হোমি আদাজানিয়ার ‘ককটেল ২’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সমালোচকদের কাছ থেকে খুব একটা প্রশংসা পায়নি। বরং গল্প, চরিত্রায়ণ ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ছবিটিকে নিয়ে হয়েছে বিস্তর সমালোচনা। বক্স অফিসেও সিনেমাটি বড় কোনো সাফল্যের দেখা পায়নি। অথচ নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর পুরো চিত্রই যেন বদলে গেছে।
গত সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর ‘ককটেল ২’ জায়গা করে নিয়েছে প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক অ-ইংরেজি সিনেমার শীর্ষ ১০ তালিকায়। তালিকায় সিনেমাটির অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশে অবশ্য এর জনপ্রিয়তা আরও বেশি—নেটফ্লিক্সের টপচার্টে ছবিটি রয়েছে শীর্ষে।
২০২৬ সালের জুনে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন শহীদ কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও কৃতি শ্যানন। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ককটেল’র ১৪ বছর পর এসেছে নতুন ছবিটি। তবে এটি আগের সিনেমার সরাসরি সিক্যুয়েল নয়; বরং সম্পর্ক, প্রেম, সন্দেহ ও বিশ্বস্ততার মতো বিষয়কে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রথম ‘ককটেল’এ অভিনয় করেছিলেন সাইফ আলী খান, দীপিকা পাড়ুকোন ও ডায়না পেন্টি। বন্ধুত্ব, প্রেম ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটি সে সময় দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল। হোমি আদাজানিয়ার পরিচালনায় সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতাতেই এবার এসেছে ‘ককটেল ২’।

সম্পর্কের পরীক্ষায় কুনাল-দিয়া
‘ককটেল ২’র গল্পের কেন্দ্রে কুনাল ও দিয়া। চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেছেন শহীদ কাপুর ও রাশমিকা মান্দানা। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে থাকা এই জুটি প্রায় এক দশক ধরে একসঙ্গে বসবাস করছে। দূরত্ব, করোনাকালের কঠিন সময় কিংবা বিয়ের সামাজিক চাপ কোনোটিই তাদের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারেনি।
কিন্তু একটি মজার মন্তব্য থেকেই দিয়ার মনে তৈরি হয় সন্দেহ। কুনাল একসময় রসিকতা করে বলে, সে যদি কখনো দিয়ার সঙ্গে প্রতারণা করে, তাহলে দিয়া সেটি জানতে পারবে না। কথাটি দিয়ার মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
সম্পর্ক ঠিক করার পর কুনাল ও দিয়া ছুটি কাটাতে যায় ইতালির সিসিলিতে। সেখানেই তাদের জীবনে আসে দিয়ার পুরোনো বন্ধু অ্যালি। কৃতি শ্যানন অভিনীত অ্যালি স্বাধীনচেতা। বিয়ে কিংবা স্থায়ী সম্পর্কে তার তেমন আগ্রহ নেই। সিসিলিতে সে নাচ শেখায়; এর আগে বারটেন্ডার হিসেবেও কাজ করেছে।
কুনাল তাকে সত্যিই ভালোবাসে কি না, সেই সন্দেহ দূর করতে দিয়া অ্যালিকে কুনালকে প্রলুব্ধ করার দায়িত্ব দেয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রেমিকের বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করা। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয় না। অ্যালি প্রথমে বিষয়টিকে অভিনয় হিসেবে নিলেও একপর্যায়ে সত্যিই কুনালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
সেখান থেকেই শুরু হয় সম্পর্কের জটিলতা।

সমালোচকদের কাঠগড়ায় সিনেমা
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর ‘ককটেল ২’ নিয়ে সমালোচকদের বড় অভিযোগ ছিল গল্পের দুর্বলতা এবং সম্পর্কের মতো জটিল বিষয়কে অতিরিক্ত হালকা করে দেখানো।
‘দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া’ সিনেমাটিকে পুরুষতান্ত্রিক রোমান্টিক কল্পনার পুরোনো কাঠামোয় নতুন মোড়ক দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছে। তাদের মতে, ছবিতে তারকা, বিদেশি লোকেশন ও চাকচিক্য থাকলেও প্রেমের গল্পে প্রয়োজনীয় আবেগ ও প্রাণের ঘাটতি রয়েছে।
দিয়াকে নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রেমিকের বিশ্বস্ততা যাচাই করতে অ্যালিকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্তকে সিনেমার অন্যতম দুর্বল দিক হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে কুনালকে প্রায় ‘নির্যাতিত’ ও ‘মহৎ’ প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতারও সমালোচনা করা হয়েছে।
ভারতীয় আরেক গণমাধ্যম সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়ে বলেছে, সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে মজার পরিস্থিতি তৈরি করতে গিয়ে ছবিটি অনেক সময় বিষয়টিকে নিছক রসিকতায় পরিণত করেছে। দিয়ার সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতিই শেষ পর্যন্ত গল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তাদের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
‘এনডিটিভি’ ছবিটির ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার প্রশংসা করেছে। বিশেষ করে সিসিলির লোকেশন, রং, পোশাক ও চিত্রগ্রহণ সমালোচকদের নজর কেড়েছে। তবে এসব চাকচিক্যের তুলনায় আবেগের জায়গাটি অনেকটাই ফাঁকা বলে মনে করেছে গণমাধ্যমটি। যদিও শহীদ কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও কৃতি শ্যাননের অভিনয়ের প্রশংসা করা হয়েছে।
‘দ্য হিন্দু’ও সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়েছে। তাদের পর্যালোচনায় ছবিটির রঙিন আয়োজনের প্রশংসার পাশাপাশি প্রেমের গল্পে আবেগ ও গভীরতার ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নারী চরিত্রের কণ্ঠকে অনেকটা আড়ালে রেখে কুনালকে প্রায় আদর্শ প্রেমিক হিসেবে দেখানোর প্রবণতার সমালোচনাও করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সাফল্যের পেছনে কী?
প্রশ্ন হচ্ছে, সমালোচকদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া একটি সিনেমা নেটফ্লিক্সে এসে বাংলাদেশে এতটা জনপ্রিয় হলো কেন?
এর একটি কারণ হতে পারে ২০১২ সালের ‘ককটেল’-এর জনপ্রিয়তা। প্রথম সিনেমাটির দর্শকপ্রিয়তা নতুন ছবিটি দেখার ব্যাপারে কৌতূহল তৈরি করে থাকতে পারে। যদিও গল্পের দিক থেকে দুই সিনেমার সরাসরি ধারাবাহিকতা নেই।
এর সঙ্গে বড় ভূমিকা থাকতে পারে রাশমিকা মান্দানার জনপ্রিয়তারও। দক্ষিণ ভারতীয় এই অভিনেত্রী বাংলাদেশি দর্শকদের কাছেও বেশ পরিচিত। ‘ককটেল ২’-এ তার আগের ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ ধরনের পরিচিত ইমেজের বাইরে ভিন্নভাবে হাজির হওয়ায় দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তরুণ দর্শকদের জন্য সিনেমাটির বিষয়বস্তুও আরেকটি কারণ হতে পারে। প্রেম, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বিয়ের চাপ, সন্দেহ, বিশ্বস্ততা এবং সম্পর্কের অনিশ্চয়তা—এসব নিয়েই এগিয়েছে গল্প। ফলে সমালোচকেরা গল্পে দুর্বলতা দেখলেও দর্শকের একটি অংশ নিজেদের সম্পর্কের সঙ্গে গল্পের বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
আরেকটি বিষয়ও বাদ দেওয়া যায় না—নেতিবাচক প্রচার। সিনেমাটিকে ‘বাজে’, ‘দুর্বল’ কিংবা হতাশাজনক বলা হয়েছে—এমন আলোচনা অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখতে গিয়ে কেউ বিরক্ত বা হতাশ হলেও সেই কৌতূহলই তাকে নেটফ্লিক্সে ছবিটি চালু করতে উৎসাহিত করেছে।
ফলে প্রেক্ষাগৃহে গড়পড়তা ব্যবসা আর সমালোচকদের নেতিবাচক মন্তব্যের পরও ওটিটিতে এসে ‘ককটেল ২’ দেখাচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতা—সমালোচকদের রায় আর দর্শকের পছন্দ সবসময় একই পথে হাঁটে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









