বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এখন তরুণদের মধ্যেও এর প্রকোপ বাড়ছে। হৃদরোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে লিখেছেন ডা. সামি নজরুল ইসলাম
দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হৃদযন্ত্র। রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় এটি। হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন রোগকে বলা হয় হৃদরোগ। এর মধ্যে আছে হার্ট অ্যাটাক, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট ফেইলিউর, হার্টের ভালেভর সমস্যা এবং অনিয়মিত হৃত্স্পন্দনের মতো জটিলতা। প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। বাংলাদেশেও প্রতিবছর দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ এটি।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখন তুলনামূলক কম বয়সী মানুষও হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
হৃদযন্ত্রে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও তার প্রভাব পুরো শরীরে পড়তে পারে। অনেক সময় রোগীরা প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে অবহেলা করে, যার ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং জটিলতা বেড়ে যায়। তাই হৃদরোগের লক্ষণ সবার জানা প্রয়োজন।
লক্ষণ
হৃদরোগ তথা হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ বুকে চাপ লাগা, ভারী অনুভূতি বা তীব্র ব্যথা। এই ব্যথা অনেক সময় বাঁ হাত, দুই হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠে ছড়িয়ে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিক রোগী, প্রবীণ ও নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সব লক্ষণ প্রকাশিত না-ও হতে পারে। তাই কোনো ধরনের উপসর্গ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
এ ছাড়া অন্যান্য ধরনের হৃদরোগের লক্ষণের মধ্যে আছে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি। এ ধরনের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কেন হয়
হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, দেহের অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এবং পারিবারিকভাবে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
প্রতিরোধ
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হৃদরোগ প্রতিরোধযোগ্য। হৃদরোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করুন। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। তাজা শাক-সবজি, ফলমূল, মাছ, আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান। অতিরিক্ত লবণ, চিনি, কোমল পানীয়, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার বাদ দিন। দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
৪০ বছর বয়সের পর, অথবা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পারিবারিক ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ট্রেডমিল টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করানো উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা সম্ভব।
চিকিৎসা
অনেকেই মনে করেন, হার্টের সমস্যা মানেই ওপেন হার্ট সার্জারি। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। ওষুধ, এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট ও পেসমেকার স্থাপন করে হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ বা কিছু ক্ষেত্রে নিরাময় করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নত সার্জারির মাধ্যমে বেশির ভাগ হৃদরোগের কার্যকর চিকিৎসা করা হয়, যার জন্য ল্যাপারোস্কোপি পদ্ধতি যথেষ্ট। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্তই রোগীর জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনে রাখবেন, বুকে ব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত নিকটস্থ বিশেষায়িত হাসপাতালে যান এবং একজন কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কারণ হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, হৃেপশি তত বেশি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
হৃদরোগকে ভয় নয়, সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করুন। নিজের হৃদযন্ত্রের যত্ন নিন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলুন। আজকের সচেতন সিদ্ধান্তে আগামীর জীবন হবে সুস্থ, কর্মক্ষম ও সুন্দর।
লেখক : ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









