ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে আবারও নৌ-অবরোধ জারির পর দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে দুই ধাপে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার চালানো এই মার্কিন হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় একযোগে আঘাত হেনেছে ইরান। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অভূতপূর্ব পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এবারের লড়াইকে ইরান নিজেদের ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে; খবর রয়টার্সের।
দুপক্ষের মধ্যে বিদ্যমান একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার কয়েকদিনের মধ্যে সর্বশেষ এই উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনাগুলো ঘটেছে, এতে ফের পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরান আবারও আরও আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
শনিবার রাতে ইরান জানায়, তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকে লড়াই আবার তীব্র হয়ে ওঠে। সামরিক সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হতো।
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ফের তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের ব্যারেল প্রতি মূল্য এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়ে ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনী ইরানের স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিক থেকে দেশটির বৃহত্তর তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা পদ্ধতি ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম এবং সেগুলোর উৎক্ষেপণ এলাকায় হামলা চালায়। এর নয় ঘণ্টা পর ইরানের বিভিন্ন শহরে ফের হামলা চালায়।
এক বিবৃতিতে সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলো ইরানি কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ও উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে।”
এর পাশাপাশি ইরানের বৃহত্তম বন্দর বন্দর আব্বাসের বিভিন্ন লক্ষ্যস্থলে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, “৯০ মিনিট ধরে চলা এক তরঙ্গে আমেরিকা বাহিনীগুলো বৃহত্তর তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের স্থানগুলোতে আঘাত হেনেছে।”
বুধবার আইআরজিসি বলেছে, তারা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যস্থলগুলোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে। কুয়েতের আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা সদস্যদের এক সমাবেশে ও একটি রেডার পদ্ধতি লক্ষ্য করে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যম বন্দর আব্বাসসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। অন্য বিস্ফোরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে আহভাজ শহরের আশপাশে এবং কোনারাক, সিরিক ও কেশম দ্বীপে।
ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে খোনদাব শহরে অন্তত দুটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, ‘শত্রুর হুমকি’ প্রতিরোধ করার জন্য তেহরানে এয়ার ডিফেন্স সক্রিয় করেছিল ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, আহভাজে যুক্তরাষ্ট্র একটি শিশু ক্যান্সার হাসপাতালের কাছে আঘাত হেনেছে, এতে অস্থায়ীভাবে হাসপাতালের সবাইকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। হাসপাতালের আশপাশে থাকা পরিবারগুলো শিশুদের যত্ন নিতে রাস্তায় নেমে আসে।
প্রথম ধাপের হামলার পর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘ইরানের ব্যবস্থাপনা’ বজায় রাখার ওপরই ইরানের নিরাপত্তা নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, “আমরা আমেরিকার সঙ্গে একটি অপরিহার্য ও অস্তিত্বমূলক যুদ্ধে আছি।”
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলাগুলোর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পাশাপাশি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকেও লক্ষ্যস্থল করা হচ্ছে কারণ আরও জটিল অভিযানে নামার আগে যুক্তরাষ্ট্র তা ধ্বংস করতে চায়।
বার্তা সংস্থা তাসনিম ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









