বাংলাদেশে ‘ধর্ষণ ও বিচার’ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ঔপনিবেশিক আইনের সীমাবদ্ধতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, বৈবাহিক ধর্ষণের আইনি অস্বীকৃতি এবং প্রমাণের জটিলতা প্রতিনিয়তই ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করছে। আজকের আইনের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বিচার বিভাগের কর্ণধার ও নীতিনির্ধারক। তাই বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সংস্কারের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণধর্মী ও যুগোপযোগী মতামতগুলো সংকলন করেছেন আমানুর রহমান
মৃত্যুদণ্ড বনাম নিশ্চিত শাস্তি
বাংলাদেশে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায়। ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত এই আইনে আধুনিক সময়ের ‘সম্মতি’ কিংবা বৈবাহিক ধর্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিত। অন্যদিকে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’-এ ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও সমাজে এই অপরাধ কমছে না। এর প্রধান কারণ শাস্তির অভাব নয়, বরং শাস্তি প্রয়োগের অনিশ্চয়তা। তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। অপরাধবিজ্ঞানও সমর্থন করে যে, শাস্তির মাত্রার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তাই অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর।
তাই কেবল শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই হবে না। দেশে ধর্ষণ প্রতিরোধে একটি বাস্তব ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে আইনের আধুনিকায়ন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি একটি ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
— রিয়াজ উদ্দিন ইফান, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)
আদালতে ভুক্তভোগীর সম্মান
ধর্ষণ মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় একসময় ভুক্তভোগীর অতীত চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে দ্বিতীয়বার মানসিক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়া হতো। তবে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৫৫(৪) ধারা বাতিল ও ১৪৬(৩) ধারা সংশোধনের ফলে এই অমানবিক চর্চার অবসান ঘটেছে। এখন ভুক্তভোগীর অতীত যৌনজীবন দিয়ে তার সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা মাপা যায় না। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ সম্পূর্ণ বেআইনি, যা তার সামাজিক সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
আদালতে জেরা করার সময় আইনজীবীদেরও আইনি ও পেশাগত নৈতিকতার সীমানা মানতে হবে। জেরার নামে ভুক্তভোগীকে অপমান বা চরিত্রহনন করার কোনো সুযোগ নেই। এসব যুগান্তকারী আইনি সংস্কার বিচারপ্রক্রিয়াকে শুধু মানবিক ও ভুক্তভোগীবান্ধবই করেনি, বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বহুগুণ বাড়িয়েছে। যৌন সহিংসতায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এটি একটি মাইলফলক।
— উম্মে জান্নাত সাচি মীম, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
ধর্ষণ মামলার আধুনিক তদন্ত
ধর্ষণ মামলার বিচারে কেবল মেডিকেল রিপোর্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনেক সময় ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক ভয় বা মানসিক আঘাতের কারণে ভুক্তভোগী দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে না পারলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। তাই শুধু মেডিকেল রিপোর্ট নয়, বরং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, আলামত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। আইনে দ্রুত মেডিকেল পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কথা বলা থাকলেও পর্যাপ্ত ডিএনএ ল্যাব ও দক্ষ জনবলের অভাবে বাস্তবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তবে উচ্চ আদালত অপমানজনক ও অবৈজ্ঞানিক ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধ করে ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষায় যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এখন পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি, কার্যকর ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং একটি দক্ষ তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
— রিমন বড়ুয়া, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)
অস্বীকৃত অপরাধ : বৈবাহিক ধর্ষণ
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৫ ধারার কারণে বৈবাহিক ধর্ষণ এখনো পূর্ণাঙ্গ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনে ধরে নেওয়া হয়েছে যে, বিয়ে মানেই স্ত্রীর নিঃশর্ত ও স্থায়ী সম্মতি। কিন্তু আধুনিক মানবাধিকার ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য; কারণ, বিয়ে কখনোই একজন মানুষের স্বাধীন সম্মতি দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। এই আইনি দুর্বলতার কারণে অসংখ্য নারী বিবাহিত জীবনে যৌন সহিংসতার শিকার হলেও আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা সংবিধানে প্রদত্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডেও যৌন সম্পর্কে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি অপরিহার্য। তাই সময়ের দাবিতে ৩৭৫ ধারার এই বিতর্কিত ব্যতিক্রমটি বাতিল বা সংশোধন করা এখন জরুরি। বৈবাহিক সম্পর্কে স্বাধীন সম্মতিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলে আমাদের বিচারব্যবস্থা আরও ন্যায়সংগত ও মানবিক হয়ে উঠবে।
— নাজনীন আকন্দ পাতা, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার
‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর কঠোরতার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে প্রায়ই মিথ্যা মামলা হচ্ছে। এতে নির্দোষ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই আইনের ১৭ এবং দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী, হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, মামলা প্রমাণ না হওয়া মানেই সেটি মিথ্যা নয়। ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবেও অনেক সময় মামলা খারিজ হয়। তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা এবং প্রমাণে ব্যর্থ অভিযোগের পার্থক্যটি সঠিকভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আইনের অপব্যবহার রোধ এবং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধানে সঠিক তদন্ত, সাক্ষীর সুরক্ষা, দ্রুত বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
— মোহাম্মদ তারেক খান, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী ইউনিভার্সিটি
দীর্ঘসূত্রিতার বৃত্তে ন্যায়বিচার
নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে ১৮০ দিনে বিচার শেষের বিধান থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তদন্তে জবাবদিহিতার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ফরেনসিক ব্যবস্থা, মেডিকেল রিপোর্টে কারসাজি, মামলার জট এবং সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। ফলে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না এবং সুবিচার চরমভাবে ব্যাহত হয়।
বিচারহীনতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ভুক্তভোগীরা মানসিক হতাশা এবং চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভোগান্তির শিকার হন; এমনকি আসামির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেতেও তাদের পোহাতে হয় নানা হয়রানি। এই উদ্বেগজনক প্রবণতা রোধ ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তদন্ত ও ফরেনসিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। সর্বোপরি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিকতার বিকাশের মাধ্যমেই নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
— নুসরাত জাহান জেরিন, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









