মহাকাশে দ্রুতগতির তথ্য আদান-প্রদানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে বাণিজ্যিকভাবে অপটিক্যাল ডেটা রিলে সেবা চালু করেছে কানাডার মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কেপলার কমিউনিকেশনস।
সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রতিষ্ঠানটি জানায়, নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে (লিও) থাকা স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে লেজার-ভিত্তিক সংযোগ ব্যবহার করে এখন গ্রাহকদের জন্য বাণিজ্যিক ডেটা আদান-প্রদানের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ব্যবসার পর নতুন এক মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ খাতে প্রবেশ করল কেপলার।

কোম্পানিটি জানিয়েছে, জানুয়ারিতে স্পেসএক্সের মাধ্যমে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে পাঠানো প্রায় ৩০০ কেজি ওজনের ১০টি স্যাটেলাইটের প্রথম ধাপের কমিশনিং সম্পন্ন হয়েছে। এসব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন ডেটা রিলে নেটওয়ার্ক।
কেপলারের নেটওয়ার্কে স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে আন্তঃস্যাটেলাইট লেজার লিংক ব্যবহার করা হয়। এর ফলে কোনো মহাকাশযানকে তথ্য পাঠানোর জন্য সবসময় পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনের ওপর দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না। একটি স্যাটেলাইট অন্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য এগিয়ে দিতে পারে, যা মহাকাশে থাকা বিভিন্ন মিশনের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে।
কেপলারের দাবি, প্রথম ধাপের স্যাটেলাইটগুলো সর্বোচ্চ ‘২.৫ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড (জিবিপিএস)’ গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি উন্নীত অপটিক্যাল যোগাযোগের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন স্যাটেলাইটগুলো আকারে কেপলারের আগের কিউবস্যাটগুলোর তুলনায় অনেক বড়। এত দিন প্রতিষ্ঠানটি মূলত স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থাকা সম্পদ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও অন্যান্য (আইওটি) ডিভাইসের সংযোগ দিতে ছোট স্যাটেলাইট ব্যবহার করত। নতুন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কেপলার এখন মহাকাশে হোস্টেড পেলোড এবং অন-অরবিট কম্পিউটিংয়ের মতো অতিরিক্ত ব্যবসাও সম্প্রসারণ করছে।
প্রাথমিক গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে জার্মান প্রতিষ্ঠান অরোরাটেক। প্রতিষ্ঠানটি কেপলারের হোস্টেড পেলোড ও কক্ষপথে কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মও ব্যবহার করছে। কেপলার জানিয়েছে, সফল পরীক্ষার পর বাণিজ্যিক ও সরকারি—উভয় খাতের বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক তাদের ডেটা রিলে নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে দুটি প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইটের মধ্যে সফল পরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রযুক্তির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছিল।

কেপলারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মিনা মিত্রি বলেন, বড় পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রবেশ প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর ভাষায়, মহাকাশে অপটিক্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের সম্ভাবনা কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা করার পর এখন বাস্তব সময়ের মিশন চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ মহাকাশ কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কেপলার জানিয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মের অপটিক্যাল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য রকেট ল্যাবের মাঝারি-উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন নিউট্রন রকেটও বুক করা হয়েছে।
২০২৮ সালের আগে উৎক্ষেপণ না হওয়ার কথা রয়েছে। এসব নতুন স্যাটেলাইট সর্বোচ্চ ‘১০০ জিবিপিএস’ গতির সংযোগ দিতে সক্ষম হবে।
এদিকে দ্বিতীয় ধাপে কেপলার ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রস্তাবিত ‘হাই-থোর্পোট নেটওয়ার্ক সিস্টেম’প্রকল্পের জন্য আরও ১০টি স্যাটেলাইট তৈরি করছে।
টেরাবিট-প্রতি-সেকেন্ড ক্ষমতাসম্পন্ন এই বহু-কক্ষপথের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের লক্ষ্য হলো পৃথিবীর ফাইবার-অপটিক অবকাঠামোর সক্ষমতা মহাকাশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। ফলে ভবিষ্যতে মহাকাশভিত্তিক দ্রুতগতির যোগাযোগ অবকাঠামো আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ, কেপলার কমিউনিকেশনস একটি কানাডীয় মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যা স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। এক দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারনেট অব থিংস সংযোগ সেবা দিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে কেপলার নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে (লিও) স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দ্রুতগতির ডেটা রিলে, অপটিক্যাল বা লেজার যোগাযোগ, হোস্টেড পেলোড এবং কক্ষপথে কম্পিউটিং সেবা উন্নয়ন করছে। এর স্যাটেলাইটগুলো আন্তঃস্যাটেলাইট লেজার লিংকের মাধ্যমে মহাকাশযানগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে। বাণিজ্যিক ও সরকারি উভয় খাতের গ্রাহকদের জন্য কাজ করা কেপলার ভবিষ্যতে মহাকাশকে দ্রুতগতির বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









