লালমনিরহাটের বড়বাড়ী বাজারে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে সেলাই মেশিনের শব্দে নিজের ভাগ্য গড়েছেন নারী উদ্যোক্তা সান্ত্বনা রানী রায়। এক সময় চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এই নারী আজ সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি এলাকার শত শত নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।
১৯৯২ সালে দিনমজুর স্বামীর সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারের হাল ধরতে অষ্টম শ্রেণি পাস সান্ত্বনা রানী দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেন। চোখের জল নয়, পরিশ্রমই যে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে—সে বিশ্বাস থেকেই তিনি সেলাইয়ের কাজ শেখার সিদ্ধান্ত নেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ২০০০ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বড়বাড়ী বাজারে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘এস বি টেইলার্স’। শুরুতে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে তার দক্ষতা ও সততার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় পরিচিতি পায়।
বর্তমানে ‘এস বি টেইলার্স’ থেকে বছরে তার আয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। পাশাপাশি তিনি নিজস্ব সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং বাড়িতে গবাদিপশু পালন করছেন। সেলাইয়ের আয়েই তার পরিবারের জীবনমান বদলে গেছে।
সান্ত্বনা রানীর উপার্জনের টাকায় বড় মেয়ে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াশোনা করছেন। ছোট মেয়ে পড়ছেন লালমনিরহাট মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজে।

নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সান্ত্বনা রানী রায় বলেন, “২৫ বছর ধরে এই বাজারে দোকান করছি। শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। অনেক সময় যাতায়াত ভাড়ার টাকা না থাকায় হেঁটেই গিয়ে কাজ শিখতে হয়েছে। তবে পরিবারের সমর্থন ছিল। সবচেয়ে ভালো লাগে এই ভেবে যে, আমার কাছ থেকে কাজ শিখে অনেক নারী আজ স্বাবলম্বী হয়েছে।”
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ নারীকে তিনি বিনামূল্যে হাতে-কলমে সেলাইয়ের কাজ শিখিয়েছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী বর্তমানে নিজ নিজ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করছেন।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাজিয়া বেগম বলেন, “আগে দিনমজুরের কাজ করতাম। কাজ না থাকলে না খেয়ে থাকতে হতো। সান্ত্বনা আপার কাছে কাজ শিখে এখন তার দোকানেই কাজ করছি। সংসার এখন ভালো চলছে।”
আরেক প্রশিক্ষণার্থী কাকলি রানী বলেন, “বিয়ের পর সংসারের চাপে সেলাই শেখা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে এখানে এসে কাজ শিখেছি। এখন বাড়তি আয়ে পরিবারে স্বস্তি এসেছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অসহায় নারীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে সান্ত্বনা রানী গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।”
বড়বাড়ী বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, “নারীরা অনেক সময় পুরুষদের দোকানে পোশাকের মাপ দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। সান্ত্বনা রানীর মতো নারী উদ্যোক্তা থাকায় বাজারে নারীদের জন্য কাজ সহজ হয়েছে।”
স্থানীয়দের মতে, বড়বাড়ী বাজারে নারী উদ্যোক্তা সান্ত্বনা রানীর এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কাওছার/এদিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









