রাজধানী ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন নতুন বছরের শুরুতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া মানুষের ওপর বাড়তি ভাড়ার বোঝা যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। মিরপুরে পাঁচ হাজার, মোহাম্মদপুরে তিন হাজার কিংবা অন্য এলাকায় এক থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা কেবল কয়েকটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি রাজধানীর আবাসন সংকটের গভীরতর সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
ঢাকায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধি যেন বছরের পর বছর ধরে চলা এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নতুন বছর এলেই অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দেন। ভাড়াটিয়াদের সামনে কার্যত দুটি পথ খোলা থাকে- বাড়তি ভাড়া মেনে নেওয়া, অথবা বাসা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু বাসা বদলানো কি এত সহজ? নতুন বাসার অগ্রিম ভাড়া, স্থানান্তর ব্যয়, সন্তানের স্কুল পরিবর্তন, কর্মস্থলে যাতায়াতের বাড়তি খরচ- সব মিলিয়ে বাসা বদলও অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা। ফলে, বাড়িওয়ালার সিদ্ধান্তের কাছে ভাড়াটিয়ারা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে, বাড়িওয়ালাদের ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তিও একেবারে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, লিফট, পানির পাম্প, নিরাপত্তা, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন খাতে তাঁদের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু এসব ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর অধিকার কারও থাকতে পারে না। বাড়িভাড়া নির্ধারণে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়ের স্বার্থ এবং বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে আবাসনের মতো মৌলিক প্রয়োজনকে সম্পূর্ণভাবে অনিয়ন্ত্রিত রাখা যায় না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুসারে, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। সংস্থাটির আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাঁদের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন বাড়িভাড়ায়। এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা টেকসই নগরজীবনের পরিচায়ক নয়। একজন মানুষের আয়ের বড় অংশ যদি শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় ভাড়াটিয়ারা কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা পাচ্ছেন না। আইন অনুসারে, নির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া দুই বছরের মধ্যে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ নেই। অথচ বাস্তবে অনেক বাড়িওয়ালা নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। আইনের বিধিমালা প্রণয়ন, ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় আইনটি অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমেই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এলাকাভিত্তিক বাড়িভাড়া নির্ধারণে যৌক্তিক মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। বাড়িভাড়া বৃদ্ধির আগে নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশ দেওয়া, লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা এবং ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজলভ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি।
পাশাপাশি বাড়িওয়ালাদের বৈধ ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে ভাড়া সমন্বয়ের সুযোগ রাখতে হবে। সরকারের দায়িত্ব শুধু বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন নয়, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান ও শিক্ষাব্যবস্থার চাপ কমাতে পরিকল্পিতভাবে ঢাকার বাইরে আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ার আবাসন গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
আবাসন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অন্যতম শর্ত। বাড়িওয়ালার ন্যায্য আয় যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভাড়াটিয়ার নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অধিকারও রক্ষা করতে হবে। নতুন বছরের আগমনে ভাড়াটিয়াদের মনে আতঙ্ক নয়, স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরই নতুন করে লাখো পরিবারের জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সংকট বাড়িয়ে তুলবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









