একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনো কখনো একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র সামনে নিয়ে আসে। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল তেমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত ২২ বছরের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন পাসের হার। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
একদিকে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনকারীদের আনন্দ, অন্যদিকে অকৃতকার্য ও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের হতাশা—সব মিলিয়ে এবারের ফলাফল যেন শিক্ষাঙ্গনে আনন্দ-বেদনার এক মিশ্র প্রতিচ্ছবি। তবে এই হাসি-কান্নার আড়ালে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে, তা হলো—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারছে? ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি এই প্রশ্নকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে।
এবার আরো কমে হয়েছে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে, ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। একে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সামগ্রিক ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইংরেজি শুধু পরীক্ষায় পাস করার বিষয় নয়; উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এই মৌলিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। এজন্য শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিকে দায়ী করলে চলবে না। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা, নিয়মিত পাঠদান এবং ইংরেজি শেখার উপযুক্ত পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ফলাফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি। গত বছর যেখানে ২০২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৯৩। বিপরীতে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪৫ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৯-এ। এ চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হচ্ছে, সেগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষক, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে।
এবারের পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন ও বিতরণে একাধিক অসংগতির অভিযোগও উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন নিয়েও অভিযোগ ছিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের অনিয়মিতদের প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে, কোথাও প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
এসব ঘটনা পরীক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। তবে ফল বিপর্যয়ের পেছনে এসব কারণের প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার বলছে, এবার খাতা মূল্যায়নে নির্মোহ অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এটি ইতিবাচক। পরীক্ষার্থীরা যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাওয়া উচিত। তবে কঠোর মূল্যায়ন আর যথাযথ মূল্যায়ন এক বিষয় নয়।
খাতা দেখার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুল, অসংগতি কিংবা মূল্যায়নকারীদের দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সেটিও শনাক্ত করতে হবে। এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। এইচএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষার প্রক্রিয়াও যেন যথাযথ, স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা কমতে পারে। তবে তা যেন কোনোভাবেই প্রকৃত মূল্যায়নের বিকল্প না হয়।
পাশাপাশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার প্রতিও পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংবেদনশীল হতে হবে। একটি পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। তাই ব্যর্থতার জন্য তাদের অপমান বা অতিরিক্ত মানসিক চাপে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানো কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বৃদ্ধি করা নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, কতটা বুঝতে পারছে এবং বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। এজন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি স্তরে শিখন-ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। এবারের ফলাফল তাই কেবল পাসের হার কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় শুধু তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কিংবা খাতা মূল্যায়নের কঠোরতাকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমস্যার গভীরে যাওয়া, দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর সংস্কার।
শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। কারণ পরীক্ষার ফলাফলে সাময়িক সাফল্য-ব্যর্থতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জনে এবারের ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









