গুনাহ করা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। তবে সব গুনাহের পরিণতি এক নয়। কিছু গুনাহ আছে, যেগুলো মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। আবার কিছু গুনাহ আছে, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, এমনকি একটি জাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম এসব গুনাহ থেকে বাঁচতে বিশেষভাবে সতর্ক করেছে এবং এগুলোকে কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
রাসুল (সা.) এমন সাতটি গুনাহের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর ক্ষেত্রে তিনি আল-মুবিকাত শব্দ ব্যবহার করেছেন। আল-মুবিকাত শব্দের অর্থ এমন ধ্বংসাত্মক পাপ, যা মানুষকে দুনিয়ায় বিপর্যস্ত করে এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করে।
বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, জাদু করা, অন্যায়ভাবে এমন কাউকে হত্যা করা—যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে পলায়ন করা, সতী ঈমানদার ও নিরপরাধ নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া। (বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)
এসব অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং এগুলোর প্রত্যেকটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়।
শিরক : শিরক এমন একটি অপরাধ, যা আল্লাহর একত্ববাদকে অস্বীকার করে। কোরআনের ভাষায় এটি সর্ববৃহৎ জুলুম। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করবেন না।’(সুরা : আন নিসা, আয়াত : ৪৮)
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই শিরক এক মহা জুলুম।’(সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)। অবশ্য কেউ যদি মৃত্যুর আগে আন্তরিকভাবে তওবা করে, আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দেন। তাই একজন মুসলমানের প্রথম কর্তব্য হলো তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা এবং শিরকের সব রূপ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
জাদু করা : জাদুটোনা ঈমান ও সমাজ ধ্বংসের অস্ত্র। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে হারুত ও মারুতের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘তারা এমন বিষয় শিখত, যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত।’ (সুরা : আল বাকারাহ, আয়াত : ১৯২)
আজও তাবিজ, কুফুরি মন্ত্র, জাদুটোনা ও প্রতারণা নামে বহু মানুষ ঈমান ও সম্পদ হারাচ্ছে। এসব থেকে সতর্ক থাকা অপরিহার্য।
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা : মানবজীবনের মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত উচ্চ। একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাকে কোরআন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান বলে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘যে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)। হত্যা শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়; বরং পরিকল্পিত নির্যাতন, সন্ত্রাস কিংবা অন্যায়ভাবে জীবন বিনষ্ট করার সব পথ এর অন্তর্ভুক্ত।
সুদ : সুদ ব্যক্তি ও সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। ব্যক্তিকে আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় করে তোলে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘তোমরা যদি সুদ পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।’(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৯)
এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ : যে শিশু তার অভিভাবক হারিয়েছে, তার সম্পদ আত্মসাৎ করা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনে ভরে এবং অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১০)। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, দুর্বল মানুষের অধিকার নষ্ট করা আল্লাহর কাছে মারাত্মক অপরাধ।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা : জিহাদের সময় শত্রুর মুখোমুখি হয়ে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়া বড় গুনাহ। কারণ এতে শুধু নিজের ক্ষতি নয়; বরং পুরো মুসলিম সমাজ বিপদের মুখে পড়ে। তবে কৌশলগত কারণে অবস্থান পরিবর্তন বা অন্য বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য সরে যাওয়া এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কোরআনে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। (সুরা : আল আনফাল, আয়াত : ১৫-১৬)
সতী ও নিরপরাধ নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ : কারো সম্মানহানি করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, বিশেষ করে কোনো পবিত্র ঈমানদার ও নিরপরাধ নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা সতী, ঈমানদার ও নিরপরাধ নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।’ (সুরা : আন নুর, আয়াত : ২৩)
এ সাতটি ধ্বংসাত্মক অপরাধ নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর কিছু আল্লাহর হক নষ্ট করে, কিছু বান্দার হক নষ্ট করে এবং কিছু সমাজের নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব শুধু নিজে এসব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা নয়; বরং পরিবার ও সমাজকেও এসব বিষয়ে সচেতন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব ধ্বংসাত্মক অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









