হ্যাঁ বলুন!
খোন্দকার গোশফাক হতভম্ব চোখে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। জিহ্বা আড়ষ্ট। দশাসই শরীরের মধ্যে এক ফোটা শক্তি নেই। মনে হচ্ছে, লোকটা তুলার ছন্দে উড়ছে আকাশে। মি. খোন্দকার গোশফাকের সঙ্গের সাইনুল মাফিয়া, চিলিয়া রহমানী আর পয়নাল হোসেনীর অবস্থা একই রকম। প্রত্যেকের মুখ আছে, জিহ্বা আছে, দাঁতও আছে কিন্তু মুখের মধ্যে শব্দ ফুটছে না।
টেবিলের ওপাশ থেকে রিভলভিং চেয়ারে বসে দুলতে দুলতে বলপেন দিয়ে ডান কান চুলকাতে চুলকাতে চাংচু আবারও প্রশ্ন করছে, হ্যাঁ বলুন। কোত্থেকে এসেছেন আপনারা?
ঢোক গিলে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে জবাব দেয় মি. খোন্দকার গোশফাক, আপনার কাছে আমরা আমপুরা থেকে এসেছি।
টেবিলের ওপাশ থেকে হো হো হাসে মি. চাংচু। লেজের ওপর ডান পা ভর দিয়ে একটু চুলকিয়ে বলে, এটা তো আমপুরা থানা। আপনাদের নির্দিষ্ট করে বলা দরকার, আমপুরার কোন জায়গা থেকে এসেছেন?
চিলিয়া রহমানী বড় বড় চোখে বলে, কালা ফরাজিপাড়া থেকে এসেছি।
মাথা দোলায় মি. চাংচু কালা ফরজিপাড়া থেকে এসেছেন বুঝতে পেরেছি। তো বলুন কি করতে পারি আপনাদের জন্য।
সমস্যা হচ্ছে আমাদের বস, মানে আমপুরার ওয়ার্ড কমিশনার মি. বাল দিগ্বিজয় বাবু রায় বলে পাঠিয়েছেন এই থানায় এলে ওসি খবির মিয়াকে পাওয়া যাবে। টেলিফোনে খবির মিয়ার সঙ্গে তিনি কথা বলে আমাদের পাঠিয়েছেন।
বুঝতে পেরেছি, আপনাদের ওয়ার্ড কমিশনার মি. বাল দিগ্বিজয় বাবু রায় আমার সঙ্গেই কথা বলেছিলেন টেলিফোনে এইতো আধাঘণ্টা আগে। তিনিও বলেছিলেন আপনারা আসবেন। তো বসুন... ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বলে আমপুরা থানার ওসি মি. চাংচু।
ভয়ে ভয়ে বসে তিনজন ওসির সামনের টেবিলের চেয়ারে। চেয়ারের ওপর কাঠের নেম প্লেটে লেখা, আমপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি মি. চাংচু। অথচ কমিশনার কথা বলল ওসি খবির মিয়ার সঙ্গে। ঘটনাটা কি? মি. খোন্দকার গোশফাক ভয়ানক চালাক আর ঘাগু লোক! সেই ঘাগু লোকও ভয় থরথর কাঁপছে। ভয়ানক ঘটনা আমপুরা থানার ওসি একটা কুত্তা!
শুনুন মি. খোন্দকার গোশফাক, আপনি ঠিকই ধরেছেন- আমি মি. চাংচু। আমপুরা থানার ওসি কুকুর, সরকারি নাম মি. খবির মিয়া। একটু হাসে, আবার ডান কান চুলকায়- আপনি বা আপনারা যা বলতে এসেছেন, নির্ভয়ে বলতে পারেন আমার কাছে।
একটা কুকুর থানার ওসি! কি বলার আছে? কোন দেশে বাস করছি? ওদিকে বসের বাড়িটাও কুকুরদের দখলে। থানায় এলাম কুকুরদের বিরুদ্ধে মামলা করতে, আর এসে দেখি থানার ওসিও কুকুর। ও ব্যাটা সরি, কুত্তাটাকে কি আর বলব? বললে তো কুকুরদের বিরুদ্ধেই বলতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময়ে নীলকর হারামজাদাদের অসহ্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে, বিচার করত সাদা চামড়ার বেনিয়া হারামজাদা বিচারকরা। সুতরাং অত্যাচারিত হয়েও সর্বস্বান্ত হয়েও মামলার রায় যেত নীলকরদের পক্ষে! ‘মড়ার ওপর খাঁড়া’র ঘা আর কী! দুনিয়ায় শোষণের ইতিহাস একই। নাকি কোনো ভুল জায়গায় এসে পড়লাম?
কি বলবেন না? তাড়া দেয় ওসি মি. চাংচু। আমার একটা জরুরি বৈঠক আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি হালাকু হারামজাদার সঙ্গে। যা বলার দ্রুত বলুন। আর হ্যাঁ, চা খাবেন আপনারা?
চা? জিহ্বা আড়ষ্ট মিলিয়া রহমানের। এক কাপ চা আর আগে এক গ্লাস পানি পেলে ভালোই হতো। ঘাড় নাড়িয়ে বলে, চায়ের সঙ্গে এক গ্লাস পানি―
সঙ্গে সঙ্গে যোগ দেয় জয়নাল হোসেন, আমিও!
পানি আর চা? আমপুরা থানার ওসি মি. চাংচু বা মি. খবির মিয়া হালকাভাবে জানতে চায়।
ঘাড় নাড়ায় জয়নাল হোসেন, জি!
মি. চাং চু কলিং বেল টেপে উঁচু হয়ে সামনের বাম পা দিয়ে। সঙ্গে পেছনের দরজা খুলে যায়। শাড়ি পরিহিত একটা কুকুর এসে দাঁড়ায়, স্যার!
সামনের তিনজনকে দেখিয়ে আদেশ করে, ওনাদের চা আর পানি দাও।
ওকে স্যার। শাড়ি পরিহিত কুকুরটা ভেতরে চলে যায়। কিন্তু মি. খোন্দকার মোশতাকের হার্টবিট আরও বেড়ে যায়। সঙ্গে তেষ্টাও। শাড়ি পরা কুকুরটাকে দেখার পর মি. খোন্দকার মোশতাকের পিলে চমকে একেবারে নিচে নেমে গেছে। আরে শালা, কুত্তায় পরে শাড়ি! বাঙালি রমণীদের শাড়ির আর ইজ্জত রইল না। আচ্ছা, আমি বা আমরা এখন কোথায়? ঠাণ্ডা শহরের আমপুরায়তো? আমরা কি ঠিক জায়গায় এসেছি?
নিন, আপনাদের চা এবং পানি- ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে মি. খোন্দকার মোশতাক। শাড়ি পরিহিত কুকুরটা লম্বা হয়ে নিচের দুপায়ের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁতের সঙ্গে শাড়ির আঁচল বেঁধে সামনের পা দুটাকে হাতের মতো ব্যবহার করে ট্রে নিয়ে এসেছে। ট্রের ওপর তিন কাপ ধূমায়িত চা আর তিনটা পানির গ্লাস। একের পর এক পানির গ্লাস আর চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে চলে যাচ্ছে।
মিলিয়া রহমান পানির গ্লাস মুখে নিয়ে এক নিশ্বাসে সবটকু পানি পান করে গ্লাসটা শব্দ করে রাখে টেবিলের ওপর। শব্দের কারণে তাকায় মি. চাংচু। ওরাও তাকায়, জিহ্বা বের করে হাসে মি. চাং চু। হাসির সঙ্গে মুখ গহব্বের বিকট দাঁতগুলো বের হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে শিউরে ওঠে মি. খোন্দকার মোশতাক, মিলিয়া রহমান আর জয়নাল হোসেন। হাসি থামিয়ে মি. চাংচু বলে, আপনারা চা খাচ্ছেন না কেন?
সঙ্গে সঙ্গে তিনজনই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দেয়, অদ্ভুত মিষ্টি চা। তাকায় পরস্পরের দিকে। বুঝে উঠতে পারছে না, চা খাচ্ছে না মজার মিষ্টি খাচ্ছে।
চা ভালো লাগছে না? মি. চাংচু জিজ্ঞেস করে।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয় মিলিয়া রহমান, না না, চা ভীষণ ভালো লাগছে। কিন্তু..
কিন্তু আমপুরা থানার ওসি মি. চাংচু পাল্টা প্রশ্ন করে, কিন্তু কি?
আমরা বসে আছি, একটা নালিশ করতে এসেছিলাম। খুবই জরুরি...
হ্যাঁ বলুন, তাড়া দেয় মি. চাংচু। আর মি. দিগ্বিজয় রায় তো ফোন করেছিলেন আমাকে। আমি বললাম, আমাকে বলুন সরাসরি। তিনি বললেন, না আমার লোক আপনার অফিসে গিয়ে সরাসরি জানাবে। তো বলুন, আমি বেশিক্ষণ বসতে পারব না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হালাকু হারামজাদার সঙ্গে বৈঠক আছে তিনটায়।
নড়েচড়ে বসে মি. খোন্দকার মোশতাক, আমাদের সম্মানিত ওয়ার্ড কমিশনার মি. দ্বিগীজয়ের বাড়ি দখল করতে চায়―
ভ্রু কুঁচকে তাকায় আমপুরা থানার ওসি মি. চাংচু, আমার এলাকায় দখলবাজি? গরগর করে গলার ভেতরে ক্রোধের কাঠ-ফাটায়, বলুন তো ওর নাম কি? কোন গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে?
দড়িবাজ মি. খোন্দকার মোশতাক থেমে যায়। কি বলবে? বলবে আপনার মতো একদল কুকুর এসে মি. দিগ্বিজয় রায়ের বিশাল বাড়ি দখল করার চেষ্টা করছে। আর কি অবাক ঘটনা, কুকুরগুলো বেশ টাগড়া- অনেকটা আপনার মতো।
দুই.
ঠাডা শহরের আমপুরার ওয়ার্ড কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায় নিজের বাড়ির চারতলায় মধুমাখা রুমে বসে শরীরে মুধ মাখাচ্ছিল। মধু মেখে দিচ্ছে মিসেস শরবতী। মধু মানে দ্রাক্ষারস। দিগ্বিজয় রায়কে ঘিরে বসেছে চারজন। ভাটারা থেকে এসেছে শৃংখলা কমিশনার খাইখাই উজবুক। উগান্ডা থেকে এসেছে মতিয়াক মারবেল। মতিয়াক মার্বেল একা আসে নাই, দুইজন বান্ধবী নিয়ে এসেছে। মি. দিগ্বিজয় রায়ের অনেক দিনের শখ, আফ্রিকা মহাদেশের কালো নারীর কালো শরীর ভোগ করা। সেই ভোগের দায়িত্ব নিয়ে এসেছে উগান্ডা থেকে মতিয়াক মারবেল। রক্ত মাংসের কালো শরীরের কালো নারী দুজন ঘুমাচ্ছে পাশের রুমে। আটত্রিশ ঘণ্টার বিমান যাত্রার ধকল সামলে মাত্র গত দুপুরে এসে নেমেছে ঠাডা শহরে। পথের দূরক্বে খুবই ক্লান্ত ওরা। এক পলক দেখেছে মি. দিগ্বিজয় রায়। দুজন দুই রকম। একজন ছোট টাইপের, ঠাডা শহরের মেয়েদের মতো, হালকা-পাতলা- বুকের বর্তুলও পাতলা-সুতলা। মাথার চুল কম। কিন্তু অন্যজন বিশাল আকৃতির। শরীরের ওজন একশো ত্রিশ কেজির কম না। চওড়া বুক, বুকের ওপরের স্থাপিত স্তন দুটি বিশালাকার। মাথার চুল কোমড় পর্যন্ত নামানো। বিশাল ওই হস্তী শরীরের নিচে একবার গেলে আর ফিরে আসা যাবে কি না ভাবছে মি. দিগ্বিজয় রায়। কিন্তু মনে মনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, অনেক অর্থকরী ব্যয় করে আনা এই কালো মাংসের শরীরের মধ্যে যদি ঢুকতেই না পারল, কিসের জীবন? যখন সব হাতের মুঠোয়?
চতুর্থজন এসেছে আসরে যোগ দিতে পুরান ঠাডা থেকে- মি. আম্বিয়া চরণ । বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। কি ব্যবসা করে মি. আম্বিয়া চরণ ছাড়া কেউ জানে না কিন্তু প্রতি বছর ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ছে। দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ মেলামেশা মি. আম্বিয়া চরণের। পাওয়ারে নেই কিন্তু খুবই পাওয়ারফুল লোক। মন্ত্রী বানানো ও নামানো- হাতের তুড়িতে করে থাকে মি আম্বিয়া চরণ। এই লোককে হাতে রাখা মানে, নির্ভয়ে ঠাডা শহরে যা ইচ্ছে তাই করার অবাধ লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া।। অবশ্য মি. আম্বিয়া চরণ আজ এসেছে মদ্যপানের সঙ্গে সূদুর আফ্রিকার কালো মাংশের লোভে। মি. আম্বিয়া চরণ যখন শুনছেন মি. দিগ্বিজয় রায়ের কাছে, উগান্ডা থেকে কালো মাংসের জটিল মুরগি আসছে―
কালো মুরগি ফ্রম উগান্ডা? অবাক প্রশ্ন মি. আম্বিয়া চরণের।
বুঝলেন না, মোবাইলে খিকখিক হাসে মি. দিগ্বিজয় রায়―আরে বস দেশে বিদেশে প্রচুর সাদা বাদামি নারীর মাংস চেখেছেন, খেয়েছেন কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশের কালো নারীর লাল মাংস খেয়েছেন? চেখে দেখেছেন?
বিছানায় বসে বসে আলাপ করছিল মি. আম্বিয়া চরণ। দিগ্বিজয় রায়ের প্রশ্নে শরীরের কোষে কোষে মুহূর্তের মধ্যে ভিন্ন স্বাদের মাংস চাখার লোভ টগবগিয়ে ফুটতে থাকে। বসা থেকে নেমে দাঁড়ায় মি. আম্বিয়া চরণ, না তো ভাই। কখনো চাখাতো ভালো করে দেখিই নাই। মাঝেমধ্যে টিভির নিউজে আর নীল ছবিতে―
আমি ব্যবস্থা করতেছি, ডাটের সঙ্গে গম্ভীর গলায় বলে আমপুরা এলাকার অনির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর মি. দিগ্বিজয় রায়।
মানে?
উগান্ডায় আমার এক বন্ধু আছে, মি. মতিয়াক মারবেল। মাস খানেকের ভ্রমণে আসতেছে আমাদের দেশে। ওকে দুটি শাসালো মাংসঅলা কালো নারী নিয়ে আসতে বলেছি।
হাচাই? মি. আম্বিয়া চরণের শরীরে গরম মাংশাসী নৃত্যের জোশ উঠেছে। হঠাৎ অভাবনীয় সুখের সংবাদে মি. আম্বিয়া চরণের নেচে উঠতে ইচ্ছে করে। যেমন ইচ্ছে তেমন করছে- নাচছেও রুমের মধ্যে, মোটা পেট পেটের নিচের কোমড় দুলিয়ে নাচছে।
একশো ভাগ না, তিনশো ভাগ সত্য। আর ঘণ্টখানেকের মধ্যে আমাদের ঠাডা শহরের বিশাল এয়ারপোর্টে নামছে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। আসল বলে―
আমি? আমি কি করব? আমি কি এখনই আসব?
বুঝতে পারছে মি. দিগ্বিজয় রায়, আফ্রিকার কালো নারীর লাল মাংসের লোভে মি. আম্বিয়া চরণ অস্থির হয়ে পড়েছে। অনেক দিনের চেনা মানুষ। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা দুজনের। হাসতে হাসতে বলে, এখনই আসার দরকার নাই। ওরা আমার বাসায় এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল। আপনি রাতের দিকে আসেন।
ওকে, বিকেলে এক তেলতেলে মন্ত্রীর সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। সেটা সেরেই চলে আসব। আমি কি বোতল নিয়ে আসব?
বস, আপনি আমার বাসায় আসবেন, আবার বোতলও আনবেন- এটা হয় না। মাংস বোতল সব আমিই আপনার জন্য রেখে দেব।
ওকে, ওকে...। চনমনে গলায় বলে মি. আম্বিয়া চরণ। তাহলে ওই কথাই রইল, রাতে আসতেছি।
জি.. আসুন।
রাতের সেই আসর কেবল জমে উঠেছে। মি. আম্বিয়া চরণ মোটা মাংসের মেয়ে টাটিয়া ট্যাম্বোকে বেছে নিয়ে ওর পাশেই বসেছে। গ্লাসের তরল মুখে ঢালছে আর টাটিয়া ট্যাম্বোর বিশাল স্তনে হাত ঘষছে। মি. দিগ্বিজয় ছোট সাইজের মেয়ে রুথিয়া ক্যামবেলকে নিয়ে বসেছে। রুমের মধ্যে বিশাল দেয়ালজুড়ে আফ্রিকান নগ্ন নৃত্য চলছে ড্রামের তালে তালে ঠিক সেই সময় দরজায় এসে টোকা দেয় দারোয়ান দারনিল।
মুহূর্তে মেজাজ সপ্তমে পৌঁছে যায় মি. দিগ্বিজয় রায়ের। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে তাকায় মি. আম্বিয়া চরণের দিকে। আম্বিয়া চরণ টাটিয়া ট্যাম্বোর বুক থেকে মুখ সরিয়ে বলে, নিশ্চয় কোনো জরুরি...
রুথিয়া ক্যামবেলকে সরিয়ে রেখে দাঁড়ায় মি. দিগ্বিজয় রায়। দরজার পাশে গিয়ে দরজা খুলে বিরক্তির সঙ্গে তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। অবাক হলো দিগ্বিজয় রায়। মাথাটা নেড়ে নেয় ডানে-বামে―মাত্র তো কয়েক পেক। এমন তো হবার নয়। কেউ নেই, অথচ গোপন রুমের দরজায় টোকার শব্দ শুনেছে। এই রুমের খবর জানে অল্প কয়েকজন মানুষ। আটতলা বাড়িটার চারতলার শেষ দিকে বিশেষ ডিজাইনের রুম। কোন দিকে দিয়ে বোঝার উপায় নেই, এখানে একটা বড় গোপন কক্ষ আছে। মি. দিগ্বিজয় রায় ডাক দেয়, দারনিল?
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকে- দারনিল?
দারনিলকে আমরা বেঁধে রেখে এসেছি। চমকে শব্দের উৎস লক্ষ করে তাকায় আমপুরা এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায়। তাকিয়ে চমকে ওঠে, কোনো মানুষ নয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চারটে কুকুর। কুকুরগুলো অনেক বড়। গাড়িতে আসা-যাওয়ার সময় গলিটার মধ্যে অনেকগুলো কুকুর দেখেছে মি. দিগ্বিজয় রায়। কুকুরগুলো গলির বাড়িগুলোর সামনে জটলা পাকিয়ে শুয়ে থাকে। মাঝরাতে বিকট ঘেউ ঘেউ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলে বিরক্ত লাগে মি. দিগ্বিজয় রায়ের। সেই রাতে ভাবত সকালে সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে অভিযোগ দিতে হবে, আমপুরার এই গলি থেকে কুকুর উচ্ছেদের। কিন্তু সকালে আর মনে থাকে না। অথচ সেই কুকুরগুলোর কয়েকটা বাসায়, একেবারে গোপন রুমের দরজায়। আবার বলে কি না―দারনিলকে বেঁধে রেখে এসেছে।
দারনিলকে বেঁধে রেখেছ কেন?
চারটে কুকুরের সামনের কুকুরটা তিনটার চেয়ে বেশ লম্বা। আর স্বাস্থ্যবান। নাদুস-নুদুসও। বাঁকানো লেজ নাড়াতে নাড়াতে বলে, ও আমাদের ঢুকতে দিতে চাইছিল না।
ঠিকই আছে, তোরা কুকুর, মানে কুত্তা। তোরা বাড়ির মধ্যে ঢুকলি কেন? একটু তেড়ে গলায় বলে মি. দিগ্বিজয় রায়। পাওয়ার তো কম না। এলাকার নির্বাচিত কমিশনার। দেশের ক্ষমতায় নিজ দলের সরকার। মুহূর্তের ইশরায় কত মানুষ বাড়ি গাড়ি ফানা ফানা হয়ে যায়, আর এই কুত্তা...
মি. দিগ্বিজয় রায়, সামনের কুকুরটা গরগর গলায় বলে, আমরা আপনার এই বাড়িটা দখল নিতে এসেছি।
আমার বাড়ি দখল করতে এসেছিস? কুকুরের চেয়েও গরগর গলায় বলে মি. দিগ্বিজয় রায়। তোরা তো কুত্তা, জানিস কোথায় কার বাড়ি এসেছিস?
আমরা যে কুত্তা, আমরা ভালো করেই জানি মি. দিগ্বিজয় রায়। আপনাকে যা বলি শুনুন মনোযোগ দিয়ে। মাঝের কালো রঙের কুকুরটা বলে, এই বাড়ি আপনি দখল করেছেন আজ থেকে তেরো বছর আগে―
হাসে দিগ্বিজয় রায়, তোদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। বাসায় আমার দেশি-বিদেশি মেহমান। তোরা আমার সর্ম্পকে জানিস না।
একেবারে পেছনের সাদা-কালো রঙের কুকুরটা বিকট জিহ্বা বের করে হাসে, আমরা তোর সর্ম্পকে সব জানি!
মুহূর্তে মি. দিগ্বিজয় রায়ের মাথায় রক্ত উঠে যায়। শালার কুত্তারা...কিন্তু বাসায়, গোপন কুঠরির মধ্যে বিদেশি মেহমান আবার সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে গভীর যোগাযোগের মানুষ বিশিষ্ট মেহমান মি. আম্বিয়া চরণ বাসায়। এইসব মেহমানদের সামনে কোনো...
তোরা এখন যা, দাঁতে দাঁত ঘষে, না গেলে পিস্তলের গুলিতে সবকটারে শোয়াইয়া ফেলব। আমার একটা গুলিও মিস হবে না- বলতে বলতে মি. দিগ্বিজয় রায় কোমরে হাত রাখে, চোখের পলকে চারটে কুকুর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিগ্বিজয় রায়ের ওপর। দিগ্বিজয় রায় চারটে কুকুর বুকের ওপর নিয়ে বিশাল রুমের বড় সোফার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের ওপর কয়েকটি সস্ফটিকের গ্লাস, গ্লাসের মদ, কয়েকটা প্লেটে ভাজা মাংসের স্তূপ, বাদামের প্লেট, ডিমের অমলেট, ছোলা ভাজার বাটি, কয়েক বোতল ঠান্ডা পানি উল্টে পড়ে ভেঙে-চুরে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় রুমের মধ্যে থাকা মি. আম্বিয়া চরণ, টাটিয়া ট্যাম্বো, মি. মতিয়াক মারবেল, পুলিশ কমিশনার খাইখাই খান কুকুরদের কুকুমারি দেখে ঘুরে দৌড়ে লুটোপুটি খেতে খেতে সোফার পেছনে আশ্রয় নেয়। রুমের মধ্যে লুটোপুটি খাওয়ার সময়ে ভেঙে যাওয়া কাঁচের টুকরায় কনুই হাত-পা কেটে লাল রক্ত ঝরছে। বিশেষ করে মি. আম্বিয়া চরণের পা কেটে মাংসের ভেতরে কাঁচের টুকরো ঢুকে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যথায় মি. আম্বিয়া চরণ মুখ বিকৃত করে কাঁদছে। অন্যরা কাঁপছে। টাটিয়া ট্যাম্বো আর রুথিয়া ক্যামবেলের ব্রা ছাড়া স্তন দুই জোড়া দুলছে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের গতিতে।
আপনারা উঠে আসেন, ভয় নেই।
মি. দিগ্বিজয় রায় লম্বা সোফার নরম কুশনের ওপর শুয়ে আছে। কুকুর চারটে মি. দিগ্বিজয় রায়ের বুকের ওপর লেজ গুটিয়ে বসেছে দারুণ আয়েশে। চারটি কুকুরের বড়টা লেজ নাড়তে নাড়তে বলে, সোফা ছেড়ে সামনে আসুন। আমরা জানি আপনারা এই বাসার মেহমান। মেহমানদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিবাদ নেই। আসুন, দয়া করে আসুন...
সোফার পেছনে আশ্রয় নেয়া―মি. আম্বিয়া চরণ ব্যথায় কুকড়ে আছে। বাকিরা কম-বেশি জখম হলেও মারাত্মক না। পুলিশ সুপার মি. খাইখাই খানের নেতৃত্বে সবাই সোফার পেছনে দাঁড়ায়। প্রত্যেকের চোখে মুখে ভয়ার্ত ভয়ের চিহ্ন। চক্ষু গোলকের বাইরে চলে আসতে চাইছে। জীবনে অনেক হরর সিনেমা দেখেছে, দেখেছে মারাত্মক ফাইটিং ছবিও কিন্তু আজকে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্য কখনো দেখেনি। উগান্ডার কালো মেয়ে দুটি আরো কালো চোখে তাকিয়ে কুকুরদের দেখছে।
সাদাকালো কুকুরটি বলে, বসুন। সোফায় বসুন আর আগের মতো পানাহার করুন। পানাহারতো মানুষের জীবনের একটা স্বাভাবিক প্রসঙ্গ। সুযোগ পেলে আমরাও পানাহার করি―
কিন্তু কেউ সোফার পেছন থেকে নড়ছে না।
সাদা কুকুরটা ডানপা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে হাসে, আপনারা ভয়ানক ভয় পেয়েছেন। আমাদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। আমরা কুকুর, আমরা মানুষ কামড়ে দিই, আমরা রাস্তায় দাঁত নিয়ে বের হই কিন্তু আমাদের বিরক্ত বা না মারলে আমরা কখনওই আক্রমণ করি না। কামড়েও দিই না। সুতরাং আপনারা নির্ভয়ে বসুন...। আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না।
সাদা কুকুরের নরম গলার বক্তব্য শুনে একমাত্র দিগ্বিজয় রায় ছাড়া ভয়ে থরো কম্পমান অবস্থায় সোফার পিছন থেকে এসে সোফার সামনে বসে। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা খাবারের দিকে কারো দৃষ্টি নেই। গলা শুকিয়ে গেছে আম্বিয়া চরণের। মুখে যদিও একটা অবুঝ মুখোশ ঝুলিয়ে রেখেছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়ছে। আজ জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখের দিনে হালার কুত্তারা..
সাদা-কালো কুকুরটা হাই তোলে, আপনারা এখনো আমাদের ভয় পাচ্ছেন। অবশ্য কারণও আছে, পথে-ঘাটে পড়ে থাকা কুকুরদের এ ধরনের নৃশংস আক্রমণ কখনো দেখেননি। আপনাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, কেনো আমরা আপমুরা এলাকার কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। এই দিগ্বিজয় রায় আমাদের দিকে পিস্তুলের গুলি ছুড়েছিল।
গুলি ছুড়বে না কেন? বলে মি. আম্বিয়া চরণ। মি. দিগ্বিজয় রায় একজন সম্মানিত নাগরিক। এই ওয়ার্ডের জনগণের ভোটে নির্বাচিত কমিশনার। তাকে, তার বাড়িতে এসেছেন আক্রমণ করতে?
না, ভুল বলছেন মি. আম্বিয়া চরণ। আমরা এসেছিলাম একটা নোটিশ দিতে।
নোটিশ? কি নোটিশ?
এই বাড়িটা ছেড়ে দেয়ার নোটিশ।
ছটফট করতে করতে মাথা তোলে মি. দিগ্বিজয় রায়, বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিতে কেন এসেছো?
সাদা কুকুরটা গলা বাড়ায়, এই বাড়িটা তোর না।
মানে? এই বাড়ি আমার না তোর বাপের? আমি বিশ বছর আগে কিনেছি সত্তুর লাখ টাকায়―চার চারটা দশাসই কুকুরের চাপ নিয়ে খুব কাহিল মি. দিগ্বিজয় রায়। কিন্তু রাজনীতিতে পোড় খাওয়া মি. দিগ্বিজয় রায় দমে যাওয়ার পাত্র নয়। শরীরের ওপর কয়েকশ কেজির ওজন নিয়েও ঘাড় বাঁকা করে প্রশ্ন তোলে, তোরে কইছে এই বাড়ি আমার না! দলিল রেকর্ড সব আমার নামে―
সাদা-কালো কুকুরটা দাঁড়িয়েছিল মি. দিগ্বিজয় রায়ের মাথার কাছে। মি. দিগ্বিজয় রায়ের মুখের ওপর ডান পা দিয়ে চট করে একটা আচড় কাটে, হারামজাদা মি. দিগ্বিজয় রায়। তোর দলিলও সত্য, তোর রেকর্ড পর্চাও সত্য। কিন্তু পুরোটাই মিত্যা। সেটা প্রমাণ করার জন্য তোকে নোটিশ দিয়ে যাচ্ছি, আগামী শনিবার দুপুরে আমরা আসব। তোর দলিল রেকর্ড পর্চা আমরা দেখব। আজ বিদেশি মেহমান আছে, আছে বিশিষ্ট পুলিশ অফিসার―ডিআইজি মি. খাইখাই খান। মি. খাইখাই খানের বাড়িতেও আমরা যাব। এখন আসি!
মি. দিগ্বিজয় রায়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে লেজ নাড়িয়ে কয়েকটা বুক ডন করে একে একে নেমে যায়। দরজার দিকে যেতে যেতে কুকুরগুলো ফিরে দাঁড়ায় এক এক লাইনে দাঁড়িয়ে জিহ্বা বের করে তাকায়। সাদা-কালো কুকুরটা ঘাড় কাৎ করে তাকায় উঠে বসা ক্লান্ত অবসন্ন মি. দিগ্বিজয় রায়ের দিকে, মি. দিগ্বিজয় রায় মনে রাখবেন আগামী শনিবার দুপুরে আমরা আসব। কোনো ঝামেলার চেষ্টা করলে পরিণতি ভয়ানক হবে। ওকে?
চারটে কুকুর এক সঙ্গে নিমিষে চলে যায়।
তিন.
আমপুরার গলিটার ভেতরের দিকে, তিন মাথার ডান পাশে মি. আগা খানের প্রাসাদের মতো ছয়তলা বাড়ি। মি. আগা খানের চার স্ত্রী। চারজনই বর্তমান। তিনি চমৎকার একটা নিয়ম তৈরি করেছেন। মিসেস শাকিলা পারভীন প্রথম স্ত্রী। তিনি থাকেন দ্বিতীয় তলায়। মিসেস করুণা বিধি দ্বিতীয় স্ত্রী, তিনি থাকেন তৃতীয় তলায়। মিসেস জয়নাব লতা তৃতীয় স্ত্রী। থাকেন সিরিয়াল অনুসারে চতুর্থ তলায়। আর চতুর্থ স্ত্রী মিসেস দিলরুবা ছন্দা। দিলরুবা ছন্দা সিনেমার নায়িকা। সিনেমা প্রযোজনা করতে গিয়ে ছন্দার সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে সম্পর্ক। বাজারে গুঞ্জন ছিল, বিয়ের আগেই মিসেস দিলরুবা ছন্দা প্রেগনেন্ট হয়েছিল। এবং বাচ্চাসহই বিয়ে করেছে মি. আগা খান। সর্বশেষ খবর অনুসারে মিসেস দিলরুবা ছন্দার গর্ভে একটা ছেলে বাচ্চার জন্ম হয়েছে।
আমাদের ঘটনা আগা খানের চার-চারটি বিয়ের প্রসঙ্গ নয়। প্রসঙ্গ আমপুরার এই বাড়ি। বাড়ির নাম খান ভিলা। আমপুরা এলাকাটা ঠাডা শহরের নিন্মবিত্তদের এলাকা। আগা খানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থের যে বিরাট প্রতিপত্তি, সেই অনুপাতে আমপুরা এলাকায় বাড়ি করা বিরাট রহস্য। আগা খানদের বাড়ি হবে হানমন্ডি, চুলশান, চনানী এলাকায়। কোন রহস্যে মি. আগা খান আমপুরার এই গলিতে বাড়ি করেছে?
দুপুরের খাবার খেয়ে আগা খান চতুর্থ স্ত্রী দিলরুবা ছন্দার সঙ্গে পঞ্চম তলায় বিশেষ ছিনেমা দেখছে। ছন্দাকে পাশে নিয়ে বিশেষ ছিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করে আগা খান। হঠাৎ পঞ্চম তলার জানালা দরজা ভেঙে বাড়ির মধ্যে শত শত কুকুর প্রবেশ করে। এবং নিমিষের মধ্যে আগা খানের বেডরুমে প্রবেশ করে দেখতে পায়, দেয়াল বিশাল স্কিনে চলছে বিশেষ ধরনের ছবি আর সেই কায়দায় রমন করছে আগা খান নিজের স্ত্রী দিলরুবা ছন্দাকে।
রুমের হঠাৎ অনকেগুলো কুকুর দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে দেখে, দিলরুবা ছন্দা স্বামী থেকে বিযুক্ত হয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢোকে। দিলরুবা ছন্দার পিছনে পিছনে ঢোকে আগা খানও। কুকুরগুলো বাকি তিন তলার স্ত্রীদের ডেকে এনেছে। সবাই রুমের মধ্যে বসা। ভীত-সন্ত্রস্ত মনে হচ্ছে স্ত্রীদের―
কিন্তু অভয় দিচ্ছে গলায় রূপার চেইন পরা ছাই রঙের কুকুর―আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন? আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না।
তাহলে ডেকে এনে আটকে রাখছ কেন? প্রশ্ন করে আগা খানের তৃতীয় স্ত্রী মিসেস জয়নাব লতা। মিসেস জয়নাব লতার আগের স্বামীর বাড়িতে অ্যালশেসিয়ান কুকুর ছিল তিনটা। স্বামী মি. শওকত মজুমদারের অসম্ভব কুকুর প্রীতিই ডিভোর্সের অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি। কুকুরগুলো বাড়ির মধ্যে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকত যখন মি. শওকত মজুমদার বাড়ি থাকত না। যখন বাড়ি থাকত কুকুরদুটি শওকত মজুমদারের পিছনে পিছনে ঘুরত। আর পা চাটত।
শিউরে উঠতো জয়নাব লতা। খাবার টেবিলের পাশে দুটি কুকুর গলা উঁচু করে বসে থাকে, খাবার শেষ হওয়ার সঙ্গে কুকুর দুটি থালা দুটি চেটে চেটে খেত। ঘৃণায় শরীর শিউরে ওঠে জয়নাব লতার। লোকটা কি কুকুরের....। হ্যাঁ অনেকের কুকুর প্রীতি আছে, তাই বলে!
অনেকবার সাবধান করে দিয়েছে শওকত মজুমদারকে, কুকুর নিয়ে তুমি এতো বাড়াবাড়ি করছো কেনো?
কুকুর কি তোমার শরীর চাটছে? চাটছে আমার শরীর, মৃদু গলায় বলে শওকত মজুমদার।
কিন্তু রাতে তো তোমাকে চাটতে বাধ্য করো আমাকে―
সেটা তো তোমার আমার-দুজনের শরীরের সর্ম্পক!
কিন্তু আমার ঘৃণা লাগে।
কেনো?
কুকুরকে এতো প্রশ্রয় দাও কেনো?
কারণ, কুকুর মানুষের চেয়ে উত্তম।
মানে কী?
শোন লতা, বারান্দার চেয়ারে বসে শওকত মজুমদার। পাশের চেয়ারে বসে জয়নাব লতা। বিকেলের আলো চারদিকে ছায়া ফেলছে। শওকত মজুমদার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। গার্মেন্টেসের মধ্য পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জয়নাব লতার নিকটাত্মীয় চাকরি করে। মেয়েটি দেখতে দারুণ সুন্দরী। গ্রামের দরিদ্র বাবার মেয়ে শিউলি আখতার। ওর চারটে ভাইবোন। সেই ভাইবোনদের মুখে খাবার তুলে দিতে নবম শ্রেণি পাশ শিউলি আখতারের শরীরও মজবুত। জয়নাব লতার সুপারিশেই চাকরি হয়েছে শিউলি আখতারের।
শিউলি আখতার চাকরিতে যোগদানের তিন মাস পর, ফোন করে জয়নাব লতাকে, আপা কেমন আছেন?
ভালো। তুমি কেমন?
আমিও ভালো। আপা, গ্রামের বাড়িতে যান না, অনেক বছর।
হ্যাঁ সময় হয় তোমার দুলাভাইয়ের। আমি একলা যেতে চাই না।
তা ঠিক...
তুমি একটা কিছু বলতে চাইছো আমাকে শিউলি?
না মানে...
তুমি বলো। আমি কিছু মনে করবো না।
দুলাভাইকে তো আপনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন!
হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আবার আমরা ছিলাম একই ডিপার্টমেন্টের। মানে, এনথ্রোপলজির.. কেনো বলেতো শিউলি!
আপা!
হ্যাঁ, বলো।
না থাক..
শিউলি! কৌশলের আশ্রয় নেয় জয়নাব লতা। তুমি আমার বোন না? আমার কোনো সমস্যা দেখলে আমাকে জানাবে না?
আপা, দুলাভাই আপনাকে আদর করে তো?
কয়েক মুহূর্ত ঝুলে থাকে জয়নাব লতা। কি বলবে, কি উত্তর দিলে সম্মান বজায় থাকবে? নিশ্চয়ই এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে...
হাসে জয়নাব লতা, আরে মেয়ে বলে কি! আদর করবে না কেনো? তোর দুলাভাই খুবই আদর করে আমাকে। কিন্তু তুমি যা বলতে চেয়েছো বলো।
আপা, দুলাভাই প্রতিদিন অফিসে এসে নিজের রুমে ঢোকার আগে সাততলা গার্মেন্টিসের এক-একটা তলা পরিদর্শন করেন।
সেটা স্বাভাবিক না শিউলি? শওকতের অফিস, গার্মেন্টস, ঘুরে ঘুরে দেখবে না―কে কি কাজ করছে? নাকি কেউ ফাঁকি দিচ্ছে?
নিশ্চয়ই আপা কিন্তু দুলাভাই ফ্লোরের পর ফ্লোরে গিয়ে করে অন্যকাজ।
মানে কি? খুলে বলো আমাকে।
দুলাভাই গার্মেন্টসের ফ্লোর ঘুরে ঘুরে নির্বাচন করেন নতুন কোনো মেয়েকে। রুমে গিয়ে কাজ শেষ করে পছন্দের মেয়েটিকে রুমে ডাকেন। রুমে ঢুকলেই দরজা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়।
থেমে যায় শিউলি আখতার। ফোনের এপারে বসে থাকে জয়নাব লতা। আর কতটা বলতে হবে? জয়নাব লতা সবই জানে, বোঝে। কিন্তু কি করবে?
শিউলি? আমি বুঝতে পারছি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। ফোন কেটে দেয় জয়নাব লতা।
প্রতি রাতে বাসায় ফেরে মাতাল হয়ে। মাতাল হওয়া খারাপ কিছু না। বাসায় নিজেও মাঝে মাঝে পান করে। পান করলে ভালো লাগে। মনে হয়, শরীর হালকা হয়ে বাতাসে উড়ছে। মানুষতো উড়তেই চায়। শরীরে অন্য নারীর গন্ধ পাওয়ার আগেই শওকত মজমুদার বাথরুমে ঢোকে। অনেক্ষণ বাথরুম থেকে সাফ সুতরো হয়ে ফিরে আসে বেডরুমে। রুমে এসেই জড়িয়ে ধরে জয়নাব লতাকে, মাই ডার্লিং!
জয়নাব লতাও জড়িয়ে ধরে প্রিয় স্বামীকে। কিন্তু গোটা শরীর জুড়ে নেমে আসে ঘৃণা। এই ঘৃণার মুমূর্ষু সময়ে দেখা হয় আগা খানের সঙ্গে, হোটেল এরিনায় এক পার্টিতে। আগা খানের গার্মেন্টস ব্যবসা আছে। লোকটা কথা বলে কম, হাসে মিটি মিটি। কিন্তু প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। সিগারেটের শলা হাতে রাখে কিন্তু ধরায় না, আগুন ধরিয়ে টানে না , ছাড়ে না ধোয়া। আগা খানের এই অবাক ঘটনা দারুণ মনে হয়েছে জয়নাব লতার কাছে। রাতে বাসায় এসে ফোনে প্রথম কথা বলে জয়নাব লতা।
কথা বলার তিন মাসের মাথায় প্রিয় প্রেমিক, স্বামী শওকত মজুমদারকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায় আগা খানের সঙ্গে। আগা খান জানিয়েছিল আমার একজন স্ত্রী আছে। কিন্তু সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। দুটি ছেলে মেয়ে বিদেশে পড়াশুনা করে। সুতরাং আমার সংসারে তোমার রাজত্ব চালাতে কোনো সমস্যা হবে না। বিয়ের প্রথম এক মাস ছিল হোটেলে। দারুণ কাটছিল সময়। হোটেল থেকে আগা খান নিয়ে এসেছে গুলশানে এক বন্ধুর বাড়ি। সেখানে মাস তিনেক থাকার পর নিয়ে আসে আমপুরার বাড়িতে, খান ভিলায়। খান ভিলায় আরও দুজন স্ত্রী থাকায়, জয়নাব লতা হলো আগা খানের তৃতীয় স্ত্রী।
তুমি কেনো এমন করলে?
রাতে বেডরুমে বসে প্রশ্ন করলে আগা খান খুব স্বাভাবিক ভাবে গ্লাসে পানীয় ঢালতে ঢালতে বলেছিল, দুটি কারণে তোমাকে আমি মিথ্যা বলে বিয়ে করেছি। প্রথম কারণ, তোমাকে দেখেই আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। তোমার ফিগার আমাকে ফিদা করেছে। দ্বিতীয় কারণ, প্রতিশোধ।
কিসের প্রতিশোধ!
তোমার আগের স্বামী, আমার বিশিষ্ট বন্ধু শওকত মজুমদার আমার পছন্দের একটি মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। ভাগিয়ে নিয়েই খান্ত হয়নি-মেয়েটিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। তোমাকে বিয়ে করে সেই প্রতিশোধ নিলাম। কিন্তু তোমাকে আমি ভালোবাসি।
তৃতীয় বৌ বানালে কেনো? বলেছিলে, একমাত্র বৌ পক্ষাঘাত―
হাসে আগা খান। আগা খানের হাসিতে কোনো শব্দ হয় না। নি:শব্দ হাসি, মুখের গহব্বর দেখা যায়। ভয় লাগে। জবাব দেয়, বিয়ের প্রেমের আর সেক্সের ক্ষেত্রে মিথ্যা না বললে খেলা জমে না। আর খেলা না জমলে কোনো কিছুই ভালো লাগে না আমার।
জয়নাব লতা আটকে যায় আগা খানের সংসারে, তৃতীয় পৃষ্ঠায়।
কিন্তু শওকত মজুমদারের কুকুর প্রীতির ঘটনাটা মাথা থেকে যায় না। কুকুর প্রকৃতপক্ষে, মানুষের চেয়েও উন্নতমানের কৃতজ্ঞ প্রাণী। মানুষ হচ্ছে, কঠিন মোনাফেক। বিশেষ করে পুরুষ। আবার ঘটনা দেখো-পুরুষের মোনাফেকি ছাড়া দুনিয়া অচল।
আমার মাকে বাবা ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। আমার বাবা ছিল খুব নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। কলেজের অধ্যাপক নেছারউদ্দিন পড়াতেন সাইকোলজি। পিরোজপুরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে আমার নানার বাড়ি লজিং থাকতেন। মা পড়তেন ইন্টারমিডিয়েট। বাবার সঙ্গে একটা সম্পর্ক হলে, আমার নানা নিজেই কথা বলেন বাবার সঙ্গে।
তিনি ছিলেন হাজী আহমদ হোসেন। প্রশ্ন করলেন বাড়ির কাছারী বাড়িতে, তুমি কি আমার মেয়ে শিপ্রাকে পছন্দ কর?
বাবাও সরাসরি উত্তর দিয়েছিলেন, হ্যাঁ করি।
তাহলে বিয়েব ব্যবস্থা করি?
খুব সরলভাবে বাবা মাথা নাড়েন, আমার কোনো আপত্তি নেই।
পিরোজপুরের গণ্যমান্য লোকজনের উপস্থিতিতে দুজনার বিয়ে হয়ে যায়। বাবা কলেজে প্রভাষক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যপাক হলেন। আয় রোজগার বাড়ছে। বাবা নেছার উদ্দিন পিরোজপুরে আট কাঠা জমি রাখেন। আমার জন্ম হয়েছে। বাবা মা সুখী দম্পতি। এই সময়ে কলেজের একটা প্রশিক্ষণের জন্য ঠাডা শহরে আসেন। ছয় মাস থাকলেন। ছয় মাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার পিরোজপুর আসা যাওয়াও করলেন। কারণ, মাকে ছেড়ে বাবা থাকতে পারতেন না। আর আমাকে খুব মিস করতেন। ছয় মাসের প্রশিক্ষণের পর বাবা নেছার উদ্দিন ফিরে এলে অনুভব করতে পারলেন, সংসারের কোথাও একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। কিন্ত কি ঝামেলা, বুঝতে পারছেন না। বাবা মূলত সংসারের সকল ভার মায়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে আমার একটা বোনেরও জন্ম হয়। বাবা ওর নাম রেখেছিলেন বিপাশা।
বাবা ধীরে ধীরে আবিষ্কার করলেন, পাশের বাড়ির এক তরুণ অধ্যাপক গোবিন্দ কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধায়ের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক। বাবার ঘুম ভীষণ গভীর। ঘুমিয়ে গেলে দুনিয়ার কোনো খেয়াল থাকে না। মা সেই সুযোগে গোবিন্দ কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধায়ের সঙ্গে অভিসারে যেতেন, বাড়ির পিছনের পুকুর ঘাটে। পুকুরঘাটে একটা ছোট গোয়াল ঘর ছিল। বাবা সব দেখলেন, জানলেন, বুঝলেন। কিন্তু মাকে কিছুই বুঝতে দিলেন না। তিনি রাস্তা থেকে একটা কুকুর কুড়িয়ে আনলেন বাড়িতে। বাড়িতে কুকুর আসায় মা খুব চেচামেচি করলেন। আমি ছোট বোন বিপাশা কুকুরটাকে পোষ মানিয়ে ফেললাম।
বাবা সন্ধ্যার পর কুকুরটাকে নিয়ে উঠোনে বসতেন। কথা বলতেন কুকুরটার সঙ্গে।
কুকুরটার সঙ্গে কথা কথা বলতো তোমার বাবা!
হ্যাঁ, শওকত মজুমদার ফিরে আসে নিজের তন্ময়তার জগত থেকে। তাকায় জয়নাব লতার দিকে, বাধা দিও না―শুনে যাও। আমি পড়তে বসতাম ঘরে আর বাবা বসতেন কুকুরের সঙ্গে। মা গজ গজ করতেন। আমি বুঝতে পারছিলাম, কোথাও মস্তবড় একটা সর্বনাশের দোলনা ঝুলছে। কিন্তু কি সর্বনাশ বুঝতে পারতাম না। তো এক রাতে আমার ঘুম ভাঙ্গলো একজন মানুষের মরণ চিৎকারে।
ঘুম ভেঙে গেলে দৌড়ে চিৎকার অনুসরন করে বাড়ির পেছনে যাই। দেখি, মা একবারে নাংটো দাঁড়িয়ে আছে রাতের পূর্ণিমায় আধো জোছনার অন্ধকারে, পুকুরের ঘাটে। আর গোবিন্দ কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধায়ের ন্যাংটো শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে বাবার কুকুরটা গলা চেপে ধরেছে। লোকটা গো গো করছে আর দুই পা নাচাচ্ছে। বাবা নেছার উদ্দিন সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটা দেখছে পরিপূর্ণ তৃপ্তির সঙ্গে। বাবার সেই চোখ আমার মধ্যে আমিও দেখতে পাই। মানুষ হারলেও কত সুখী হয়, বাবা নেছার উদ্দিনের দৃষ্টিতে সেই রাতে আমি দেখেছিলাম সেই কৌতুকমাখা সুখ!
তুমি? তুমি কি করলে?
আমি! হাসে শওকত মজুমদার―সেই একরাতেই আমি বুঝে গেছি, মানুষের চেয়ে কুকুর অনেক উত্তম প্রাণী। এবং সেই থেকে কুকুর আমি ভালোবাসি। প্রাণীদের ইতিহাসে তুমি জয়নাব লতা, দেখাতে পারবে না কুকুর কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিশ্বাসঘাতকতা করার ইতিহাস মানুষের...। সেই কারণেই আমি কুকুর ভালোবাসি, কুকুর পালন করি।
ঠিক আছে, কিন্তু একটা পর্যায় তো থাকবে! তুমি যখন আমাকে আদর কর, দরজার ফাক দিয়ে ওরা দেখে..
দেখুক না, ওদেরও রমন করতে ইচ্ছে হয়।
মানে? ওরা কাকে রমন করবে?
মুখে ক্লান্তির হাসি নিয়ে তাকায় জয়নাব লতার দিকে শওকত মজুমদার, আমি মাঝে মধ্যে ভাবি মানুষের দুনিয়ায় মানুষ এতো অমানুষ হয়ে গেছে, এখন যদি মানুষ বিদায় করে কুকুরদের দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করা যায়, কেমন হতো?
জয়নাব লতা বিস্ফোরিত চোখে দেখে প্রিয় স্বামী, বিশিষ্ট গার্মেন্টস ব্যবসায়ী শওকত মজুমদারকে। কতো বছর ধরে চেনে, জানে মানুষটাকে। কিন্তু কতো অচেনা। বুকের মধ্যে মা ও বাবার সর্ম্পকের সূত্র ধরে একটা পাশবিক ক্রোধের আগুন নিয়ে বসে আছে! যে কেনো সময়ে ও আমাকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করতে পারে! তাকিয়ে আছে সন্ধ্যার অন্ধকার আকাশের দিকে শওকত মজুমদার, হাতে জ্বলছে সিগারেট, কিন্তু চিন্তার মধ্যে জ¦লছে অন্য মানচিত্র! আচ্ছা ঘোড়া আর গাধার মিলনে হয় খচ্চর। কিন্তু মানুষ আর কুকুরের মিলনে...। মানুষ আর কুকুরের মিলন হওয়া সম্ভব?
শওকত মজুমদার তাকায় বিবাহিত স্ত্রী জয়নাব লতার দিকে, খুব দ্রুতই মনে মনে একটা প্ল্যান করে। কিন্তু কেমন করে টের পায় জয়নাব লতা, সর্বনাশের নিগূঢ় সার্কিট! চলে আসে আগা খানের সংসারে, সুযোগ পেয়ে, সর্বনাশের আগে।
চার.
বাসার মধ্যে ঢুকে বিভ্রান্ত মিলিয়া রহমান, মি. খোন্দকার মোশতাক, জয়নাল হোসেন।
আমপুরা ওয়ার্ডের নির্বাচিত কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায় ড্রয়িংরুমে সোফায় চুপচাপ বসে আছে। বিদেশী মেহমানদের দেখছে না। গম্ভীর চোখে তাকায় মি. দিগ্বিজয় রায়। চোখের মধ্যে আগুন জ¦লছে। মি. খোন্দকার মোশতাক সকল অপকর্মের সৈনিক মি. দিগ্বিজয় রায়ের। বাকি দুজনকে পরিস্থিতি অনুসারে ব্যবহার করে। জয়নাল হোসেন কাজগপত্র বোঝে ভালো। ঠাডা শহরের কোন কোন এলাকার কোন জমিতে ঝামেলা আছে, কার বাড়ি নিয়ে মামলা আছে, নিজের আমপুরা ওয়ার্ডের মধ্যে কোন কোন বাড়ি বা জমির কাগজপত্র ঠিক নাই, সব খবর জানা জয়নাল হোসেনের। আর মিলিয়া রহমান সুন্দরীকে রাখে নিজের মতো করে ব্যবহার করার জন্য। নিজেতো বিছানায় নেয়ই, যখন তখন অন্যর কাছেও পাঠায়।
মিলিয়া রহমানের হাজবেন্ড মি ফারুক রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক অফিসার। বেচারার চাকরি চলে যায় অন্য অফিসারের স্ত্রীর সঙ্গে ধরা পরে। বেচারা সেনাবাহিনী কোনো সুযোগ সুবিধাই পায় নাই। ফলে স্ত্রী মিলিয়া রহমানের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। মিলিয়া রহমান ভীষণ উচ্চাভিলাষী। ওর পরিকল্পনা, আগামী নির্বাচনে আপমুরা ওয়ার্ড থেকে ওয়ার্ড কমিশনারের পদে নির্বাচন করা। কিন্তু ... মি. দিগ্বিজয় রায় জানে, মিলিয়া রহমানকে কি করতে হবে। নির্বাচনের এখনও আড়াই বছর বাকি। হিসাব পরিস্কার, নির্বাচনের এক বছর আগে ফেলে দেবে মিলিয়া রহমানকে। দাবার গুটি ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে আনছে মি. দিগ্বিজয় রায়।
ফারুক রহমানকেও নিজের হাতে তুলে নিয়েছে মি. দিগ্বিজয় রায়। আমপুরার বাইরে বাকরাইলে একটা মার্কেট আছে মি. দিগ্বিজয় রায়ের। সাত তলা বাড়ি। নিচের তিন তলায় মার্কেট। বাকি চার তলায় বাসা বাড়ি। প্রতিমাসে তিন কোটি টাকা ভাড়া আসে। সেই মার্কেটের ম্যানেজার বানিয়ে দিয়েছে―ফারুক রহমানকে। ফারুক রহমানও ঘাগু মানুষ। দিগ্বিজয় রায়ের লোক জানিয়েছে, ফারুক বাকরাইলের জায়গা দখলের পরিকল্পনা করছে। শুনে হাসছে মি. দিগ্বিজয় রায়।
তাই নাকি!
হ বস।
তুই কি করে বুঝলি? বাকরইলের মি. দিগ্বিজয় প্লাজার তিন তলার অফিসের পিওন রজব আলী দেওয়ান সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
গত কয়েক মাস ধরে ফারুকের কাছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লোকরা আসে। চা খায়, সিগারেট খায়। পানীয় খায়। মাঝে মাঝে একজন মহিলাও আসে। মোটা, কালো সেই মহিলা। কিন্তু বিশাল একটা গাড়িতে আসে।
তাই? মাথা নাড়ায়
ওরা বলে কি!
সেটাতো জানি না স্যার।
কেনো জানিস না?
ওইসব লোকজনের সঙ্গে যখন সিরিয়াস কথা হয়, তখন আমাকে চা আনার জন্য বাইরে পাঠায়। একদিন আমি দ্রুত চা এনে পাশের ছোটরুমে চা ট্রেতে সাজাচ্ছি, শুনতে পাই―ওরা হিসাব করছে, কতো তলা। কতো বর্গফুট, কতো দাম.. সাত ভাগ হলে কার ভাগে কতো টাকা যাবে এইসব...
মাথা দোলায় ঠাডা শহরের আমপুরা ওয়ার্ড কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায় পিওন রজব আলী দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে, তুই আগেই খবর দিয়ে ভালো করেছিস রজব। চিন্তা করিস না, অপেক্ষা কর, ভবিষ্যতে তোকেই আমি বাকরাইলের দিগ্বিজয় প্লাজার ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেবো। তুই চোখ কান খোলা রাখ।
জি স্যার, বাইরে এসে রজব আলী দেওয়ান শূন্যে ডিগবাজি খায়। আমি, আমি হবো বাকরাইলের দিগ্বিজয় প্লাজার ম্যানেজার!
ভাই, কি হয়েছে আপনার? ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে মি. খোন্দকার মোশতাক।
কিছু না, বস তোরা। নিজেকে সংযত করে নিয়েছে মি. দিগ্বিজয় রায়। নিজের জীবনের ঘটনা দূর্ঘটনা অপমান লজ্জা তো আর এইসব ছালবাকলদের বলা যায় না।
গত রাতের ঘটনা কোনওভাবেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না দিগ্বিজয় রায়। কুকুর! শেষ পর্যন্ত কুকুরের কাছে এমন লাঞ্চনা সইতে হলো? কোত্থেকে এসেছে এই কুকুরেরা? কোথায় ওদের শক্তির উৎস? আচ্ছা ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে অন্য কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর কোনো ষড়যন্ত্র নাতো! রাস্তাঘাটের কুকুর, কুত্তা...। গতরাতে কুকুরের বাচ্চা কুত্তাগুলো চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ডি আইজি ব্যাগে আনা লুঙ্গি পড়ে, জামা খুলে পাঞ্জাবি কুর্তা পরে, পায়ের স্যু হাতে নিয়ে দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। দরজায় পৌঁছে ফিরে তাকিয়ে মি খাইখাই খান বলে, ভাই আজকের পর থেকে আর আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না। হালার কুত্তারা আমার খবর জানে...। খোদা হাফেজ... এক লাফে দরজা পার হয়ে যায় ব্যাটা।
কুকুরেরা চলে যাবার পর সোফায় উঠে কেবল বসেছে মি. দিগ্বিজয় রায়, সঙ্গে মি খাইখাই খানের পগাড়পার হওয়ার দৃশ্যটা ভালো লাগে নাই। শালার মাকুন্দা, আমি তোমাকে কম টাকা দিয়েছি? বান্ডিলে বান্ডিলে টাকা দিয়েছি। সুত্তরায় আড়াই হাজার বর্গফুটের বিশাল ফ্ল্যাটের দেড় কোটি টাকাতো আমিই দিয়েছি। আর হারামজাদা, কুকুরের পায়ের নীচে অসহায়ভাবে পরে ছিলাম, কিচ্ছু বলিসনি। কেবল দুচোখ মেলে দেখেছিস! কুকুরের পায়ের নখরাঘাতে শরীরের কয়েক জায়গা কেটে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তাক্ত আমাকে ফেলে চলে গেলি. শালার বাঙালি মোনাফেক!
মি. দিগ্বিজয় রায়ের ভাবনার মধ্যে প্রবেশ করে পুরানো ঢাকার মি আম্বিয়া চরণ, দিগ্বিজয়?
বস!
ঘটনায় তো ট্যাসকি খাইয়া গেলাম। হালার কুত্তায় এইভাবে মানুষের ওপর... মাথা নাড়ায় আম্বিয়া চরণ। পাশে বসা টাটিয়া ট্যাম্বোর বিশাল সাইজের স্তুনের দিকে নজর নেই। সিগারেট ধরিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, অবিশ্বাস্য ঘটনা। কুকুরের কাছে মানুষের পরাজয়... দাঁড়ায় মি আম্বিয়া চরণ।
ব্যথা-মাথা শরীরে দাঁড়ায় মি. দিগ্বিজয় রায়, আপনি কই যাচ্ছেন? দাঁড়িয়েই বুঝতে পারেন, সারা শরীরে কি ভয়ানক ব্যথা। মনে হচ্ছে পাজরের হাড়গুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
আমি চলে যাবো বাসায়। আমি ঠিক কি করবো, বুঝতে পারছি না মি. দিগ্বিজয় রায়―একমনে বলে যায় আম্বিয়া চরণ।
আপনি আমার পরামর্শ দাতা। আপনি আমাকে একলা ফেলে চলে গেলে..
শোনেন মি. দিগ্বিজয় রায়। আমার মনে হচ্ছে শালার কুত্তাগুলো যেকেনো সময়ে আবারও চলে আসতে পারে। ওরা তো কুত্তা, থাকে রাস্তায়। খায় নর্দমার ময়লা, গু। কখনও বিদ্যালয়ে বা মহাবিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেনি। কি করে বুঝবে আমার মতো মানুষের মর্যাদা...
ঠিক আছে বুঝলাম শুয়ারের বাচ্চা কুত্তারা আপনার মর্যাদা বুঝবে না, হাত কচলে বলে মি. দিগ্বিজয় রায়, কিন্তু যাবার আগে আমাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে যান।
আমি এখন কোনো পরামর্শ বা এ্যাডভাইস কিছুই দিতে পারবো না। মাথায় কিছুই আসছে না। আগে বাসায় যাই, পরে জানাব―
আমরা? আমাদের কি হবে? মি আম্বিয়া চরণের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উগান্ডার মতিয়ার মারবেল। আমি দেশ থেকে দুজন অতিথি আনলাম। কিন্তু আপনার বাড়িতে আমরা আর থাকতে চাই না।
মানে? বিরক্ত বোধ করে মি. দিগ্বিজয় রায়। তোমরাতো অতিথি.. কুকুরগুলোতো বলেছে তোমাদেরই সামনে, আমরা অতিথিদের সম্মান করি।
ওরা তো কুকুর মি. দিগ্বিজয় রায়, হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দেয় টাটিয়া ট্যাম্বো। কখন কি করে বসে ঠিক আছে? আমি থাকবো না আপনার বাড়িতে।
টাটিয়া ট্যাম্বোর সঙ্গে যোগ দেয় রুথিয়া ক্যামবেল, আমিও থাকবো না।
মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে মি. দিগ্বিজয় রায়। ইতিমধ্যে মি আম্বিয়া চরণের চোখের ভাষা পড়েছে। শুয়োরের বাচ্চাটা কালোমানিক নারীদের নিজের ডেরায় নিয়ে যেতে চাইছে এবং কুকুরের ঢংয়ে জিহবা চাটছে। রাগে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। ঘাগু রাজনীতিবিদ মি. দিগ্বিজয় রায়। শুন্য থেকে আজ এখানে, কোটি কোটি টাকার মালিক, ঠাডা শহরের চারটে বাড়ি একটা মার্কেটের মালিক, একটা ওয়ার্ডের মালিক! সবই হয়েছে ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার জন্য।
হাসি আনে মি. দিগ্বিজয় রায় রক্তমাখা ঠোঁটে, কোথায় যাবে তোমরা? তোমাদেরকে তো আমিই আনিয়েছি আফ্রিকার উগান্ডা থেকে। বিমান ভাড়াসহ থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। না হয় একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে কিন্তু তোমাদেরতো কোনো ক্ষতি হয়নি। তোমরা আমার এই বাড়িতে না থাকো, আমি অন্যবাড়িতে রাখবো।
রুমের মধ্যে হাওয়া থেমে যাচ্ছে। অন্য বাড়ির প্রসঙ্গ এনে মি. দিগ্বিজয় রায় নিজের আয়ত্তের মধ্যেই রাখার পথ বের করে নিচ্ছে, বুঝতে পারছে মি আম্বিয়া চরণ। অনেক দিনের চেনা জানা মানুষ,রক্তে রক্তে বেইমানি আর প্রতারণা আর অন্যকে খুন করার অভ্যাস মি. দিগ্বিজয় রায়ের। কুট কৌশলের শেষ নেই। বেশি ঝামেলা করলে কালোমানিক নারীদের ফেলেও দিতে পারে। ফেলে দিক দিগ্বিজয় রায়, কিন্তু আগে একটু চেখে না নিলে আজীবন কষ্ট পাবে মি আম্বিয়া চরণ।
কোথায় রাখবেন আমাদের? আম্বিয়া চরণের ভাবনার মধ্যে করাতের গতিতে ডুকে যায় রুথিয়া ক্যামবেল। মেয়েটি হালকা পাতলা হলেও ধারালো, সঙ্গে শাঁসালো।
এই ঠাডা শহরে কি আমার একটা বাড়ি? এখান থেকে এক কিলোমিটারের দূরত্বে আছে বাকরাইলে আমার সাত তলা মার্কেট, দিগ্বিজয় প্লাজা। শুয়োরের বাচ্চা কুত্তারা এই বাড়ি চিনলেও সেই বাড়ি চিনবে না। বিশাল মার্কেট, সাত তলায় আমার নিজের জন্য দুই হাজার বর্গফুটের বিশাল এ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। সেখানে গেলে কাকপক্ষীও টের পাবে না..
কিন্তু যদি কুকুরেরা টের পায়, ঢুকে যায় মতিয়ার মারবেল। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি বড় প্রখর। মানুষের মতো ওদেরও গোপন বাহিনী থাকতে পারে। তখন?
রাইট, আমি এটাই বলতে চেয়েছিলাম, দুই পক্ষের মাঝখানে দাঁড়ায় মি আম্বিয়া চরণ। টাটিয়া ট্যাম্বোর উম্মুক্ত স্তনে আলতো আদর করতে করতে বলে, বরং আমার সঙ্গে আমার বাড়ি চলে যাক ওরা। আরামে থাকবে। নিরাপদে থাকবে। অন্যদিকে আপনার বিপক্ষ দলের মি পাণ্ডারও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। ওরা যদি কেনোভাবে জেনে যায় আপনি ফরেনমাল বাসায় আমদানী করেছেন, টিভি চ্যানেল আর পত্রিকাঅলারা আপনার জীবন কাড়ানাড়া করে ছাড়বে। খুব সাবধানে থাকা দরকার। আপনি আপনার এদিকের ঝামেলা মিটিয়ে চলে আসুন। বোতল মাংস ভুনা সব প্রস্তত থাকবে... ঠিকাছে। আর আমি মাননীয় মন্ত্রী বারবার বুধাকেও আমন্ত্রন জানিয়ে রাখবো। আমার বাড়িতে মৌজ করতে করতে আপনার ব্যবসার ডিল করতে সুবিধা হবে মি. দিগ্বিজয় রায়!
রাইট, মি. দিগ্বিজয় রায়―মি আম্বিয়া চরনকে সমর্থন করে মতিয়াক মারবেল। ওদের পিতা মাতার কাছে আমার দায় রয়েছে। যে কেনোভাবেই হোক অক্ষত অবস্থায় টাটিয়া ট্যাম্বো আর রুথিয়া ক্যামবেলকে ওদের বাবা মায়ের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। আমরা বরং আম্বিয়া চরণের সঙ্গেই যাই। আমরাতো আছিই...
চোখের সামনে দিয়ে ওরা চলে যায় গতরাতে মি আম্বিয়া চরণের সঙ্গে। আর আম্বিায়া চরণের গলা ধরে হারামজাদী টাটিয়া ট্যাম্বো চুমু খেতে খেতে চলে যায়। সেই থেকে মেজাজ তেতে আছে। সারাটা রাত জেগে কাটিয়েছে মি. দিগ্বিজয় রায়। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুমাতে পারে না। চোখে ঘুম আসে না। নির্বাচনের দুই রাত আগে থেকে ঘুমাতে পারে মি. দিগ্বিজয় রায়। অস্বাভাবিক টেনশনে ভোগে । জানে, এই নির্বাচনের খাতায় কাগজে কলমে বিরোধী দল আছে, বাস্তবে নেই...। নির্বাচনে দিগ্বিজয় রায়ের মার্কা তিমি।
তিমি! তিমি জিনিসটা কি? কোনো গাছের ফল? জীবনে নামতো শুনি নাই... নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দলের কর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে প্রতীক পাওয়ার পর আলোচনা করছে দিগ্বিজয় রায়।
একটু দূরে চা খাচ্ছে মিলিয়া রহমান আর মি. খোন্দকার মোশতাক। মিলিয়া রহমান কাছে আসলে আবার প্রশ্ন করে, তিমি ফলটা কি রে মিলিয়া?
তিমি ফল না ভাই, মিচকি মিচকি হাসে মিলিয়া, মনে মনে বলে, আচোদার গুষ্ঠি। জীবনে একদিন ইস্কুলে যায় নাই। চুরি বাটপারি করে, মানুষের জায়গা জমি দখল করে টাকা পয়সার মালিক বনে গিয়ে এখন আসছে সরকারি দলের নমিনেশন কিনে ওয়ার্ড কমিশনার হতে। খানকির পোলা বলে -তিমি নাকি ফল!
ভাই, কাছে দাঁড়িয়ে শরীরের সঙ্গে হালকা শরীর রেখে বলে, তিমি হলো বড় সামুদ্রিক মাছ। ওজন কয়েক শ’ টন। থাকে সমুদ্রের নীচে..
সেই মাছ আমাকে মার্কা হিসেবে কেনো দিলো? ঘড়ঘড় করে কুকুরের গলায় মি. দিগ্বিজয় রায়। এতোবড় তিমি মাছ আমি কোথায় পাবো? কিভাবে পোস্টারে ছাপা হবে তিমি মাছ? নিশ্চয়ই বিরোধী দলের কোনো ষড়যন্ত্র। তাকায় জয়নাল হোসেনের দিকে, চলতো নির্বাচন কমিশনারের কলার ধরে জিজ্ঞেস করি, কেনো আমাকে তিমি মাছ দিয়েছে, যে মাছ থাকে সমুদ্রের তলদেশে আর ওজন কয়েকশো টন!
আমার মনে হয় না ভাই, আপনাকে সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে শত শত টনের তিমি ধরে এনে পোস্টারে ছবি ছাপাতে হবে―অভয় দেয়ার চেষ্টা করে জয়নাল হোসেন।
তাইলে? রেগে ওঠে দিগ্বিজয় রায়। আমি তিমি মাছের ছবি কোথায় পাবো? পোস্টারে কিসের ছবি দিবি?
শোনেন ভাই, মিলিয়া নিজের শরীরটাকে আর একটু চেপে ধরে দিগ্বিজয় রায়ের শরীরের সঙ্গে, তিমি মাছের অনেক ছবি আছে। আপনাকে তিমি মাছের জন্য সমুদ্রের তলদেশে যেতে হবে না।
আশ্বস্থ বোধ করে দিগ্বিজয় রায়, মিলিয়া তুমি বলছো―আমাকে সমুদ্রের তলদেশে ডুব দিয়ে তিমি মাছ আনতে হবে না? এই দেশে তিমি মাছের ছবি পাওয়া যাবে?
হ্যাঁ পাওয়া যাবে।
কিন্তু শালার নির্বাচন কমিশনার আমাকে একশো টন ওজনের তিমি মাছ কেনো দিলো?
দিয়েছে ভালো হয়েছে?
বাতাসে উড়ছে মিলিয়া রহমানের চুল, সেই চুল সরিয়ে দিতে দিতে আদুরে গলায় প্রশ্ন করে দিগ্বিজয় রায়, তুমি বলছো তিমি মাছ আমার জন্য ভালো মার্কা?
মাথা নাড়ায় মিলিয়া, হ্যাঁ ভাই। আগেই বলেছি তিমি অনেক বড় মাছ। সেই বড় মাছ গোটা পোস্টার জুড়ে হবে আপনার মার্কার ছবি। জনগণ দেখবে আর ভাববে...
মাথার ওপর দেবদারু গাছের ওপর কাকেরা মিটিং করছিল। মিটিং করতে করতে কাকেরা হেগে দেয়, সেই হাগা এসে পড়ে মিলিয়া রহমানের রেশমীকোমল চুলে। কাকের হাগার গন্ধে মিলিয়া বমি করার জন্য হা করে । পকেটে রাখা টিস্যু বের করে দ্রুত মিলিয়া রহমানের ওপর কাকের হাগা পরিষ্কার করে নিজের হাতে মি. দিগ্বিজয় রায়। পাশে দাঁড়ানো কর্মীদের মধ্যে সুলতান মৃধা এগিয়ে আসে, বস আমারে দ্যান। আমি ম্যাডামের শরীরের ওপর হাগা মুইচা দিই?
মিলিয়া রহমানের শরীরের কাকের হাগা পরিষ্কার করতে করতে ত্যাড়া চোখে তাকায় মি. দিগ্বিজয় রায় সুলতান মৃধার দিকে, হারামজাদা ম্যাডামের হাগা কোথায় পেলি?
সরি ষাড়, ম্যাডামের হাগা না, ম্যাডামের শরীলে কাউয়ার হাগা―
এই নে, এতোক্ষণে সুন্দর করে মুছে ফেলেছে মি. দিগ্বিজয় রায় ম্যাডামের শরীরের উপরে পরা কাকের হাগা, বাড়িয়ে ধরে কাকের হাগা মোছার টিস্যু।
সুলতান মৃধা হাত বাড়িয়ে নেতার দেয়া কাকের হাগা মোছার টিস্যু নিয়ে পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। হাতটা দিয়ে কাকের হাগার গন্ধ আসছে। শালার কাকের হাগায় এতো বিশ্রি গন্ধ!
মিলিয়া?
কাকের হাগা মোছার পর বোতলের পানি নিয়ে মাথার চুলও ধুইয়ে দেয় মি. দিগ্বিজয় রায়। চারপাশে ঘিরে থাকা কর্মীরা, মাঝারি গোছের নেতারা কিছু মনে করে না। কারণ, মি. দিগ্বিজয় রায় চারপাশে ঘিরে থাকা এইসব কর্মীদের কুকুরের পালের মতো পালে। দিগ্বিজয় রায়ের সঙ্গে যারা রাজনীতি করে, সবাই জানে মিলিয়া রহমানের সঙ্গে গভীর নিবিড় সর্ম্পক। সামনে কর্মীরা সম্মানে মাথা নুইয়ে সালাম জানিয়ে, একটু দূরে সিগারেট-চা ফুকতে ফুকতে হাসে, শালার খানকি!
মিলিয়া রহমান জানেও সব। কিন্তু মজা লাগে এইসব ভিনেগারের স্বাধ। ক্ষমতারও একটা দাপট দেখানো যায়। ওয়ার্ডে, ঠাডা শহরের দলের কর্মীরা জানে মিলিয়া রহমানের দক্ষতা। সামনা সামনি কেউ কিছু বলার সাহস রাখে না। রাতে বা দিনে, যখনই ইচ্ছে হয়, শরীর জেগে ওঠে―ডাকে মিলিয়া রহমানকে। পঙ্গপালের সুখে ছুটে আসে মিলিয়া রহমানও। খুব সুখ অনুভব করে দিগ্বিজয় রায়ের সান্ন্ধ্যি।
দিগ্বিজয় রায়ের পাশে বসে মিলিয়া রহমান। সামনের সোফায় জয়নাল হোসেন আর মি. খোন্দকার মোশতাক বসে। তিনজনেই বুঝতে পারে, মি. দিগ্বিজয় রায় স্বাভাবিক নেই। রুমের মধ্যে সোফায় বসে আছে একলা। পড়নে একটা গামছা। পুরো শরীর উদোম। বুকের পশম কালো সাদা। সামনে টেবিলের ওপর বোতল, গ্লাস আর কবুতরের মাংসের ভুনা। মাংস থেকে গন্ধ আসছে।
মিলিয়া রহমানের মাথার চুলে আলতো আদর করতে করতে মি. দিগ্বিজয় রায়, কি বললো আমপুরা থানার ওসি মি. খবির মিয়া?
ভাই! মুখ খোলে মি. খোন্দকার মোশতাক। কিন্তু আর বলার সাহস পায় না।
কি হলো? তুমি থেমে গেলে কেনো?
ভাই, আমপুরা থানার ওসি তো মি খবির মিয়া না―জবাব দেয় জয়নাল হোসেন।
তোমাগো কি ভুতে পাইছে? মিলিয়া রহমানের কোমল চুলের বাগান ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসে দিগ্বিজয় রায়। আমি নিজে ফোনে আমপুরা থানার ওসি মি খবির মিয়ার সঙ্গে তোমাদের সামনে বসে ফোনে কথা বলি নাই? নাকি আমি মিথ্যা বলছি?
না,তুমি রাগ করো না। মিলিয়া রহমান নরম হাত রাখে দিগ্বিজয় রায়ের ঘাড়ে, আমরাতো থানায় গেলাম। ভাবলাম, আমরা যাবার সঙ্গে ওসি আমাদের সঙ্গে চলে আসবে। কিন্তু ওসির চেয়ারে বসা একটা কুকুর।
কুকুর? বিস্মিত গলা মি. দিগ্বিজয় রায়ের। কুকুর কি করে আমপুরা থানার ওসি হয়? ওকে নিয়োগ দেয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সঙ্গে আলাপ করতো না? আর দুনিয়ার কোথাও, কোনো দেশে আছে, থানার ওসি হয় একটা কুত্তা! কি বলতেছো তোমরা? বাড়ি দখল করতে চায় কুত্তার দল। আবার থানায় কুত্তা...
হ্যাঁ বস আমরাতো অবাক, আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়ে জয়নাল হোসেন। আমরা ভাবছিলাম―কোথ্য়া এলাম? ভুল দেশে ভুল জায়গায় নাতো? কিন্তু মি. চাংচুই আমাদের ভুল ভাঙ্গিয়ে বললো, না আপনারা ঠিক জায়গায়ই এসেছেন। একটু আগে আমপুরা ওয়ার্ডের কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায় ফোন করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, আপনারা আসবেন। আপনাদের অপেক্ষায় আছি..
একেবারে মানুষের মতো কথা বললো?
হ্যাঁ ভাই। একেবারে মানুষেল মতো।
কিন্তু চাংচুটা কে?
ওই শালার কুকুর ওসির আসল নাম চাংচু।
দাঁড়িয়ে রুমের মধ্যে হাঁটতে শুরু করে মি. দিগ্বিজয় রায়। বিরক্ত, অপমানিত, রাগান্বিত...। শালার রাস্তাঘাটের কুকুরেরা সব দখল করে ফেলছে? কিন্তু শনিবার তো আগামীকাল। ওরা তো আসবে। শোনা গেছে আমপুরার এই গলির আরও তিনটা বাড়ি কুকুরেরা দখলে নিয়েছে। বাড়িঅলারা কোর্টে মামলা করেছে। কিন্তু...
ভাই? এখন কি করা? প্রশ্ন করে মি. খোন্দকার মোশতাক।
মিলিয়া , তুমি আমার রুমে যাও। গোসল করে পবিত্র হও, আমি আসছি...
ওকে সোনা, উঠে চুমু খেয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায় ভারী নিতম্ব দুলিয়ে। মিলিয়া রহমানের চমচমে নিতম্বের দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে থাকে মি. খোন্দকার মোশতাক। মনে মনে কতোবার ভেবেছে, মিলিয়া রহমানকে বিছানায়। কিন্তু লোটে সব মি. দিগ্বিজয় রায়। পাশে বসে চিমটি দেয় জয়নাল হোসেন। সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়া রহমানের নিতম্ব থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে মি. খোন্দকার মোশতাক।
অন্যদিকে তাকিয়ে নিজের অংকের হিসেব নিকেশ করছিলো মি. দিগ্বিজয় রায়। দেখেনি প্রিয় সাগরেদ মি. খোন্দকার মোশতাকের নিতম্ব লেহন।
এখন কি করা যায়? প্রশ্ন রাখে দুই সাগরেদের কাছে দিগ্বিজয় রায়।
কুত্তা তো কুত্তাই। ভয় পাওয়ার কি আছে? মি. খোন্দকার মোশতাক নিজের মতো করে মাথার কালো টুপি দুই হাতে নাড়াতে নাড়াতে বলে, আপনার তো বন্দুক আছে। আছে বাহিনী। সেই বাহিনীর কাছে আছে পিস্তল, বন্দুক। ওরা এসে কুত্তাদের তাড়িয়ে দিক, মেরে ফেলুক...। আমি বুঝতে পারছি না আপনি কেনো কুত্তাদের ভয় পাচ্ছেন?
আবার বসে মি. খোন্দকার মোশতাক আর জয়নাল হোসেনের সামনে মি. দিগ্বিজয় রায়, তোমরা যা জানো না, আমি অনেক জানি। আমাদের এই গলির তিন তিনটা বাড়ি ইতিমধ্যে কুকুরেরা দখল করে নিয়েছে। কোর্টে মামলা হয়েছে। বিচারক তদন্তের ভার দিয়েছে তিন থানার ওসির ওপর―কিন্ত বিশেষ খবরে জানলাম, সেই তদন্ত কর্মকর্তারাও কুকুর।
বলেন কি! আঁতকে ওঠে দুই সাগরেদ।
বলছি কি আর! কোথা থেকে এতো কুকুর এল আমাদের গলিতে? হাঁটা যায় না কুকুরদের কারণে। কটাকে আর গুলি করে মারা যাবে? একটা গুলি করলে শত শত কুকুর ছুটে আসবে। শত শত কুকুরের পায়ের নখের আক্রমণে, দাঁতাল দুই পাটি দাঁতের কামড়ে কেউ বাঁচবে?
বিচলিত বোধ করে জয়নাল হোসেন আর মি. খোন্দকার মোশতাক। কতো বছর ধরে দিগ্বিজয় রায়ের আশ্রয়ে থেকে, লালিত পালিত হয়ে ঠাডা শহরে বাড়ি করেছে দুজনে―কোনওদিন সামান্য বিচলিত হতে দেখেনি নেতাকে, সবাইকে দুমড়ে মুচড়ে চুরমার করে দিয়ে... সেই লোক আজ কি বলছে?
তাহলে কি করবো আমরা?
খোন্দকার মোশতাকের প্রশ্নে থমথমে মুখে তাকায় মি. দিগ্বিজয় রায়। মাথা চুলকিয়ে বলে, তোমাদের মাথায় কোনো বুদ্ধি আছে?
জয়নাল হোসেন মাথা নাড়ায়, না ভাই। আমার মাথায় কিছু আসছে না।
মি. দিগ্বিজয় রায় তাকায় অনেক ঘটনার সাক্ষী মি. খোন্দকার মোশতাকের দিকে, তুমি? তুমি একটা কিছু বলো।
আমার বুদ্ধি হলো ভাই, কুকুরদের লাই দিতে নাই। মাথার লম্বা আকারের কালো টুপিটা খুলে বুকের ওপর বাতাস দিতে দিতে বলে, কুকুর আসলে আপনার বাহিনী দিয়ে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেবেন। কুকুর আর কয়টা আসবে আপনার কাছে? দশটা? কুড়িটা? পঞ্চাশটা? কোনো ঘটনাই না আপনার বাহিনীর কাছে―
আমার মনে হয় না...
কেনো?
তোমরা দেখেছো, আমপুরা এলাকার কুকুরদের গতিবিধি? ভয়ানক চোখে তাকায়, সব সময়ে গলির মোড়ে মোড়ে দল বেঁধে অপেক্ষা করে লম্বা লাল জিহবার সঙ্গে ভয়ংকর দাঁত বের করে। আগেই জানিয়েছি, ওরা ইতিমধ্যে গলির তিনটি বাড়ি দখলে নিয়েছে।
কার কার বাড়ি দখলে নিয়েছে?
জয়নাল হোসেনের প্রশ্নে উত্তর দেয় মি. দিগ্বিজয় রায়, মি. আতিক আহমদ, মি. খয়রাত হোসেন আর মি জয়রাম পোদ্দারের বাড়ি দখলে নিয়েছে।
মি. খয়রাত হোসেনের বাড়িও দখলে নিয়েছে? আঁতকে ওঠে মি. খোন্দকার মোশতাক। মি. খয়রাত হোসেন আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু―
হ্যাঁ,আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিল কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।
কেনো কিছুই করতে পারেন নি?
কি করে করব? আমাকে কুকুরদের লিডার সাদা কালো কুকুর ফোনে জানালো আমি যদি আমার বন্ধু মি. খয়রাত হোসেনকে সাহায্য করি, দার্জিলিংয়ে পড়ুয়া আমার মেয়েকে খেয়ে ফেলবে।
বলেন কি ভাই? ওরা আপনার মেয়ের খবরও..
হ্যাঁ পেয়ে গেছে, খুব মৃদুলয়ে উচ্চারণ করে মি. দিগ্বিজয় রায়। মেয়েটা যদি না বাঁচে আমার বেঁচে থাকায় কি আসে যায়! গলা ধরে আসে । জয়নাল হোসেন আর মি. খোন্দকার মোশতাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে, ইস্পাত দৃঢ় বস মি. দিগ্বিজয় রায় কাঁেদ।
পাঁচ.
মি. আগা খান?
কুকুরেরা মি আগা খানের বেড রুম দখল করে লেজ গুটিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে আছে। সাদা-কালো রঙের দাঁতাল কুকুরটা সবার সামনে। বোঝা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে কুকুরদের নেতা হচ্ছে এই সাদা-কালো দাঁতাল কুকুরটা। আগা খানের চারজন স্ত্রী সামনে বসা, খাটের নরম বিছনার ওপর।
কুকুর নেতার ডাকে তাকায় মি. আগা খান, কি বলবে বলো।
এই বাড়িটা তোমাকে ছাড়ার নোটিশ দিয়েছিলাম আরও এক মাস আগে।
আমাকে নোটিশ দেয়ার তোমরা কে? তোমরাতো কুকুর... কুকুরের...
ডান পা দিয়ে মুখের নীচটা একটু আচঁড়ে নেয় সাদা-কালো দাঁতাল কুকুর, তোমার কথা ঠিকই। আমরা কুকুর, এক বর্ণও মিথ্যা নয়। কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে তোমাদের গ্রাস করছি। নিশ্চয়ই টের পেয়েছো, তোমার খান ভিলার আশেপাশে বেশ কয়েকটা বাড়ি আমরা দখলে নিয়েছি।
রেগে ওঠে আগা খান, কিন্তু কেনো? সরকার কি তোমাদের পাঠিয়েছে?
আমরাই এই গলির সরকার।
মানে?
তোমাকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা বাধ্য নই। তোমাকে স্পষ্ট করে জানাই, আমরা যে সব বাড়ি দখল করেছি, প্রত্যেকটা বাড়ি অবৈধভাবে দখলে ছিল। সেই অবৈধ দখল থেকে উদ্ধার করে বাড়িগুলো দখল নিয়েছি।
আমার বাড়ি অবৈধ নাকি? আমার কাছে জমির দলিল আছে।
তোমার কাছে জমির দলিল আছে, জানি। কিন্তু আমরা আরও জানি, এই দলিল ভুয়া।
কি বলতে চাও তুমি?
এই বাড়ির দলিল ভুয়া। এই জামির মালিক ছিলেন সৈয়দ হারুণ। তুমি তাকে চিনতে? চিনতে না?
একটু সময় নিয়ে জবাব দেয় আগা খান, না। আমি সৈয়দ হারুন নামের কাউকে চিনি না।
কুকুরটা দাঁত বের করে হাসে, তাকায় পেছনে সারিবদ্ধভাবে বসা কুকুরদের দিকে। ওরাও হাসছে। বিছানার ওপর বসা আগা খানের চার স্ত্রীর মধ্যে প্রথম স্ত্রী শাকিলা পারভীন চোখ তুলে তাকায়। শাকিলা পারভীনের বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি। শরীর এখনও অটুট গাঁথুনিতে। কিন্ত প্রেসার আর ডায়বেটিকসের কারণে প্রায়ই ক্লান্ত থাকে। সৈয়দ হারুনের প্রসঙ্গ এলে শাকিলা পারভীন তাকায় আগা খানের দিকে। আগা খানও তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।
শাকিলা পারভীন, প্রশ্ন করে সাদা-কালো কুকুরটা, আপনি কি সৈয়দ হারুণকে চেনেন?
চুপচাপ ধরনের শাকিলা পারভীন নিজেকে আর সংযত রাখতে পারে না, কাঁদতে শুরু করে।
জয়নাব লতা ধাক্কা দেয় শাকিলা পারভীনকে, কি হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেনো?
যদিও একটি বাড়ির চার তলায় চারজন থাকে, কিন্তু আগা খানের পারমিশন ছাড়া কেউ কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারে না। ঈদের দিন কিংবা আগা খানের জন্মদিনে সবাই ছাদে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারে। টুকটাক গল্পগুজব করারও সুযোগ পায় চার সতীন।
ওনাকে কাঁদতে দিন মিসেস জয়নাব লতা, উত্তর দেয় কুকুরটা, সাদা-কালো।
কিন্তু কি হয়েছে ওনার? উনি কাঁদবেন কেনো সৈয়দ হারুনের প্রসঙ্গে? প্রশ্ন তোলে দ্বিতীয় স্ত্রী মিসেস করুণা বিধি।
তোমরা চুপ করবে? খেকিয়ে ওঠে আগা খান।
চুপ করলে কি হবে মি. আগা খান। আপনার রায় আজকেই হয়ে যাবে।
তুমি আমাকে কি মনে করো? তোমরা আমার বাড়িতে আসবে, আমার মান সম্মান নিয়ে খেলবে, আমি কিছু বলবো না, মনে করেছো? আমার বাড়ির চারপাশে একশ লোক পাহারায় আছে অস্ত্রসহ, যারা এক কিলোমিটার দূর থেকে দক্ষ শিকারি স্যানাইপার। এক ট্রিগারে..
ওরা কেউ বেঁচে নেই মি. আগা খান!
আগা খান অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় সাদা-কালো দাঁতাল কুকুরটার দিকে, অসম্ভব। আমার লোকেরা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। আর বিদেশ থেকে ওয়েল ট্রেনিং নেওয়া।
হতে পারে, আমরাও কম ট্রেনিং নিই নি মি. আগা খান। কুকুরদের মাঝখানে বসা একেবারে কালো কুকুরটা বলতে শুরু করে, কুকুরটা আকারে খুব বড় নয় কিন্তু শারীরিক বৈশিষ্ট্যে খুব বলশালী মনে হয়, তোমার একজন অস্ত্রধারীও বেঁচে নেই।
অসম্ভব―
কালো কুকুরটা লাল লম্বা জিহ্বা বের করে হাসে, বেশ কিছুক্ষণ হাসে কালো কুকুর, সঙ্গে যোগ দেয় রুমের মধ্যে বসে থাকা সারিবদ্ধ কুকুরেরা। গোটা রুম কুকুরের কদাকার ভয়াবহ হাসির দমকে ভরে যায়। ভয়ে, অশরীরী ভয়ে শিউরে ওঠে মি. আগা খান, আগা খানের চার স্ত্রী-শাকিলা পারভীন, করুনা বিধি, জয়নাব লতা এবং দিলরুবা ছন্দা। ভয়ে, ত্রাসে গলা শুকিয়ে যায়।
খেকিয়ে ওঠে আগা খান, কি শুরু করেছো তোমরা? থামো!
রুমের কুকুরগুলো হঠাৎ থেমে যায়। রুমে নেমে আসে নিস্তবতা। ভয়ে, আতঙ্কে হাঁসফাঁস করে আগা খানের চারজন স্ত্রী―শাকিলা পারভীন, করুণা বিধি, জয়নাব লতা আর দিলরুবা ছন্দা। চারজন স্ত্রীর সামনে এতোদিনের বাঘ স্বামী আগা খান বিড়ালের এই পরিপ্রেক্ষিত মেনে নিতে পারছে না। প্রবল ক্রোধ শরীরের মধ্যে দাপিয়ে ওঠে। ইচ্ছে হচ্ছে, রুমের প্রত্যেকটা কুকুরের গলা কেটে...
মি. আগা খান, আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পারেন, যদি আমাদের ওপর আপনার আস্থা না থাকে!
জানালা দিয়ে কি দেখব?
দেখবেন আপনার লোকদের মৃত্যুদেহ। দেখে, আপনি নিশ্চিত হোন, আমরা কি করতে পারি, আর কি পারি না―খুব ঠাণ্ডা গলায় বলে কালো কুকুর।
চার চারজন স্ত্রীর সামনে কুকুরদের এই বেইজ্জতিতে ক্রুদ্ধ আগা খান জানালা খুলে নিজের বাড়ির উঠোনে চোখ রাখে। দেখতে পায়, পোষা মানুষগুলো রক্তাক্ত বা থেতলানো শরীরে পড়ে আছে। অধিকাংশের গলার নলি নেই। মানে কুকুরেরা আক্রমণ করে গলার ওপর...। ভয়ে তীব্র শীতল প্রবাহ নামে শরীরের মেরুদন্ড জুড়ে। শরীরের শক্তি কর্পূরের ধোয়া হয়ে উড়ে যায়। নিজেকে হালকা তুলার মতো লাগছে মি আগা খানের। এতোগুলো নিজের মানুষ হারিয়ে গেলো? কতো শ্রম আর অর্থের বিনিয়োগে এদের তৈরী করেছিলো!
বসুন মি. আগা খান!
কালো কুকুরের আদেশে বিছানার ওপর বসে আগা খান। তাকায় স্ত্রীদের দিকে। স্ত্রীরাও তাকিয়ে আছে স্বামীর দিকে। কুঁকড়ে যায় আগা খান। জীবনে এ কোন অভিশাপ নেমে এল? সেই যে ত্রিশ বছর আগে ব্যবসা শুরু করেছিল, দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে সব কিছুই নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নাচিয়ে নিয়ে গেছে, যা করতে চেয়েছে, করেছে। সেই আগা খান―
আমাদের হাতে সময় কম মি. আগা খান, বলতে শুরু করে সাদা-কালো কুকুরটা। আপনি আমাদের নোটিশ অনুসারে কাগজপত্র রেখেছেন এই বাড়ির?
না!
কেনো?
আমি তো নিশ্চিত ছিলাম, আমার লোকদের আক্রমণে তোমরা বাড়ির আশেপাশেও আসতে পারবে না।
বুঝেছি। কিন্তু আমরা আপনার কাগজপত্রের অপেক্ষা না করেই নিয়ে এসেছি। সাদা-কালো কুকুর ইঙ্গিত করলে পাশের একেবারে ছাই রঙের কুকুরটা গলায় ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে এক বান্ডিল কাগজ বের করে আগা খানের সামনে বাড়িয়ে ধরে। কাগজগুলো হাতে নিয়ে আগা খান হতভম্ব। সবই এই বাড়ির কাগজ! কোত্থেকে কিভাবে পেলো? কুকুরদের সাংগঠনিক তৎপরতায় মুগ্ধ আগা খান।
এই দলিল এবং রেকর্ড তো আপনারই? প্রশ্ন করে ছাই রঙের কুকুরটা।
মাথা নাড়ায় আগা খান, হ্যাঁ আমারই জমির কাগজপত্র।
কিন্তু এই দলিলে আপনার সিগনেচার ঠিক থাকলেও মি সৈয়দ হারুনের সিগনেচার ঠিক নেই।
আগা খান ছাই রঙের কুকুরের দিকে অবাক তাকিয়ে থাকে। আর রুমের সবকটা কুকুরও তাকিয়ে দেখে আগা খানকে। আগা খানের চার স্ত্রীর মধ্যে শাকিলা পারভীন ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। শাকিলা পারভীনের হঠাৎ কান্নার শব্দে তিন সতিন বিস্মিত। আর আগা খান মিয়ম্রান চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মি. আগা খান, আপনাকে আগেই জানিয়েছি, আমাদের সময় কম। আপনার সিগনেচার ঠিক থাকলেও সৈয়দ হারুনের সিগনেচার ঠিক নেই কেনো? প্রশ্ন করে ছাই রঙের কুকুর।
আগা খান তাকিয়ে থাকে কুকুরদের দিকে, প্রতিটি কুকুর পেছনে লেজ গুটিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে সামনের দুটি পায়ের ওপর। প্রত্যেকে জিহ্বা বের করে ঝিমাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ঝিমাচ্ছে না, অপেক্ষা করছে নির্দেশের। সাদা―কালো কুকুরের নির্দেশ পেলে পলকে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
আপনি বলতে পারছেন না!
মি. আগা খান বিমর্ষ যন্ত্রনায় মুষড়ে পড়ে।
শুনুন আগা খান, আপনি ইট বালুর ব্যবসা শুরু করছিলেন আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। সেই সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের এক মন্ত্রীর সঙ্গে আপনার সর্ম্পক গড়ে ওঠে। সেই মন্ত্রীর প্রভাবে আপনি দ্রুত লোকাল সরকারের অনেকগুলো সরকারি বাড়ি নির্মানের ঠিকাদারী ভাগিয়ে নিয়ে, খুব দ্রুত কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। গড়ে ওঠে আপনার ক্ষমতার বলয়। তৈরি করেন আগা বাহিনী। এই সময়ে আপনার সঙ্গে পরিচয় ঘটে সৈয়দ হারুনের সঙ্গে। সৈয়দ হারুন ব্যবসায়ি হলেও সহজ সরল ছিলেন। তার বাড়িটার পিছনের দিকের বাড়িটার মালিক ছিলো এক পুলিশ কর্মকর্তা ইকরার হারিরি। পুলিশের জোরে করিম জাফর এই বাড়িটি দখল নিতে চাইলে সৈয়দ জাফর আপনার সাহায্য চায়। আমি ঠিক বলছি মি. আগা খান?
মি. আগা খান হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে, মগজের বিন্দু বিন্দুতে জাগে তীব্র তৃষ্ণা। এক গ্লাস হলে মন্দ হতো না, নিজের অতীতের ঘটনাবলী শুনতে শুনতে পান করা যেতো।
সৈয়দ জাফরের সঙ্গে চলে এলেন আমপুরার এই বাড়িটিতে। তখন এই বাড়িটি ছিল সাড়ে আট কাঠার ওপর দোতলা একটা বাড়ি। নিচটা পাকা হলেও দোতলায় ছিল টিন। কিন্তু গোটা বাড়িটা ছবির মতো সাজিয়ে রাখতেন সৈয়দ হারুনের স্ত্রী শাকিলা পারভীন।
আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে, বিকেলের দিকে আমার বাড়িতে আসে মি. আগা খান―কুকুরের সংলাপের মধ্যে ঢুকে পড়ে শাকিলা পারভীন। আমি তিনটে বিড়াল পালতাম। বিকেলে বারান্দায় বসে বিড়ালদের খাবার দিচ্ছিলাম। দেখি, বাড়িতে তখন বাড়ির নাম ছিল শাকিলা ভিলা। সৈয়দ হারুন আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। আমরা প্রেম করেই বিয়ে করেছিলাম অবশ্যই পারিবারিকভাবে। তো দেখি, বাড়ির গেট দিয়ে কালো রঙের নতুন ঝকঝকে একটা গাড়ি ঢুকছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ভাবলাম, দখলে নিতে চাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ইকরার হারিরি আসলো নাকি! না, দেখি গাড়ি থেকে নামছে আমার স্বামীর সঙ্গে লম্বা চওড়া এক পুরুষ। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় সৈয়দ হারুন, আমার বন্ধু আগা খান। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আর সরকারের উচুঁ মহলের সঙ্গে আছে যোগযোগ। ইকরার হারিরির গ্রাস থেকে আমাদের বাড়ি রক্ষা করবে। আমি অভিভূত। বড়ো কষ্ট করে করা এই বাড়ি রক্ষা করে দেবে আগা খান।
আমি নাস্তার আয়োজন করলাম। দুই বন্ধু হেসে গল্প করে নাস্তা খায়। সন্ধ্যার আগে যাবার সময়ে আগা খান আমাকে বলে যায়, ভাবী আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার বাড়ি আপনারই থাকবে। আর পুলিশ কর্মকর্তা ইকরার হারিরির ব্যপারটা আমি দেখছি। মানুষটা কথায় এমন একটা জোর বা আশ্বাস ছিল, আমি বিশ্বাস করেছিলাম,ইকরার হারিরির আগ্রাসী হাত আর আমাদের শাকিলা ভিলায় পড়বে না। আমার ধারণা সঠিক ছিল, কারণ আগা খান আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবার সাত কি আট দিনের মাথায় গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায় সেই পুলিশ কর্মকর্তা ইকরার হারিরি। আমাদের বুকের ওপর থেকে ভয়ের পাথরটা নেমে যায়। দিন চারেক পরে সৈয়দ হারুনের সঙ্গে আবার বাসায় আসে আগা খান।
আমি কৃতজ্ঞতায় বিমূঢ় আগা খানের প্রতি। অনেক পদের রান্নার আয়োজন করি বাড়িতে। রাতে দুই বন্ধু খাওয়া দাওয়া শেষে ড্রয়িংরুমে বসে। সৈয়দ হারুন আমার স্বামী ডেকে বলে, এক বাটি মাংস আর ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল দিয়ে যাও। আমি তো জীবনে সরাসরি মদ পান করা দেখি নাই। আমি আমার স্বামীর আদেশানুসারে বাসার ভেতর থেকে এক বাটি মাংস আর ফ্রিজের এক বোতল ঠান্ডা পানি এনে দেখি, আগা খানের গাড়ির ড্রাইভার চমৎকার লম্বা একটা বোতল নিয়ে হাজির গাড়ি থেকে। আমি বুঝলাম, এটা মদের বোতল। দুজনে পান করবে। আমার খুব খারাপ লাগলেও মেনে নিলাম। মনে মনে ভীষণ কৃতজ্ঞ ছিলাম আগা খানের প্রতি। না হয় একদিন পানই করলো বন্ধুর বাড়িতে। করুক না। আমি বেডরুমে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠে দেখি আগা খান নেই। সৈয়দ আমার পাশে ঘুমিয়ে।
ঘটনার সাত কি আট দিন পরে রাতে সৈয়দ হারুন বাড়ি ফিরে আসে না। বিয়েব পর সৈয়দ হারুন কোনো রাতে বাইরে থাকেনি। সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। আমি সকালে ফোন দিলাম আগা খানকে। আগা খান অবাক। পাল্টা প্রশ্ন করে, বাড়ি ফেরেনি সৈয়দ হারুন? আমরা মতিঝিলে একটা বৈঠকে ছিলাম বিকেল পর্যন্ত। বৈঠক শেষে হারুন চলে যায় গাড়িতে, আমি চলে যাই আমার অফিসে। ভাবী, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি দেখছি―
আমি আশ্বস্থ ছিলাম। ধারণা ছিল, আগা খান নিশ্চয়ই সৈয়দ হারুনের ব্যাপারে একটা পজিটিভ খরব দেবে। হ্যাঁ খবর সে দিয়েছিল, কিন্তু সৈয়দ হারুনের ডেড বডির।
ডেড বডির? আঁতকে ওঠে করুনা বিধি, আগা খানের দ্বিতীয় স্ত্রী।
হ্যাঁ, আমাকে ফোনে জানায় আগা খান, ভাবী একটা দুঃখের খবর দিচ্ছি আপনাকে। সৈয়দ হারুন আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আর বেঁচে নেই।
আমি চমকে উঠি, কি বলছেন আপনি?
হ্যাঁ ভাবী। যা সত্য সেটাই জানাচ্ছি আপনাকে। পুলিশের আইজিকে গতকাল আমি হারুনের নিঁখোজের ব্যাপারটা জানাই। এই একটু আগে পুলিশের এ আইজি ফোনে জানায়, সুরাগ নদীর পারে একটা লাশ পাওয়া গেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে যাই। এবং দেখতে পাই, লাশটা আমার প্রিয় বন্ধুর।
আমি শোকে পাথর হয়ে যাই। কি করবো কি করবো না ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, আমার এই গভীরতম দুঃখ ও শোকের সময়ে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখা দেন মি. আগা খান। দেখতে দেখতে আমাকে প্রায় গ্রাস করে ফেলে এবং এক রাতে আমার বাড়িতে এসে জানায়, শাকিলা! আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আমি হতভম্ব, বলে কি লোকটা! আমি অবাক হয়ে বলি, এ আপনি কি বলছেন? আমি আপনার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর বিধবা স্ত্রী!
শাকিলা! আমি প্রথম যেদিন তোমাকে দেখি, তোমার বাড়ির বারান্দায় বিড়ালকে খাবার দিচ্ছো, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে তোমাকে কামনা করে আসছি। আর সৈয়দ হারুনকে মেরে আমি আমার পথ পরিষ্কার করেছি। তুমি চাইলে আমাকে ভালোবাসতে পারো, না ও বাসতে পারো―আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমাকে বুকের মধ্যে ঝাপটে ধরে...।
শাকিলা পারভীনের হু হু কান্নায় গোটা রুম স্তব্দ। কুকুরগুলোও বিষন্ন। আগা খানের বাকি তিন স্ত্রী করুনা বিধি, জয়নাব লতা আর দিলরুবা ছন্দা আগা খানের দিকে তাকায়। আগা গান বিহব্বল চেতনার চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখছে, দেয়ালের রঙ।
শাকিলা পারভীনের শোক একটু কমলে, আমাকে জোর করে বিয়ে করে মাস খানেক পরে। বিয়ের মাস চারেক পরে একটা দলিল এনে রাখে আমার সামনে। হাসতে হাসতে বলে, তোমাকে বলা হয়নি, তোমার আগের স্বামী মি সৈয়দ হারুন মারা যাওয়ার আগে আমাকে বাড়িটা বিক্রি করে যায়। দেখো দলিল...
আমি কি করবো? দলিলটা হাতি নিয়ে দেখি, সই সৈয়দ হারুনের না। বুঝতে পারি, সবই ষড়যন্ত্র! আগে থেকে প্রি- প্ল্যানড সব।
কালো কুকুর মাথা নাড়িয়ে বলে, শাকিলা পারভীন! আপনার স্বামীর হয়ে ওই দলিলে কে স্বাক্ষর করেছিলো জানেন?
কি করে জানবো? জানার আগ্রহও আমার ছিল না। বুঝে গেছি, জেনেও কোনো লাভ নেই। এই কুমিরের সঙ্গে কিছুতেই কিছু করতে পারবো না আমি।
জেনে রাখুন, রেজিস্ট্রি অফিসে আপনার স্বামী সৈয়দ হারুনের জায়গায় দাঁড়িয়ে স্বাক্ষর করেছিলো মি. দিগ্বিজয় রায়।
আমপুরা ওয়ার্ড কমিশনার? প্রশ্ন করে জয়নাব লতা।
হ্যাঁ, কালো কুকুরটা সমর্থন করে।
সাদা-কালো কুকুর হাই তোলে, মি. আগা খান। প্রমান হলো যে, এই বাড়ি দখল করে আপনি পাঁচ তলা বাড়ি বানালেও সব অবৈধভাবে করেছেন। এবং এই বাড়ি আপনার না। সুতরাং আমরা দখলে নিলাম―এই মুহূর্ত থেকে। আপনি চলে যান।
এখনই?
হ্যাঁ, এখনই, এই মুহূর্তে...।
সঙ্গে সঙ্গে এতোক্ষণ অপেক্ষারত কুকুরেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে খাটের দিকে। ভয়ে খাট থেকে নেমে দাঁড়ায় মি. আগা খান, আমার স্ত্রীরা?
ওরাও যাবে আপনার সঙ্গে।
আগা খানের চারজন স্ত্রী শাকিলা পারভীন, করুণা বিধি, জয়নাব লতা ও দিলরুবা ছন্দা খাট থেকে নেমে দাঁড়ায়। কুকুরেরা ঘুরে পিছনে গেলে আগা খান চারজন স্ত্রীসহ রুম থেকে বের হয়ে আসে। পেছনে কুকুরেরা...। আগা খান চারজন স্ত্রীসহ সিঁড়ি ভেঙ্গে নামে। কুকুরেরা পেছনে পেছনে নামে...।
ছয়.
রাত গভীর।
সারা দিনে অনেক পরিশ্রম করেছে সাদা-কালো কুকুর। সাত আটটা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটু ক্লান্ত। ক্লান্ত হলেও খুব তৃপ্তি পাচ্ছে সাদা-কালো কুকরটা। আমপুরা গলিটা প্রায় দখলে আনা গেছে। আর মাত্র কয়েকটা বাড়ি দখলে আনা বাকী আছে। কুকুরদের পরিকল্পনা পরিষ্কার―বৈধ কোনো বাড়ি কুকুরেরা দখলে নেয় না। দখলে নেয়, মানুষের দখল করা বাড়ি। সেই সূত্রে আমপুরার এই গলি প্রায় নিজেদের দখলে। পৃথিবীতে হতে যাচ্ছে, প্রথম কুকুরের গলি।
সাদা-কালো কুকুর পরিকল্পনা করছে, কুকুরের একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। যার শুরুটা হলো ঠাডা শহরের আমপুরার এই গলিটা থেকে। দলের কয়েক জনের সঙ্গে পরিকল্পনা সর্ম্পকে কথা হয়েছে। কয়েকটা কুকুরতো দারুণ সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু কয়েকটা কুকুর সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
লেজকাটা কুকুরটা বলেছে, মানুষেরা ছাড়বে কেনো? ওরা খুব নিষ্ঠুর। কুকুরদের এমনিতেই ঘৃণা করে। আমরা দখল করতে গেলে গুলির পর গুলি করে মেরে ফেলবে।
পৃথিবীতে এখন কয়েক কোটি কুকুর―প্রতিবাদ করে ডান পা ভাঙ্গা কুকুর। আমরা একত্র হতে পারলে, পৃথিবীতে একটা কুকুর রাষ্ট্র করা সম্ভব।
মানুষ কোনওভাবেই কুকুরের রাষ্ট্র তৈরী করতে দেবে না, কাটা লেজটা মাটিতে ঘষা দিতে দিতে বলে লেজকাটা কুকুর, মানুষের অমানুষিকতা দেখেছো?
বৈঠকের সব কুকুর তাকায় লেজকাটা কুকুরটার দিকে। সাদা-কালো কুকুরটা প্রশ্ন করে, মানুষের আবার অমানুষিকতা কি?
মানুষের অমানুষিকতা তো এক দুই ঘন্টায় বলা যাবে না, বললে কয়েক দিন রাত লাগবে। যেমন ধরো, মানুষের দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব চেয়ে মানবিক রাষ্ট্র বলে বিবেচিত। কিন্তু সেই রাষ্ট্রে কালো মানুষদের ওপর সাদারা নিপীড়ন চালিয়ে দাস বানিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর। এখনও, যখনই সময় পায়, সুযোগ পায় কালোদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সাদারা। নির্মমভাবে হত্যা করে কালো মানুষদের। দুনিয়ায় যতো রকমের রাষ্ট্র বিরোধী কাজ আছে, আছে গুম হত্যা, পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং গোপন সংস্থা সি আই এ। বাংলাদেশ নামক একটা দেশের মানুষেরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল পাকিস্তানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, প্রাণ দিয়েছে ত্রিশ লাখ মানুষ, মা বোনেরা হারিয়েছে কৌমার্য পাকিস্তানীসৈন্যদের কাছে, কোনো তাবর রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি নির্যাতিত নিপীড়িত বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে, ন্যায়ের পক্ষে। ওপরন্তু সৌদি বাদশা বলেছে, পাকিস্তান আমার ভাই। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে, সৌদি আরব মনে করবে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধেই নেয়া হচ্ছে। নাইজেরিয়া নামে একটি দেশে আছে―বোকো হারাম নামে একটি দেশের একটি জংগী সংগঠন প্রতিদিন নিজের দেশের মানুষদের হত্যা করছে। ভারত বলে বড় একটি দেশ আছে, সেই দেশের সংখ্যালগুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর বা শ্রেণীহীন নাগরিকে পরিণত করছে―সরকার। গরুর মাংস খাওয়ার কারণে একটি সংখ্যালগু সম্প্রদায়ের মানুষদের কুপিয়ে পিটিয়ে মারছে। ইয়েমেন নামে একটি দেশে প্রতিবেশী সৌদি আরব প্রতিদিন টনকে টন বোমা মেরে হাজার হাজার নারী পুরুষ শিশু হত্যা করছে। আফগানিস্থানে, ইরাকে নিজেদের দেশের মানুষদের ওপর আত্মঘাতি বোমা হামলা করে নিরাপরাধ হাজার হাজার মানুষ হত্যা করছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শত শত শিশু বলাৎকারের শিকার হচ্ছে...। এই হচ্ছে মানুষের দুনিয়ায় মানুষের কারবার। সেই মানুষেরা কুকুর মানে আমাদের জন্য জায়গা ছাড়বে? যারা নিজেদেরই ছাড় দেয় না―ভাই ছাড় দেয় না বোনকে, সন্তান ছাড় দেয় না পিতামাতাকে...
তুমি খুব জ্ঞানী কুকুর―আমরা জানি, বাড়ির সোফার ওপর শরীর হেলে দিয়ে আস্তে আস্তে বলে সাদা কালো কুকুর―ওদের সর্ম্পকে অনেক পড়াশুনা করেছো। তোমার জ্ঞান ভবিষ্যতে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগবে। কিন্তু তুমি এতক্ষণ যা বললে, ওটাতো মানুষদের নিজস্ব ঘটনা। আমাদের তো নয়―
আমি বলতে চাইছি, যে মানুষ নিজেদের ছাড় দেয় না মতের বা স্বার্থের সামান্য ভিন্নতার কারণে, সেই মানুষেরা কুকুরদের ছাড় দেবে? আবার অধিকাংশ মানুষ কুকুরদের ঘৃণা করে অপরিসীম।
মি লেজকাটা কুকুর ভাই, আপনার বক্তব্য শুনলাম―তেতে ওঠে লাল কুকুর। লাল কুকুরেরা পুলিশ কুকুর। বৈঠকে উপস্থিত লাল কুকুর পুলিশ কুকুরের আইজি। আমাদের সামনে মোক্ষম সুযোগ এসেছে একটা গলি দখল করার। আমাদের নেতা সাদা-কালো কুকুর যা বলছেন, সেটাই আপাতত শোনেন। পরেরটা পরে দেখা যাবে। কি বলেন আপনারা?
সাদা-কালো কুকুরের ড্রয়িংরুমে উপস্থিত কুকুরেরা সমর্থন জানায়। শেষ রাতের দিকে ভোজন শেষে যার যার কাজে চলে যায় কুকুরেরা। সাদা কালো কুকুর ঘুমিয়ে পড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে সোফার ওপর। সকালে ঘুম ভাঙ্গে সাদা-কালো কুকুরের প্রহরী কুকুরের ডাকে।
কি ঘটনা?
আপনার সঙ্গে একজন মানুষ দেখা করতে এসেছে।
সাদা-কালো কুকুর অবাক তাকায়, তুমি ঠিক বলছো? আমার সঙ্গে মানুষ দেখা করতে এসেছে?
জি জনাব, একজন মানুষ। আমাকে বললো, আপনার সঙ্গে জরুরী গোপন পরামর্শ আছে।
একটু সময় ভাবে সাদা-কালো কুকুর, ঠিক আছে আসতে দাও। আর তোমারা প্রস্তত হয়ে আশেপাশেই থেকো। মানুষতো বিশ্বাস করা যায় না।
ওকে জনাব, চলে যায় প্রহরী কুকুর। কিন্তু সাদা-কালো কুকুর চিন্তিত। এই সময়ে কোনো মানুষের দেখা করতে আসা মানেই... কোনো অশুভ বার্তা। ভাবনার মধ্যে একজন মানুষ এসে দাঁড়ায় সামনে। মাথায় কালো লম্বা টুপি। শরীরেও আজানুলম্বিত কালো কোট। চোখে সুরমা। সামনের দাঁতগুলো একটু একটু ফাঁক। আঁকারে ছোট খাট গড়নের মানুষটি বলে, আমার নাম মি. খোন্দকার মোশতাক।
জি বলুন―
আমি মি. দিগ্বিজয় রায়ের প্রধান সাগরেদ। উনি আমাকে খুব বিশ্বাস করে। অনেক গোপন খবর আমি আপনাদের দিতে পারি।
সাদা-কালো কুকুর নড়ে চড়ে বসে, তাকায় মি. খোন্দকার মোশতাকের দিকে তীক্ষè চোখে―, ভালো খবর। বসুন আপনি।
সামনের চেয়ারে বসেমি. খোন্দকার মোশতাক, আমার কাছে ভয়ানক খবর আছে। খুবই গোপনীয়-
বলুন আপনার গোপনীয় খবর!
আমি অতীব জরুরী গোপন খবর দিলে বিনিময়ে কি পাবো?
আপনি কি চান?
দিগ্বিজয় রায়ের বাড়িটা দখল করার পর অর্ধেক আমাকে দেবেন।
যদি না দেই?
আমি গোপন খবর বলবো না।
কি ধরনের গোপন সংবাদ আপনি দেবেন মি. খোন্দকার মোশতাক, কিংবা আপনি যে খবর দেবেন, সেই খবর আমরা জেনে গেলে তো আপনার প্রয়োজন নেই।
আমি নিশ্চিত, দিগ্বিজয় রায়ের যে গোপন সংবাদ আমি আপনাকে দেবো, সেই খবর আমি, দিগ্বিজয় রায় ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু আপনাদের জানা জরুরি। কারণ, আপনারা যখন আগামী শনিবার দিগ্বিজয় রায়ের বাড়ি যাবেন, ঠিক সেই সময়ে বিমানে প্যারাসুটে নেমে আসবে একদল কমান্ডো বাড়ির ছাদে―
সাদা-কালো কুকুর বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে আছে মি. খোন্দকার মোশতাকের দিকে, কমান্ডোর খবর তো জানা ছিল না। লোকটাকে আপাতত দলে নেয়া যেতে পারে।
আপনারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গেলেই বিমানে বসে ওরা আপনাদের ওপর মেশিনগানের গুলি ছুঁড়বে। অনেক ওপর থেকে গুলি ছুঁড়বে, আপনারা ঝাঁকে ঝাঁকে মারা যাবেন।
মাথা নাড়ায় সাদা-কালো কুকুর, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই চমকপ্রদ গোপন তথ্য পাচার করার জন্য। আমি আমার সঙ্গীদের সঙ্গে আলাপ করে আপনার চাহিদা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো। আপনাকে ফোনে জানিয়ে দেয়া হবে- কেমন?
অনেক ধন্যবাদ, দাঁড়ায় মি. খোন্দকার মোশতাক হাত জোড় করে, আপনি কি বুঝতে পারছেন মহামান্য, আমি কতোবড় ঝুঁকি নিয়েছি?
দুই গালে শব্দ করে হাসে সাদা-কালো কুকুর, আমি বুঝতে পেরেছি। মনে রাখবেন, আমরা কুকুর। একবার যদি কারো বাড়িতে অন্ন গ্রহণ করে থাকি, সারা জীবন অন্নদাতার সঙ্গে থাকি। যদি কারো উপকার গ্রহণ করে থাকি, সেই উপকারীকে চিরকাল মনে রাখি। আমি নিশ্চিত, আমার সঙ্গীরা আপনার ঝুঁকির পুরষ্কার বিবেচনা করবে সততা ও ন্যায়ের সঙ্গে। আপনি আসুন..
অনেক ধন্যবাদ, আশ্বস্থ হলাম আর কি! আবারও হাত জোড় করে শ্রদ্ধা জানিয়ে দ্রুত চলে যায় মি. খোন্দকার মোশতাক। মি. খোন্দকার মোশতাকের গমন পথের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে সাদা-কালো কুকুর, মানুষের মধ্যে প্রচুর মীর জাফর থাকে। যেমন ছিল ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন ভাগীরথী নদীর পাড়ে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজের সঙ্গে আপন খালু প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মধ্যে দিয়ে যে প্রতারণার ইতিহাস রচনা করেছে, বিস্ময়কর। দুনিয়ার ইতিহাসে মুসলমানদের মধ্যেই বিশ্বাসঘাতকদের সংখ্যা বেশি। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মাতৃভূমির বিরুদ্ধে প্রচুর বাঙালি যুদ্ধ করেছে, পাকিস্তানি সৈন্যদের পক্ষ নিয়ে নিজ দেশের অজস্র মানুষ হত্যা করেছে। রাজাকার আলবদর বাহিনী গঠন করে নিজের দেশের মানুষ, প্রতিবেশী, বন্ধু, আত্মীয়, শিক্ষকদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
সেই মানুষের একজন প্রতিনিধি মি. খোন্দকার মোশতাক! সাদা কালো কুকুরের মুখে মৃদু কিন্তু রহস্যপূর্ণ হাসির ঝলক দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়।
সাত.
আমপুরার ওয়ার্ড কমিশনার মি. দিগ্বিজয় রায়ের বিশাল ড্রয়িংরুমে কুকুরেরা সারিবদ্ধভাবে বসা।
কুকুরদের সবার সামনে সাদা-কালো কুকুর। সাদা কালো কুকুরের পিছনে কালো কুকুর। লাল কুকুর কালো কুকুরের পিছনে। বাকীরা একত্রে বসে আছে নির্দেশের অপেক্ষায়। মি. দিগ্বিজয় রায় কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিজ্ঞা করেছে, কুকুরদের সঙ্গে কোনওভাবে রাগ করবে না। দেখতে, কুকুরের বাচ্চাদের দৌড় কতো দূর! হারামজাদা কুত্তার বাচ্চা কুত্তা...
মি. দিগ্বিজয় রায়, আপনি আপনার জমি বা বাড়ির কাগজপত্র এনেছেন?
সাদা-কালো কুকুরের প্রশ্নে উত্তরে হাসে মি. দিগ্বিজয় রায় বিশাল চেয়ারে বসে। পাশে রাখা কাগজের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দেয়, এই নাও আমার জমি ও বাড়ির দলিল রেকর্ড এবং কাগজপত্র।
সাদা কালো কুকুর কাগজপত্রের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে পেছনে অপেক্ষায় থাকা কালো কুকুরের কাছে দেয়। কালো কুকুর প্যাকেট খুলে গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখে। প্যাকেটের কাগজপত্র দেখার পর ব্যাগ খুলে নিজেদের সংগ্রহ করা কাগজপত্রের সঙ্গে মেলায়। দুই পক্ষের কাগজ দেখার পর কৌতুক করে হাসে কালো কুকুর, সব কাগজই ঠিক আছে।
কালো কুকুরকে ব্যাগের মধ্যে থেকে কাগজপত্র বের করতে দেখে, অবাক মি. দিগ্বিজয় রায়। শালার কুত্তা, তোরাও কাগজপত্র বুঝিস! দেখি, বুঝতে বুঝতে কতো দূর যাও!
মি. দিগ্বিজয় রায়―আপনি যে কাগজপত্র দিয়েছেন এই জমি ও বাড়ির সম্পূর্ণটাই ভুয়া।
মানে? খেঁকিয়ে ওঠে দিগ্বিজয় রায়। বাড়ির দলিল, দলিলের টিকেট, রেকর্ড সব সরকারি তোষাখানা থেকে এনেছি তোমাদের মতো নিম্নশ্রেণীর কুত্তাদের দেখানোর জন্য।
পেছনের লাল কুকুরেরা ঘোঁ ঘোঁ ঘোঁ শব্দে রাগ প্রকাশ করলে সাদা-কালো কুকুর ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে ওরা চুপ।
আপনি যখন এই বাড়ি বা জমি দখল নেন, তখন এই বাড়ির মালিক কে ছিলেন?
তখন এই বাড়ির মালিক কে ছিলেন, দলিলে লেখা রয়েছে। নিজেকে সামলে নিয়েছে মি. দিগ্বিজয় রায়। না―রাগ দেখানোর সময় আসেনি এখনও।
আপনার মুখে শুনতে চাই―
আমি জমি ক্রয় করেছি মি. গোপাল রঞ্জন হালদারের কাছ থেকে।
গোপাল রঞ্জন হালদার কি আপনার কাছে জমি বিক্রি করতে চেয়েছিল?
অবাক প্রশ্ন, বিক্রি না করলে কিনলাম কি করে?
আপনি জোর করে কিনেছেন মি. দিগ্বিজয় রায়।
কি আজগুবি প্রসঙ্গ আনছেন, এতোদিন পরে। আমি জমি কিনেছি প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল। বাড়িও তো করেছি বিশ বছর হলো।
মি. দিগ্বিজয় রায়, আপনাকে আমরা একটা ভিডিও দেখাবো।
ভিডিও?
হ্যাঁ ভিডিও। সাদা-কালো কুকুর ইঙ্গিত করলে পেছনে নীল রঙের একদল কুকুর এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে একটা সাদা কাপড় টাঙ্গিয়ে দেয়। আর একদল নীল রঙের কুকুর পেছনের দেয়ালের পাশে ছোট টেবিলের ওপর প্রজেক্টর মেশিন বসায়। একটা কুকুর ড্রয়িং রুমের আলোগুলো নিভিয়ে দেয়। প্রজেক্টর চালু করে দেয় নীল কুকুরের দল। বিপরীতে সাদা পর্দায় দেখা যায় পঁিচশ বছর আগের সময়ে।
মি. দিগ্বিজয় রায় দাঁড়িয়ে আছে মি. গোপাল রঞ্জন হালদারের একতলা টিনের বাড়ির সামনের বারান্দায়। সঙ্গে আট নয়জন সঙ্গী। কারো হাতে চাপাতি, কারো হাতে বিরাট ছুড়ি, কারো হাতে কুড়াল, কয়েক জনার হাতে পিস্তল। এই লোকগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে গোপাল রঞ্জন হালদার, গোপালের স্ত্রী নমিতা রানী হালদার। দুজনের আঠারো বছরের মেয়ে সঞ্চিতা, পনেরো বছরের মেয়ে পারুলিমা, এগার বছরের ছেলে সৌভিক কুমার।
মি. দিগ্বিজয় রায়ের হাতে দলিলের কপি, খুব সংহত আর বিনয়ের সঙ্গে বলছে গোপাল রঞ্জন হালদারকে, দেখুন―আপনার এগারো কাঠা জমি আমার পছন্দ হয়েছে। একেবারে আম কাঁঠালে ঘেরা এমন একটা বাড়ি আমি অনেক দিন ধরে খুঁজছি। পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আপনার মেয়ে মিস সঞ্চিতার বিয়ের বিষয়ে আমার বন্ধু মি. আশুতোষের সঙ্গে এসে, আমি আপনার বাড়ি দেখে মুগ্ধ। আরে এই বাড়িটাইতো আমি খুঁজছিলাম। দুই দিন পরে এসে আমি আপনাকে প্রস্তাব করি বাড়িটা বিক্রির।
আপনি না করলেন, বললেন, বাপ-দাদার বাড়ি বিক্রি করবো না।
আমি বললাম, জায়গার দাম তো আট দশ লাখ টাকা। আমি আপনাকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবো―
আপনি রেগে গেলেন মশাই, বললেন―আপনি আমার বাড়ি থেকে চলে যান। নইলে পুলিশ ডাকবো। আমি ভদ্রলোক মানুষ। আইন মানি। পুলিশের ভয় দেখালেন, আমি চলে গেলাম। কিন্তু আমি নিজেই পুলিশ হয়ে এসেছি। দলিল লিখে নিয়ে এসেছি, সই করে আট লাখ টাকা নিয়ে কেটে পড়ুন। নইলে, জবাই করবো....
আপনার স্ত্রী নেহায়েত ভালো মানুষ, আপনাকে সই করে প্রাণ নিয়ে যেতে বললে, আপনি সই করে দিলেন। ব্যাস- আপনারা মুক্ত। চলে যান।
কোনওভাবে টাকার বান্ডিলগুলো হাতে নিয়ে গোলাপ রঞ্চন হালদারেরা বাড়ির বাইরে চলে গেলো কাঁদতে কাঁদতে। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়েছিল একটি মাইক্রোবাস। ওরা মাইক্রোবাস পার হবার সময়ে একদল ষন্ডামার্কা লোক, যারা অপেক্ষায় ছিল গাড়ির কাছে, গোপাল হালদারের সংসারের লোকগুলোতে ধরে ধরে গাড়িতে তোলে এবং মুখের কাছে রুমাল ধরলে প্রত্যেকে জ্ঞান হারায়। গাড়ি চলতে শুরু করে...
চোখের সামনে সাদা পর্দার দৃশ্যগুলো দেখে মি. দিগ্বিজয় রায়ের চোখের মণি ছিটকে বাইরে আসতে চায়। সেই সময়ে এই ভিডিও ধারণ করেছিল কে? কুকুরগুলো তো তখন এই গলিতে ছিল না। তাহলে? এই শালার নেমকহারাম কুত্তারা এই সাদা কালো যুগের এই রঙিন ভিডিও কোথায় পেলো? এইতো দেখছি, ঘাড়ের ওপর আসমানী বালা! কি করবো? কাকে ডাকবো? একমাত্র ভরসা―মি. আম্বিয়া চরণ!
মি দ্বিগিজয়ের লোকেরা গাড়ি থামায় বিশাল একটা বিলের পাশে। বিলের ঘাটে বিরাট একটা নৌকা লাগানো। নৌকায় কয়েকটা পিপা। দুপুরের তপ্ত রোদ। কোথাও কোনো জনমানুষ নেই। গাড়ির ষন্ডামার্কা লোকগুলো গাড়ি থেকে গোপাল রঞ্জন হালদার এবং পরিবারের সবাইকে টেনে টেনে নৌকায় তোলে। নৌকায় তোলার পর বড় বড় পিপার মধ্যে ধরে ধরে ঢুকিয়ে দেয়। পিপার মধ্যে পাথর আর চুন ভরা। যখনই যাকে পিপার মধ্যে ঢুকিয়েছে, অজ্ঞান অবস্থায় মারা গেছে। সবাইকে ঢুকিয়ে মুখের ডালা দিয়ে বন্ধ করেছে। পিপা বন্ধ করার পর নৌকা গভীর বিলের দিকে নিয়ে গেছে। নৌকাটা যেতে যেতে পর্দা থেকে হারিয়ে যায়।
মি. দিগ্বিজয় রায়ের ড্রয়িংরুমে আলো জ¦লে। মি. দিগ্বিজয় রায় বিস্মিত, বিপন্ন, অস্থির আর চলতশক্তিহীন। পঁিচশ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিটি বিন্দু পল যদি পুনরায় চোখের সামনে হাজির হয়, কিভাবে স্থির থাকে? এতোগুলো মানুষ খুন... বাড়ি দখল...।
আপনার কিছু বলবার আছে মি. দিগ্বিজয় রায়? প্রশ্ন করে কালো কুকুর, কুকুরদের আইন শৃঙ্খলার প্রধান।
তোমরা কিভাবে এই ভিডিও বানালে?
হাসে কালো কুকুর, কুকুরদের বিজ্ঞান কতোদূর এগিয়েছে, বুঝতে পারছো?
কুকুরদের বিজ্ঞান?
হ্যাঁ, আমরা মানুষের পৃথিবী দখলের জন্য জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় নেমেছি অনেক অনেক আগে থেকেই। যাই হোক, তুমি বুঝতে পারছো, এই বাড়ি তুমি অন্যায়ভাবে দখলে নিয়েছো। এখন ছেড়ে চলে যাও। আমরা দখল নেবো।
কিন্তু কেনো?
এটাই পৃথিবীর নিয়ম। যে প্রাণী গোষ্ঠী বিজয় লাভ করবে, সেই প্রাণীরা টিকে থাকবে। যারা হেরে যাবে, তারা হারিয়ে যাবে। তোমরা মানবগোষ্ঠী, আমাদের কাছে হেরে যাচ্ছো...।
মি. দিগ্বিজয় রায় সময় ক্ষেপণ করছে, আড় চোখে ঘড়ির দিকে তাকায়। আর মাত্র দশ মিনিট পর হেলিকাপ্টারে কমান্ডোরা আসছে। ধীরে ধীরে উঠে মি. দিগ্বিজয় রায় ঘরের মধ্যে যাবে। ঘরের সিঁিড় বেয়ে উঠে যাবে ছাদে, হেলিকাপ্টার থেকে নেমে আসবে দড়ির সিঁড়ি। সেই দড়ির সিঁড়ি বেয়ে চলে যাবে হেলিকাপ্টারে আর কুকুরের বাচ্চা কুত্তারা খাবে গুলি, গুলি আর গুলি...
মি. দিগ্বিজয় রায়, ডাকে সাদা-কালো কুকুর।
তাকায় দিগ্বিজয় রায়, বলো।
আপনার জন্য আমাদের একটা উপহার আছে।
কি উপহার?
সাদা-কালো কুকুর ইঙ্গিত করলে, ড্রয়িংরুমের পেছনে থাকা কয়েকটা লাল কুকুর প্লাস্টিকের একটা লম্বা ব্যাগ টেনে নিয়ে আসে মি. দিগ্বিজয় রায়ের সামনে। কি হতে পারে ব্যাগের মধ্যে, ভাবছে দিগ্বিজয় রায়। একটা লাল কুকুর মুখের দিকের চেইন টান দিয়ে খুলে দিলে, তাকায় দিগ্বিজয় রায়। ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে মৃত নাহিয়ান। নাহিয়ান হেলিকাপ্টারের পাইলট।
অপলক তাকিয়ে থাকে মি. দিগ্বিজয় রায় নাহিয়ানের মৃত মুখের ওপর। কিভাবে কি ঘটলো বুঝতে পারছে না। তাহলে হেলিকাপ্টারে কমান্ডোরা আসছে না। মি. দিগ্বিজয় রায় বুঝতে পারছে, সব পথ বন্ধ। বাড়ির চারপাশে নিশ্চয়ই কুকুরেরা অপেক্ষা করছে।
মি. দিগ্বিজয় রায়, সাদা কালো কুকুর বলে, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আপনি এখন শুন্য। কেউ আপনার সাহায্যে আসবে না। এখন দয়া করে প্রাণ নিয়ে যেতে চাইলে, এখনই আপনাকে চলে যেতে হবে এই বাড়ি, আমপুরার এই গলি ছেড়ে...। কি করবেন আপনি?
পঁচিশ বছর আগে গোপাল রঞ্জন হালদারের পরিবারের চলে যাবার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে....। দিগ্বিজয় রায় বলে, আমি বাসার ভেতরে যাবো। জামা কাপড় ঘুচিয়ে একটা ব্যাগে নিয়ে যেতে চাই।
না।
না?
হ্যাঁ,আপনি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। যেভাবে আছেন, সেইভাবেই যেতে হবে। আপনি যেতে দেরী করলেই বিপদে পড়বেন।
অসহায় চোখে নিজের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে দিগ্বিজয় রায়। দরজার কাছে এসে একবার ফিরে তাকায় পেছনে, এই শেষ! মি. দিগ্বিজয় রায়ের পেছনে কুকুরেরা নামছে...। মি. দিগ্বিজয় রায়ও নামছে।
আট.
চারজন স্ত্রী―শাকিলা পারভীন, করুণা বিবি, জয়নাব লতা আর দিলবুরা ছন্দাসহ মি. আগা খান গলি দিয়ে হাঁটছে। যাচ্ছে প্রধান সড়কের দিকে। এইভাবে জীবনের কাছে হেরে যাবে, কুকুরদের কাছে- দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। এই কুকুরেরা কিভাবে এল? কেনো আগে টের পাইনি? কুকুরেরা কি দখলে নেমেছে ঠাডা শহর? গোটা দেশ? স্ত্রীরা হাঁটতে পারছে না। অনেক বছর বাড়ি থেকে বের হয়নি ওরা। হাঁটতে পারছে না স্ত্রীরা। খুব অসহায় লাগছে। পেছনে পেছনে আসছে শত শত কুকুর...। কুকুরের দল...।
মি. দিগ্বিজয় রায়ের বাড়ির সামনে আসতেই অবাক মি. আগা খান। বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছে মি. দিগ্বিজয় রায়ও। পেছনে শত শত কুকুর। দুজনে পরম্পর তাকায়। অসহায় পরস্পর তাকায়, মৃদু হাসে, সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে আমপুরার ছোট গলি পার হয়ে বড় রাস্তায় পড়ে দুটি পরিবার। ওরা, মেইন রোডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরেরা ঘেউ ঘেউ ঘেউ উল্লাাসে মেতে ওঠে।
গলিটার মধ্যে আর কোনো মনুষ্য বসতি নেই। গোটা গলিটাই কুকুরদের দখলে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









