংগীত যেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।’

লেখকের গুরুত্ব
মালয়ালম সিনেমায় লেখকদের গুরুত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। ফাহাদের অবস্থান স্পষ্ট: অভিনেতার চেয়ে লেখক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘আমি সব সময়ই মনে করি, অভিনেতার চেয়ে লেখক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লেখক ও পরিচালক—দুজনের ওপরই আমি সমানভাবে নির্ভর করি। তাঁদের একসঙ্গে কাজ করতে হয়। এই ছবিতে শশাঙ্কের সঙ্গে অনেক আলোচনা করেছি, কারণ সে একই সঙ্গে লেখক ও পরিচালক।’ তেলুগু ও তামিল সিনেমা থেকে মালয়ালম শিল্প কী শিখতে পারে? ফাহাদের উত্তর, বড় দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা।
‘বিশেষ করে তেলুগু সিনেমা থেকে শেখার আছে—কীভাবে একটি ছবিকে বড় দর্শকের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এখানে অনেক পরিকল্পনা থাকে। আর্কা থেকে আমি কিছু বিষয় শিখেছি। ভবিষ্যতে নিজের কিছু ছবিতে সেগুলো কাজে লাগাতে চাই।’ প্রযোজক হিসেবেও ফাহাদ এখন বেশ সক্রিয়। ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’–এর সাফল্যে তিনি খুশি। পরিচালক গিরিশ এ ডি-র সঙ্গে এর আগে ‘প্রেমালু’ ছবিতেও কাজ করেছেন।
‘আমি সব সময় চিত্রনাট্য হুবহু অনুসরণ করি না। কিছু পরিবর্তনের জায়গা থাকা দরকার। তবে ছবির কাঠামো—শুরু, মাঝখান ও শেষ—নিয়ে আমি সচেতন। ‘প্রেমালু’ তৈরির সময় গিরিশ শুট করা অংশ আমাদের দেখাত। আমরা সবাই মিলে আলোচনা করতাম।’
প্রযোজনাকে ক্রিকেট খেলার সঙ্গে তুলনা করেন ফাহাদ। ‘আমরা জানি না জিতব কি না। কিন্তু খেলাটা খেলতে মজা লাগে।’
২৪ বছর পরও
ফাহাদের মতে, কোনো ছবি ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না, অনেক সময় অভিনেতা-পরিচালকেরা সেটি বুঝতে পারেন। ‘প্যাট্রিয়ট’ ছবির ক্ষেত্রেও তিনি বুঝেছিলেন, কাজটি প্রত্যাশামতো এগোচ্ছে না।
‘কখনো কখনো আমরা সবাই বুঝতে পারি, কিন্তু তখন অসহায় হয়ে যাই। শিল্পী হিসেবে আমরা শুধু আমাদের কাজের প্রতি সৎ থাকতে পারি।’ ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে অভিনয়ে অভিষেক। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে ২৪ বছর। অথচ অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন তার ছিল না। বাবা ফাজিল ছিলেন মালয়ালম ও তামিল সিনেমার পরিচিত পরিচালক, তবু অভিনয় তার প্রথম পছন্দ ছিল না।
‘আমার প্রথম ছবি ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর প্রকৌশল পড়তে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাই। পড়াশোনা ছেড়ে দর্শন নিয়ে পড়তে শুরু করি। হারানোর কষ্ট আর দূরে চলে যাওয়ার বিষয়টা আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছিল।’ ছয় বছর পর দেশে ফেরেন। সেই সময়ে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যারা তাকে ভালো বই ও বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচিত করে দেন।
‘আমি তখন শুধু একটি সফল ছবি করতে চেয়েছিলাম। এরপর একের পর এক কাজ করতে করতে ৬০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছি।’
২৪ বছর পরও তাই ফাহাদের কাছে অভিনয় যেন সেই পুরোনো খেলা—জানা নেই শেষ পর্যন্ত জয় হবে কি না, কিন্তু খেলাটা এখনো আনন্দের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









