মঞ্চে আসছে নাট্যদল পালাকারের নতুন প্রযোজনা ‘এক কোটি মনোয়ারা’। বিশিষ্ট নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীরের রচনায় এবং মীর মেহবুব আলম নাহিদের নির্দেশনায় নির্মিত নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হবে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল ৫টা ও সন্ধ্যা ৭টায় নাটকটির আরও দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
ব্যক্তি, রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, স্মৃতি, মাতৃত্ব, প্রতিরোধ এবং মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘এক কোটি মনোয়ারা’। বাস্তবতা ও প্রতীকের সংমিশ্রণে নির্মিত এ নাটকে একটি রুদ্ধদ্বার মিলনায়তন মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় এক প্রতীকী আদালতে। সেখানে বিচার চলছে; কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কে—কোনো ব্যক্তি, কোনো রাষ্ট্র, নাকি আমাদের নীরব বিবেক? দুই আইনজীবীর তর্ক, ইতিহাসের খণ্ডচিত্র, স্মৃতির অনুরণন এবং সমকালীন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ গল্প।
নাটকের গল্পে শ্রমজীবী আবুল ফজলের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রোখসানার দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং এক প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ক্রমে ব্যক্তিগত বেদনার সীমা অতিক্রম করে জাতীয় প্রশ্নে পরিণত হয়। রাষ্ট্র, ক্ষমতা, বিচার, স্মৃতি, মাতৃত্ব, প্রতিরোধ এবং মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা এখানে একটি স্বতন্ত্র নাট্যভাষায় মিলেমিশে যায়।

নির্দেশক মীর মেহবুব আলম নাহিদ বলেন, ‘এক কোটি মনোয়ারা’ নামটির মধ্যেই রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। মনোয়ারা কি একজন নির্দিষ্ট নারী, বহু নারীর সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি, নাকি অনাগত সেই শিশু, যে এখনো জন্ম নেয়নি, কিন্তু যার জন্ম দিতে গিয়ে বারবার রক্তাক্ত হয় এই ভূমি? এই প্রশ্নের সূত্র ধরে প্রযোজনাটি দর্শককে নিয়ে যায় একটি পরিচিত শহরের অচেনা অন্ধকার গলিতে।
নাটকের নির্দেশনা ভাবনায় দুজন অ্যাটর্নির উপস্থিতি রয়েছে। তারা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ও বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে গিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে জমে থাকা শূন্যতা ও নির্মম বাস্তবতা উন্মোচনের চেষ্টা করেন। তাদের প্রশ্নে উঠে আসে শাহবাগ, নিটশে, ডারউইন, রইসউদ্দীন, রোখসানা ও আবুল ফজলের মতো নানা প্রসঙ্গ। পাশাপাশি ফিরে আসে ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের রক্তাক্ত ইতিহাস ও উত্তরাধিকার।
নির্দেশকের ভাষায়, প্রযোজনাটি কেবল হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খোঁজ নয়; বরং এমন এক জাতির আত্মঅন্বেষণ, যারা নিজেদের ভাঙা আয়নায় নিজেদের চিনতে ভয় পায়। দেশ, কাল ও পটপরিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষের যে অভিজ্ঞতা, ক্ষত, স্মৃতি ও প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, নাটকটি তারই একটি শিল্পিত রূপ।
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন একামণি ঘোষ, মনিষা ঘোষ, ফাহমিদা মল্লিক শিশির, মুনিরা অবনী, চারু পিন্টু, রমিজ পাটোয়ারী, তাজিন বিনতে খালেদ দৃষ্টি, টগর তিহান, তানজিদা ইসরাত জাহান ঋতু ও জ্যাকলিন কাব্য। সহযোগী নির্দেশনায় রয়েছেন সেলিম হায়দার। মঞ্চ পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফি করেছেন অনিকেত পাল বাবু। আলোক পরিকল্পনায় অম্লান বিশ্বাস, পোশাক পরিকল্পনায় মুনিরা অবনী এবং প্রপস পরিকল্পনায় চারু পিন্টু। ভিডিও পরিকল্পনায় আল সুবায়েল রশীদ নীরব এবং ভিডিও প্রক্ষেপণে রয়েছেন জ্যাকলিন কাব্য ও সাজেদুল ইসলাম শাওন।

আবহ সংগীত পরিকল্পনায় রয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুকিত ও অজয় দাশ। মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় চারু পিন্টু এবং মহড়া সমন্বয় করছেন একামণি ঘোষ। পোস্টার ডিজাইন করেছেন চারু পিন্টু। প্রচার ও প্রকাশনায় রয়েছেন কাজী ফয়সাল ও শাহনাজ পারভীন এলিস। প্রযোজনা সমন্বয়কারী শামীম সাগর এবং প্রযোজনা অধিকর্তা আমিনুর রহমান মুকুল।
২০০২ সালে যাত্রা শুরু করা নাট্যদল পালাকার মূলধারার নাট্যপ্রযোজনার পাশাপাশি পরীক্ষাধর্মী স্টুডিও থিয়েটার, শিশু-কিশোর নাট্যচর্চা, প্রশিক্ষণ, উন্মুক্ত মঞ্চে প্রদর্শনী এবং উন্নয়নভিত্তিক নাট্যযোগাযোগ নিয়ে কাজ করে আসছে। দলটির মতে, নাটকের প্রকৃত শক্তি মঞ্চের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত গন্তব্য মানুষের জীবন। সেই ভাবনা থেকেই ‘এক কোটি মনোয়ারা’ দর্শকের সামনে শুধু একটি গল্প নয়, বরং সময়, রাষ্ট্র, মানুষ, স্মৃতি, ন্যায়বিচার ও প্রতিরোধের নানা প্রশ্ন হাজির করবে।
নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায়। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল ৫টা ও সন্ধ্যা ৭টায় আরও দুটি প্রদর্শনী হবে। তিনটি প্রদর্শনীই অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









